তার গোরুমোষগুলো বিক্রি করে দেওয়া এবং কর্মচারীদের বিদায় করা দেখে আশপাশের লোকেরা বুঝে যায় রাজা ডেয়ারি বন্ধ হয়ে গেল। কয়েকদিন পর বিকেলে নগেন্দ্রর কাছে একটি লোক এসে হাজির হল। লোকটিকে তিনি আগে কখনো দেখেননি। লোকটি মাঝবয়সি, উচ্চচতা পাঁচ ফুটের বেশি নয়, হৃষ্টপুষ্ট ঘাড়ে গর্দানে, টাকটি চকচকে, পরনে ধুতি ও হাফহাতা পাঞ্জাবি, পায়ে গোড়ালি ক্ষয়ে-যাওয়া পাম্প শু। নমস্কার জানিয়ে বলল, ‘আমার নাম দেবেন নস্কর, থাকি ওই পাশেই মঙ্গলতলিতে।’
দেবেনের কণ্ঠস্বর মেয়েদের মতো। নগেন্দ্রর প্রথমেই মনে হল লোকটি বোধ হয় যাত্রায় মেয়ের পার্ট করে। তবে দৈর্ঘ্য ও প্রস্থ যেরকম তাতে কোনো স্ত্রী ভূমিকাতে ওকে কল্পনা করে নেওয়া কঠিন।
‘এসেছি কৌতূহল নিয়ে নিজের স্বার্থেই।’ দেবেন বাচ্চচার মতো হাসল। দোতলায় বড়ো বসার ঘরে সোফা এবং চেয়ার দুই-ই রয়েছে। দেবেন বসার জন্য বেছে নিয়েছে চেয়ার। ‘আপনি বোধ হয় আর ঘিয়ের ব্যাবসা করবেন না।’
নগেন্দ্রর ভ্রূ কুঁচকে উঠল। করব কী করব না তাই নিয়ে তোমার কৌতূহল কেন? মনে মনে বিরক্ত হয়ে বললেন, ‘আপনি করেন কী?’
‘সামান্য চাষবাস আছে আর জমি কেনাবেচা করি।’ দেবেনের গলা থেকে বিনীতভাবে কথাগুলো বেরিয়ে এল।
‘জমির দালালি করেন? তা আমার কাছে কেন?’
‘আপনার এতখানি জমি, প্রায় পঞ্চাশ বিঘের মতো, মিছিমিছি ফেলে রেখে দেবেন!’ দেবেনের চোখে বিস্ময় ফুটে উঠল।
‘আমি তো বলিনি ফেলে রেখে দেব!’
‘তা হলে কিছু একটা করবেন।’ দেবেন এবার সামান্য ইতস্তত করে বলল, ‘যদি কিছু না মনে করেন স্যার তা হলে একটা কথা বলব?’
‘বলুন।’
‘আপনি যে দুধ-ঘিয়ের ব্যাবসা আর করবেন না সেটা তো গোরুমোষ বেচে দেওয়া থেকেই বোঝা গেছে। তা হলে আর কী কাজে লাগাবেন অতখানি জমি? পোলট্রি করবেন? সূর্যমুখীর বা সর্ষের চাষ করবেন? বোধ হয় নয়,আপনি চাষবাসের কিছুই জানেন না। ধরে নিচ্ছি আপনি ওই লাইনে যাবেন না। তা হলে বড়ো রাস্তা থেকে এত ভেতরে জমি নিয়ে কী করবেন? বলবেন, ফেলে রেখে দোব, আমার যা খুশি তাই করব, কেমন?’ দেবেন চুপ করে নিরীহ মুখে তাকিয়ে রইল কথার প্রতিক্রিয়া বোঝার জন্য।
‘হ্যাঁ ফেলে রেখে দোব।’ নগেন্দ্র গোঁয়ারের মতো প্রায় ধমকে উঠলেন। অনুক্ত রইল-তাতে আপনার কী?
দেবেনের মুখে ভাবান্তর ঘটল না। ঠান্ডা নরম গলায় সে বলল, ‘আপনি বোধ হয় অনেকদিন রাজার বাগানের দিকে যাননি । গেলে দেখতে পাবেন আপনার জমির এলাকার পুব সীমানা বরাবর গোটা তিনেক দরমার ঘর উঠে গেছে। মাসখানেকের মধ্যেই বিঘে দুয়েক জমি আপনার হাতছাড়া হয়ে যাবে। সেই জমি উদ্ধার করার মতো সাধ্যি আপনার নেই, মানে জবরদখল হলে যা যা কর্ম জমির মালিককে করতে হয় তা আপনার দ্বারা সম্ভব নয়।’
শুনেই নগেন্দ্রর মুখ শুকিয়ে গেল। তিনি শুনেছেন এই অঞ্চলে কিছু কিছু অরক্ষিত জমি জবরদখল হয়ে গেছে। আইন-পুলিশ লাগিয়েও তাদের উচ্ছেদ করা যায়নি।
নগেন্দ্র বললেন, ‘আপনি কি ইদানীং রাজার বাগানে গিয়ে দেখে এসেছেন?’
দেবেন বলল, ‘আজ্ঞে হ্যাঁ, আজ সকালেও গিয়েছিলুম। আপনি নিজে বরং একবার গিয়ে দেখে আসুন।’
‘ঠিক আছে দেখে আসব।’
‘যদি দেখেন আমি যা বললুম সব সত্যি, তা হলে কী করবেন?’
‘সেটা পরে ভেবে দেখব।’
‘তা হলে আজ আসি স্যার, পরশু এমন সময়ে আবার আসব!’
নমস্কার জানিয়ে দেবেন দোতলা থেকে নেমে যেতেই নগেন্দ্র বারান্দায় এসে দাঁড়ালেন।
পশ্চিমের কাঁচা রাস্তা ধরে দেবেনকে চলে যেতে দেখে ঘরে এলেন। দুটি নাবালক ছেলে, ঠিকে ঝি, এক বিধবা দু-বেলা রান্না করে দিয়ে যায়, এই নিয়ে তার এখনকার সংসার। স্ত্রী মারা যাবার পর থেকে বাড়িতেই বেশিরভাগ সময় থাকেন, রাজার বাগানে কী ঘটছে তার খবর তিনি রাখেন না যদিও বাড়ি থেকে দুশো গজ হাঁটলেই জমির পুব সীমানা আর তারপরই ছোট্ট গ্রামের মতন দরিদ্র লোকেদের বসত।
ছেলেরা এই সময় খেলতে যায় বরহাটের ফুটবল মাঠে, রাঁধুনি আসবে সন্ধ্যা নাগাদ, নগেন্দ্র একতলার সিঁড়ির দরজায় তালা দিয়ে বেরোলেন। ফটক বন্ধ করে রাস্তায় নেমে এগোলেন রাজার বাগানের দিকে। পোড়া গোয়াল পর্যন্ত চোখ যায় বিনা বাধায় কারণ ঘি-এর টিন বহনকারী টেম্পো চালাবার জন্য রাস্তাটা পরিষ্কার রাখতে হয়েছে। গোয়ালের পিছনে একটা ছোটো পুকুর তারপর খেজুর, বাবলা, কৃষ্ণচূড়া, বট, তেঁতুল ইত্যাদি গাছের অগোছালো সমাবেশ এবং গাছগুলিকে ঘিরে আছে ঝোপঝাড়, ফলে দূর থেকে পুকুরের ওপারটা দশ গজের পর আর দেখা যায় না।
পুকুর ধারে দাঁড়িয়ে নগেন্দ্র চেষ্টা করলেন পুবদিকে তার জমির প্রান্ত দেখার। দেখায় ব্যর্থ হয়ে পুকুরের কিনার ধরে এগোলেন, ঝরা পাতায় ঢাকা নরম মাটি মাড়িয়ে, আসশ্যাওড়া আর ফণীমনসার কাঁটা বাঁচিয়ে একটা গাছের তলায় দাঁড়িয়ে দেখতে পেলেন প্রায় চল্লিশ গজ দূরে তার জমির সীমানা হিসাবে চিহ্নিত বেল গাছটাকে। বেল গাছের ধারে পাশাপাশি টালির চালের দুটো দরমার ঘর। টালি আর দরমার রং দেখে বুঝলেন ঘর দুটোর বয়স খুব অল্পই। দেবেন বলেছিল ‘গোটা তিনেক’, তৃতীয় ঘরটা তিনি দেখতে পেলেন না এমনকী ঘরে বা কাছাকাছি একটা লোকও দেখতে পাচ্ছেন না। বুঝলেন ঘরে বসবাস এখনও শুরু হয়নি।
