পারলেন না, দেবেন ঠিকই চমকে দিল। নগেন্দ্র ত্রস্ত হয়ে বললেন, ‘আসুন দেবেনবাবু।’
দেবেন চেয়ারে বসে জুতো থেকে পায়ের পাতা মুক্ত করল। থ্যাবড়া, আঙুলগুলোয় অসমান নখ, গোড়ালিতে কাটা দাগ। পরনে একই জামাকাপড়।
‘গেছলেন নাকি দেখতে?’
‘একজনকে পাঠিয়েছিলুম, সে দূর থেকে দেখে এসেছে, দুটো ঘর।’ নগেন্দ্র সাবধানী হলেন।
‘আপনার নিজের যাওয়া উচিত ছিল । পরের উপর নির্ভর করে বিষয়-সম্পত্তি রক্ষা করা যায় না।’ দেবেনের গলায় এই প্রথম মাতব্বরি ভাব ফুটে উঠল। ‘অবশ্য জমিজমা আপনি তো কখনো হ্যান্ডেল করেননি তাই জানেনও না। এই অঞ্চলে বসত জমির এখন খুব ডিমান্ড। দেখছেন তো হীরকনগরে কীরকম চরচর করে বাড়ি উঠে গেল, কত ফ্ল্যাটবাড়ি হয়েছে, আট-দশটা মোটরগাড়ি, কত জানলায় এয়ারকুলার লাগানো। জায়গাটা দেখলে কে বলবে ওখানে ধানখেত ছিল! এ সবই কিন্তু আমার হাড়ভাঙা চেষ্টায় হয়েছে।’
‘কীরকম?’ এবার নগেন্দ্র কৌতূহলী হলেন।
‘ঠাকুরপুকুরে ইউনাইটেড ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশনের নাম শুনেছেন?’
‘না’। নগেন্দ্র দেখলেন দেবেনের মুখে পলকের জন্য বিরক্তি ফুটেই মিলিয়ে গেল।
‘না শোনারই কথা। ওরা জমি কিনে মাটি ফেলে লেভেল করে পাকা ড্রেন তৈরি করে, জলের আর ইলেকট্রিক লাইন আনিয়ে, ধানখেতকে বসতজমি বানিয়ে প্লট করে বিক্রি করে। কোটি কোটি টাকার ব্যাবসা, শুধু কী এখানেই নাকি? বারাসাতে, দমদমে দু-দুটো ছোটোখাটো শহর বানিয়েছে। কলকাতার লোকেরা হু হু করে জমি কিনছে।’
‘আপনার হাড়ভাঙা চেষ্টাটা কীরকম?’
‘হীরকনগরের জমি তো আমিই জোগাড় করে দিলুম। ছোটো ছোটো চাষের জমি, এক-একটা জমির চার-পাঁচজন করে মালিক। ঘুরে ঘুরে বাড়ি গিয়ে সবাইকে রাজি করানো সে কী সহজ কম্মো! এক ভাগিদার এখানে থাকে তো আর একজন থাকে বিষ্টুপুরে। এ রাজি হয়তো ও বেঁকে বসে বেশি দাম চেয়ে। শেষমেশ একে টর্চ কিনে দিয়ে ওর ছেলের জন্য জুতো কিনে দিয়ে, তার বউয়ের ছেলে হবে হাসপাতালে ভরতির ব্যবস্থা করে দিয়ে রাজি করিয়েছি। একটা মোক্ষম দশ শতক মাঝের জমি শুধু একজনের জন্য আটকে গেছিল তাকে সাইকেল কিনে দিতে হয়েছে। নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ লেগেই আছে। ছাব্বিশজনকে রেজিস্টিরি অফিসে নিয়ে যেতে হয়েছে। এসব করা কী কোম্পানির ম্যানেজার শর্মাজির পক্ষে সম্ভব ছিল?’ দেবেনের মুখে আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটল।
‘আপনি রাজার বাগান কিনতে চান?’ নগেন্দ্র সোজাসুজি দুম করে প্রশ্নটা করলেন।
দেবেন একটুও অপ্রতিভ না হয়ে বলল, ‘হ্যাঁ।’
‘আপনি লোক দিয়ে ঘর দুটো তুলিয়েছেন আমাকে বিপদে ফেলার জন্য, ঠিক কিনা?’
‘হ্যাঁ’। দেবেনের মুখ পাথরের মতো শুধু ঠোঁটের কোণ দুটো সামান্য মোচড়ানো।
‘যদি আমি না বেচি!’
‘জমি আপনার থাকবে না। নগেনবাবু আপনি বোকা লোক নন, বিক্রি করলে কিছু টাকা পাবেন, বিক্রি না করলে একটা নয়া পয়সাও পাবেন না। ভেবে দেখুন।’
দেবেন নীচু গলায় যতটা সম্ভব সুপরামর্শ দেবার ভঙ্গিতে বললেও নগেন্দ্র অনুভব করলেন কঠিন একটা রুক্ষ পরতে কথাগুলো মোড়া। ওর কথা বলা বা চেয়ারে বসার মধ্যে ঔদ্ধত্য নেই কিন্তু প্রত্যয় ফুটে রয়েছে। নগেন্দ্র বুঝে গেলেন জমি দেবেন নেবেই।
নগেন্দ্রকে চুপ করে থাকতে দেখে দেবেন বুঝে গেল জমি তার হাতে আসবে। সে আরও ঘনিষ্ঠ স্বরে বলল, ‘এই বাড়ি আর লাগোয়া কাঠা দশেক রেখে বাকিটা বিক্রি করে দিন। দুটি মাত্র তো ছেলে, আর তো কেউ নেই । ছেলে দুটি পড়াশুনোয় ভালো বলেই শুনেছি। ওরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে যাবে। আপনি টাকাটা নিয়ে গরমেন্টের ঘরে রাখুন, মাসে মাসে সুদ নিন। বাকি জীবনটা নির্ঝঞ্ঝাটে কেটে যাবে। জমিটা তো বাবার কাছ থেকে পাওয়া, নিজের পরিশ্রমের টাকায় তো কেনেননি, তা হলে বরং মায়া -মমতার কথা উঠত।’
নগেন্দ্র বুঝলেন তার সম্পর্কে বেশ ভালোমতোই খোঁজখবর নিয়ে তাকে জরিপ করে দেবেন এখানে এসেছে। সে জেনে গেছে বিশাল শরীরের এই নগেন্দ্র রায়চৌধুরী নামের লোকটা আসলে তার থেকেও খাটো, কান মুলে এর কাছ থেকে জমি হাতিয়ে নেওয়া কঠিন ব্যাপার নয়। চোখ বন্ধ করলেন নগেন্দ্র অপমানটা চেপে রাখতে।
দেবেন লক্ষ করছিল নগেন্দ্রর চোখের হাবভাব। বলল, ‘আপনাকে স্যার একটুও কষ্ট করতে হবে না, শুধু জমির দলিলের একটা কপি দেবেন পরে আসলটা মাত্র একদিনের জন্য নোব, কয়েকটা স্ট্যাম্প পেপারে সই করে দেবেন, শেষ ট্যাক্সের রসিদ আছে তো? সেটাও চাই। আর একবার শুধু রেজিস্টারের অফিসে যাবেন অবশ্য যাবার আগে এখানে জমির দর এখন যা চলছে সেই মতো হিসেব করে আপনাকে টাকাটা পুরো মিটিয়ে দোব।’ যেন জমি হস্তান্তর সম্পর্কিত বোঝাপড়া হয়ে গেছে এমন নিশ্চিন্তি নিয়ে দেবেন কথাগুলো বলে গেল।
জমির দাম স্থির হয় আড়াই হাজার টাকা প্রতি বিঘা। এই দরের কথাই দেবেন বলে এবং নগেন্দ্র সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে যান। দেবেন সত্যি না মিথ্যা বলল সেটা যাচাই করতে কোনো খোঁজখবর নেওয়ার উৎসাহও বোধ করেননি। রাজার বাগানটা তার কাছে তখন অবাঞ্ছিত অপ্রয়োজনীয় পোষ্য বলে মনে হচ্ছিল, ঘাড় থেকে নামাতে পারলে বাঁচেন। জমিটা আছে বলেই দেবেনের মতো লোক বাড়ি বয়ে এসে তাকে চাপা শাসানি দিতে পারল। পরিষ্কার ব্ল্যাকমেইলিং আর এটা করতে পারল তার ভিতু ভালোমানুষি গাছাড়া স্বভাবের জন্য। নগেন্দ্র নিজের উপর ক্রুদ্ধ হয়ে উঠতে থাকেন একে একে নিজের চরিত্রের ত্রুটিগুলো আবিষ্কার করে।
