নগেন্দ্র আর এগোলেন না, ছেলেরা আর রাঁধুনি এসে দেখবে সিঁড়ির দরজায় তালা দেওয়া, ফিরে এলেন। তিনি চিন্তায় পড়ে গেলেন, দেবেন তো ঠিকই বলেছে, জবরদখলের প্রথম ধাপ তো দেখেই এলেন। কিন্তু লোকটা এসব জানল কী করে! থাকে তো প্রায় আধ মাইল দূরের মঙ্গলতলিতে। রাজার বাগানে যেতে হলে তার বাড়ির সামনে দিয়ে যাওয়া ছাড়া তো আর পথ নেই। নগেন্দ্রর মনে পড়ল না দেবেনকে কোনোদিন বাড়ির সামনে দিয়ে যেতে দেখেছেন।
বাড়ির গেটের ভিতর দাঁড়িয়ে রাঁধুনি অপর্ণা। নগেন্দ্রকে বাড়ির বাইরে দেখে সে একটু অবাক স্বরে বলল, ‘বেড়াতে বেরিয়েছিলেন মেসোমশাই?’
‘হ্যাঁ রাজার বাগানের দিকে গেছলুম।’
সিঁড়ির দরজার তালা খুলে দোতলায় উঠতে উঠতে নগেন্দ্র বললেন, ‘অপর্ণা তুমি তো বরহাটে থাকো, পাশেই মঙ্গলতলি। ওখানে দেবেন নস্কর নামে একটা লোক থাকে, নামটা শুনেছ?’
‘না। তবে নস্করপাড়া আছে।’
‘লোকটা সম্পর্কে একটু খোঁজ নেওয়ার ইচ্ছে হচ্ছে।’
দোতলায় উঠে নগেন্দ্র বললেন, ‘আগে একটু চা খাওয়াও।’ তারপর ঘরের আলো জ্বালিয়ে ট্রানজিস্টার নিয়ে বারান্দায় বসলেন। কলকাতা কেন্দ্রে পুরুষকণ্ঠে খেয়াল গান হচ্ছে। স্বর কমিয়ে তিনি শুনতে লাগলেন। ধুঁপদি গানের ব্যাকরণ তিনি জানেন না, কোনটে কী রাগ তাও বলতে পারবেন না। কণ্ঠস্বর যদি মিষ্টি হয়, সুর যদি তাঁর অনুভূতি আর স্নায়ুতে স্নিগ্ধ প্রলেপ মাখিয়ে দেয় তা হলে তিনি শোনেন।
একসময় চা নিয়ে এল অপর্ণা। পরিচ্ছন্ন কালো পাড়ের সাদা শাড়ি পরনে। পৃথুলা, শ্যামবর্ণ, এক সন্তানের জননী, পরিষ্কার কথাবার্তা। গৃহস্থ পরিবারের বিধবা। বয়স চল্লিশের কাছাকাছি, নগেন্দ্ররই বয়সি।
নগেন্দ্র চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললেন, ‘তোমার দেওরদের কাউকে দিয়ে একটু খোঁজ নেওয়াতে পারো লোকটা কেমন, কী করে?’
‘বলব খোঁজ নিতে, কী নাম বললেন, দেবেন নস্কর?’
‘আচ্ছা, তুমি কখনো রাজার বাগানের দিকে গেছ?’
‘না, তবে হীরকনগরের পাশেই তো, ওখানে যাওয়া-আসার সময় যতটকু চোখে পড়ত।’
‘এই ভেতরের রাস্তা দিয়ে গেলে রাজার বাগানে যাওয়া যায়। কাল তুমি একবার যাবে?’
‘কেন বলুন তো!’
‘ওই বাগানটা আমার তুমি বোধ হয় জানো। আজ দেবেন নস্কর নামের লোকটা আমায় এসে বলল বাগানে ঘর তুলে জমি দখল হয়েছে। আমি গিয়ে দূর থেকে দেখলুম সত্যিই ঘর উঠেছে তবে কোনো লোক দেখতে না পেয়ে আমি আর এগোলুম না। তুমি একবার গিয়ে খোঁজ নেবে কারা ঘর তুলেছে? আমি গিয়ে কথা বলতে পারতুম কিন্তু জমির মালিকের কাছে ওরা খোলসা করে মুখ খুলবে না। বরং একজন মেয়েছেলের কাছে নরম হয়ে অনেক কিছু বলে দেবে। ভেবে পাচ্ছি না এইরকম বেআইনি কাজ করার সাহস পেল কোথা থেকে, আমার মনে হয় এর পেছনে কেউ আছে।’
‘কিন্তু আমি অচেনা লোক, যারা জোরজার করে জমি দখল করে তারা মোটেই নরম প্রকৃতির হয় না, আমাকে তো ওরা গোড়াতেই খেদিয়ে দেবে।’
নগেন্দ্র চিন্তায় পড়ে গেলেন। পুলিশেই যান বা আদালতেই যান জবরদখলকারীদের পরিচয় তো প্রথমেই তাকে জানাতে হবে। এরা থাকবে এককাট্টা হয়ে। তাঁকে হয়তো মারধোর করে তাড়িয়ে দেবে।
‘মেসোমশাই একটা কাজ করতে পারি। হীরকনগরে যে বাড়িতে রান্না করতুম, সেই বাড়ির ঝি জোছনা ওখানকারই বউ, ওর কাছে গিয়ে খবর নিতে পারি।’
‘বাহ, তা হলে তো ভালোই হয়।’
পরদিন সকালে রান্নার কাজ সেরে অপর্ণা গেল হীরকনগরে। নগেন্দ্র উৎকণ্ঠিত হয়ে থাকেন বিকেলে ওর না আসা পর্যন্ত।
‘মেসোমশাই, জোছনা খুব বেশি কিছু বলতে পারল না। শুধু বলল, একটা লোক ওদের বলেছে, ওই তো জমি পড়ে আছে, বনজঙ্গল হয়ে সাপখোপের বাসা তৈরি হচ্ছে, ওখানে গিয়ে ঘর তুলে থাক না। ওরা প্রথমে রাজি হয়নি, পরের জমিতে মালিকের হুকুম ছাড়া বাস করতে গেলে যদি পুলিশ কোর্ট-কাছারি করতে হয়। এরপর নাকি লোকটা বলে কোর্ট-কাছারি হলে আমি দেখব। দু-তিনজনকে টাকাপয়সা দিয়ে হাতও করে, ঘর তোলার জন্য টাকাও দেয়। এইটুকু শুধু বলল।’
নগেন্দ্র অবাক হয়ে বলেন, ‘একটা লোক? আচ্ছা লোকটাকে দেখতে কেমন বলেছে?’
‘আমি অত আর জিজ্ঞাসা করিনি, সিঁড়ি মুছতে মুছতে কথা বলছিল, মনে হল না ও লোকটাকে দেখেছে তবে একটা কথা বলল, বাইরে থেকে লোক এসে জায়গাটা দেখে যাচ্ছে।’
নগেন্দ্র চুপ করে রইলেন। মনের মধ্যে উদবেগ তৈরি হচ্ছে। একটা লোক এসে উসকেছে, টাকাও দিয়েছে, দেবেন নয় তো?
‘আচ্ছা দেবেন নস্কর সম্পর্কে খোঁজ নিতে বলেছিলুম, নিয়েছ?’
‘মেজো দেওরকে জিজ্ঞাসা করেছিলুম, বলল, ও লোকটা তো এ তল্লাটের নামকরা জমির দালাল। বউ ডুবে মরেছে, গ্রামের লোক বলে গলা টিপে মেরে বউকে পুকুরে ফেলে দিয়েছিল। ওর ছেলের নাম অরুণ, বছর কুড়ি বয়স, মার্ডার কেসে পুলিশ ধরেছিল,পরে খালাস পেয়ে যায়। ওই দেবেনের সঙ্গে পুলিশের খুব ভাব, আক্রার দিকে ওর অনেক জমিজমা আছে।’
অপর্ণার কথাগুলো শুনে নগেন্দ্রর মনের মধ্যে শীতল হাওয়া বইতে শুরু করে, একটা কাঁপুনি বুকের মধ্যে ওঠানামা করতে থাকে। বার বার মনে হয় আর একটা ক্ষতি এগিয়ে আসছে। একে রোধ করার ক্ষমতা তার নেই। ক্ষতিটাকে কমিয়ে দেওয়ার চেষ্টা ছাড়া আর কিছু তিনি করতে অপারগ।
পরদিন বিকেলে তিনি খালি চেয়ারটার মুখোমুখি সোফায় বসে অপেক্ষা করেন। দেবেন আসবে, আসবেই। সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাবার সময় ওর পায়ের শব্দ হয়নি, ওঠার সময়ও হবে না। নগেন্দ্র দরজার দিকে তাকিয়ে রইলেন। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে যেন চমকে দিতে না পারে। অপেক্ষা করতে করতে ক্লান্ত চোখ সিঁড়ির দিক থেকে সরিয়ে বারান্দার দিকে ফেরান আর তখনই দরজার কাছ থেকে দেবেনের গলা শোনেন, ‘স্যার আসতে পারি?’
