সরোজদা মোটেই ঠাট্টা করে বলছিলেন না। জবাব না দিয়ে মাথা নুইয়ে হেসেছিলাম। তখন লজ্জা পাওয়ার মধ্যে আমেজ লাগত। জেগে জেগেই তখন দেখতাম লর্ডসে মেলবোর্নে, কিংস্টনে ছাতু করছি বোলারদের। তখনও জানতাম না, একটা কাঁকর আমায় চুরমার করে দিয়ে যাবে। দ্বাদশ ব্যক্তি হয়ে ফিল্ডিং দিতে নেমে আমারই ফেলে দেওয়া ক্যাচ বাংলাকে হারাবে আর তার ফলেই চিরকালের মতো বাদ পড়ে যাব। কাগজে লিখেছিল, সিনহার ফিল্ডিং দেখে মনে হচ্ছিল বড়ো ম্যাচ খেলার নার্ভ এখনও তার তৈরি হয়নি। অথচ খেলা শুরুর দিন সকালে বার বার মনে হয়েছিল-অরুণাভর যদি এখন একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়! যদি পিছলে পড়ে পা মুচকে যায় কী হাত ভাঙে তাহলে আমি ওর জায়গায় টিমে এসে যাব। টিমের নাম সাবমিট করার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত আশা করেছিলাম, কিছু একটা ঘটবে। আমি টিমে আসব। কিন্তু কিছুই ঘটল না। শুধু লজ্জা পেয়েছিলাম মনে মনে, অরুণাভ-র অ্যাক্সিডেন্ট কামনা করার জন্য।
দ্বাদশ ব্যক্তি হয়ে আমার চরিত্রে একটা নতুন ছেঁদা দেখতে পেলাম। সেটা বুজে গেছে কী বড়ো হয়েছে, বুঝতে পারছি না।
তারকের শরীর একবার কেঁপে উঠল। মাথার মধ্যেটা ঝনঝন করছে। ঠিক সেদিনকার মতো সেই গলায়, সেই সব কথা দিয়েই লোকটা কিংবা আর একটা লোক বক্তৃতা করছে। তারকের মনে হতে লাগল, এই জায়গাটা বিন্দুমাত্রও বদলায়নি। বটগাছ মনুমেন্ট, শ্লোগান, চানা-মটরওলা, লাল ফেস্টুন, পোস্টার সবই হুবহু সেদিনকার মতো। এক্ষুনি হয়তো সরোজদা এসে বলবেন, যেন বলতে পারি ওই যে-
তারক মাথা নীচু করে বসে রইল। সরোজদা যেন না দেখতে পান।
তখন ওর মনে পড়ল ইঞ্জেকশন নেওয়ার সময় হয়ে গেছে। ভিড় ঠেলে মিটিং থেকে বেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড়ে সে বাসে উঠল।
বাস থেকে নেমে তারক হনহনিয়ে ডাক্তারখানায় এল। কিছু রোগী নিয়ে ডাক্তার বসে। যুবকটি কাঁচুমাচু হয়ে ডাক্তারকে বলল, ‘উনি ইঞ্জেকশন নিচ্ছেন।’
‘তোমায় বারণ করেছি আমি না থাকলে কাউকে ইঞ্জেকশন করবে না। বিপদ ঘটলে কে দেখবে?’
‘অন্য কিছু নয়, পেনিসিলিন।’
ডাক্তার গোমড়ামুখে রোগীদের দিকে মন দিল। কাত হয়ে ইট বার করা দেওয়াল দেখতে দেখতে তারকের মনে হল, এখন যদি মরে যাই! কিছুক্ষণ তার খুব ভয় করল।
বাড়ি এসে শুনল গুহ এসেছিল। বলে গেছে, ঘুরে আসছি। বিছানায় চিত হয়ে শুয়ে রইল সে। অনেক কথা, অনেক ঘটনা তালগোল পাকিয়ে মনে পড়ছে তার, এর মাঝে অনীতার কথাই বেশি করে তার মন জুড়ে ছেয়ে গেল। তারক ঠিক করল, গুহকে আগে বিয়ে করতে বলবে। দরকার হলে ভয় দেখাবে, অফিসে রটিয়ে দেব। মেয়েটা যা বলল, রেজিস্ট্রি বিয়েও তো করে রাখা যায়। তাহলে কারোর মনই আর খচখচ করবে না। বাড়ির আপত্তি আর ক-দিন টিঁকবে, তাদেরও তো বংশের বা ছেলের মানমর্যাদার কথা ভাবতে হবে। সে সব ব্যাপার নয় বুঝিয়ে বলা যাবে গুহর বাবাকে।
তন্দ্রা এসেছিল, বঙ্কুবিহারীর ডাক শুনে ধড়মড়িয়ে উঠল।
‘সেই ছেলেটা আবার এসেছে। কী ব্যাপার বল তো?’
‘কী আবার ব্যাপার!’
‘ও তখন জিজ্ঞেস করল আমায়, কোনো মেয়ে তোর কাছে সকালে এসেছিল কি না। এসেছিল বলতেই এমন একখানা ভাব করল। কোনো গোলমাল হয়েছে নাকি?’
‘না, গোলমাল আর কী।’ তারক হেলাফেলার ভাব দেখাল। ‘যা হয় আর কী। বিয়েতে বাড়ির সবাই আপত্তি করছে, আমাকে ধরেছে বুঝিয়ে সুঝিয়ে রাজি করাতে।’
‘ছেলের বাড়িতে আপত্তি তো হবেই, যা পেতনির মতো দেখতে। অবস্থাও তো মনে হয় ভালো না। তুই কিন্তু বেশি জড়াসনি। শেষে থানা-পুলিশ কোর্ট-ঘর না করতে হয়।’
‘আজকাল তো আর অবস্থা দেখে, রূপ দেখে ছেলেরা বিয়ে করে না। প্রথমেই দেখে শিক্ষা-দীক্ষা।’
‘তাই নাকি!’ বঙ্কুবিহারী অবাক হয়ে তাকিয়ে বলল, ‘তুই তাহলে কোন কালের ছেলে? দেখতে ভালো নয় বলে চারটে মেয়ে বাতিল করে, তিন হাজার টাকা নগদ পণ নিয়ে তবে তুই বিয়ে করেছিস।’
‘টাকা আমি নিইনি। ও টাকার এক পয়সাও আমার হাতে আসেনি। টাকা আমি নিতেও বলিনি।’ উত্তেজিত স্বরে তারক বলল।
‘টাকা না নিলে বিয়ের খরচ, বউভাতের খরচ আসত কোত্থেকে? তাহলে আজকালকার যা ফ্যাসান, সই মেরে বিয়ে করলি না কেন? দু-চারটে বন্ধুকে ডেকে রেস্টুরেন্টে খাইয়ে দিলেই বউভাত চুকে যেত।’
বন্ধুবিহারী ঠোঁট মুচড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। তারক তখন মনে মনে তাকে উদ্দেশ্য করে বলল, রেজিস্ট্রি বিয়ে করলে তুমি আমাকে ঘাড় ধরে বাড়ি থেকে বার করে দিতে। ঘর ভাড়া করে সংসার পাতার সামর্থ্য আমার নেই। তা ছাড়া এভাবে কাকেই বা বিয়ে করব। আমার সঙ্গে কোনো মেয়ের প্রেম হয়নি। গৌরীর সঙ্গে যা কিছু হয়েছিল তাকে প্রেম বলা যায় কিনা ভেবে দেখতে হবে। চারটে মেয়ে অপছন্দ করেছি কেননা তারা গৌরীর থেকে রূপে নীরেস ছিল। এটা আমার দুর্বলতাই। তখন ইচ্ছে হয়েছিল সুন্দরী বউ নিয়ে একবার গৌরীকে দেখিয়ে আসব। বুঝিয়ে দেব, আমিও নেহাত হেঁজিপেজি নই, দুনিয়ায় তুমিই একমাত্র সুন্দরী নও। কিন্তু রেণু এত অমার্জিত নির্বোধ হবে ভাবিনি। কী প্রচণ্ড যে ঠকেছি। ওর বাবার পয়সা আছে ওর শরীরে প্রচুর মাংস আছে। তাই নিয়ে গগন বসু মল্লিকের মেয়ের সামনে দাঁড়ানো যায় না। বরং অনীতার মতো কুরূপা জিরজিরে মেয়েকেও গৌরীর সামনে রাখা যায়। একটা বড়ো ধরনের বোকামি করে ফেলেছে বটে কিন্তু ও ক্লান্তিকর নয়। মাংস খেয়ে খেয়ে পেট খারাপ হওয়া লোককে লুব্ধ করার মতো কিছু কিছু ব্যাপার এই শুকনো ডাঁটার মতো মেয়েটার মধ্যে আছে বইকি।
