নগেন্দ্র তার রাজার বাগানের জমি বিক্রি করেছিলেন আগুনে তার ডেয়ারি ভস্মীভূত হয়ে যেতে। আগুন লেগেছিল মাঝরাতে, লাগার কারণটা আজও তিনি জানেন না। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দু-হাতে সদ্য মা-মরা এগারো বছরের যতীন আর আট বছরের অতীনের হাত চেপে ধরে দূর থেকে তিনি দেখে যান কাঠ আর বাঁশের তৈরি গোয়াল দ্রুত ছাই হয়ে গেল আশেপাশের অনেকেই ছুটে গেছিল, তিনি যাননি। যে দু-জন কর্মচারী রাতে গোয়ালের পাশের ঘরে থাকত তারা প্রথমেই গোরুমোষগুলোকে চালার নীচ থেকে বার করে আনে, প্রাণীগুলো অক্ষত ছিল। গ্রামের লোকেরা পুকুর থেকে কলসি বালতি করে জল এনে ঢালে বটে কিন্তু ততক্ষণে যা হবার তা হয়ে গেছে।
হরিচরণ বলেন, ‘এটা আর কী এমন লোকসান? তোমার আসল অ্যাসেট গোরুমোষগুলো তো রয়ে গেছে, আবার শুরু করো।’
নগেন্দ্র শুরু করেননি। হঠাৎই মনে হয় তার উপর শনির দৃষ্টি পড়েছে। এর মাত্র দু-মাস আগে পরপর মারা যায় সুধারানী আর সূয্যি। সুধারানীর লাশ পাওয়া যায় বরানগরের গঙ্গার ঘাটে। আহিরিটোলায় বাপের বাড়িতে গেছল জলবসন্তে আক্রান্ত বাবাকে দেখতে। বহুদিন গঙ্গাস্নান না করার খেদ মিটিয়ে নিতে পাড়ার দু-তিন জনের সঙ্গে সে যায় গঙ্গায়। বুকজলে দাঁড়িয়ে যখন দুই কানে আঙুল দিয়ে ডুব দিচ্ছিল তখনই আচমকা বান আসে। ঘাটের থেকে চিৎকার করে দু-তিনজন সুধারানীকে উঠে আসতে বলে। শুনল সে কিন্তু একটু দেরি করে। আঁকুপাকু করে উঠে আসার সময় সিঁড়ির ধাপে জমা শ্যাওলায় সে পিছলে পড়ে তখন শাড়ি খুলে শরীর থেকে নেমে যায়। সুধারানী হাঁটুজলে বসে পড়েন লজ্জা নিবারণের জন্য। সেই সময়ই প্রচণ্ড ঢেউ ধেয়ে এসে তাকে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। এসবই নগেন্দ্র শুনেছিলেন প্রত্যক্ষদর্শীদের কাছ থেকে। পরের দিন কুঠিঘাটে লাশটা পাওয়া যায়।
এরই একসপ্তাহ পরে নগেন্দ্র মেজো সতাতোভাই সূর্যশেখর তিনতলার ছাদের পাঁচিলে ঝুঁকে ঘুগনিওয়ালাটাকে খুঁজছিল। পাঁচিলের ওই জায়গাটাতেই আলগা হয়েছিল সুরকির গাঁথনি। বুকের চাপে ভেঙে পড়ে পাঁচিল। কয়েকটা ইট নিয়ে সূর্যশেখর আছড়ে পড়ে রাস্তায়। খবরটা পেয়েই নগেন্দ্র ছুটে যান সিমলায়। ভাইয়েদের মধ্যে ‘সূয্যি’ ছিল অত্যন্ত প্রিয়। বিয়ে করেনি, ভবঘুরে ধরনের। সাইকেলে প্রায় সারা ভারত ঘুরে বেড়িয়েছে। প্রায়ই রাজার বাগানে এসে কয়েকটা দিন কাটিয়ে যেত বড়দার কাছে।
‘বড়দা তোমার ওই গোয়ালটার পাশে আমি একটা ঘর করে থাকব। বড়ো শান্ত তোমার গোরুগুলো। ওদের গায়ে হাত বুলোতে বুলোতে কেন জানি ছোটোবেলার কথা মনে পড়ে যায়, কেন বলো তো?’
সূয্যি অবাক হয়ে তাকিয়ে প্রশ্নটা করেছিল। পরে নগেন্দ্রর বহুবার মনে পড়েছে ওই তাকানো চোখ দুটো আর অবুঝ বালকের মতো প্রশ্নটা-কেন বলো তো? সেদিন নগেন্দ্র জবাবে বলেছিলেন, ‘তোর ছোটোবেলায় বাড়িতে জীবনটা খুব শান্ত ছিল, সদ্ভাব ছিল, আমারও ছোটোবেলা মনে পড়ে তবে গোরুর গায়ে হাত বুলিয়ে নয়।’
পরে নিজের কাছে তিনি এর একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়ে স্বস্তি পান। সব মানুষের অনুভূতি সমান হয় না। সূয্যিটা একটু পাগলাটে, পাগলদের বোধশক্তি স্বাভাবিক মানুষদের থেকে অন্যরকম হয়।
ছোটোবেলায় ফিরে যাবার জন্য সূয্যি গোরুদের কাছে থাকতে চেয়েছিল, হেসে নগেন্দ্র বলেছিলেন, ‘ঠিক আছে থাকবি, ওদের সঙ্গেই জাবনাটাবনা খাবি।’
‘খাবি কী মানে? একদিন একগলা খেয়েও দেখেছি, নট ব্যাড!’
নগেন্দ্র হতভম্ব হয়ে ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নেড়ে যান। সুধারানী আর দুই ছেলে খুব মজা পেয়েছিল কথাটা শুনে। অতীন অনেকদিন পর্যন্ত বলত, ‘মেজো কাকা আগের জন্মে নিশ্চয় গোরু ছিল পরের জন্মেও গোরু হয়ে জন্মাবে।’ সূর্যশেখর মারা যাওয়ার পর অতীন আর কখনো এই রসিকতাটা মুখে আনেনি।
পরপর দুটো অপমৃত্যু বিমূঢ় করে তার উত্তুঙ্গ মনের জোরকে শূন্যে নামিয়ে দেয় এবং তিনি ভয় পেতে শুরু করেন, শুধুই মনে হতে থাকে আরও অনিষ্ট আরও ক্ষতি তার হবে। তখন ছোটোখাটো ব্যাপারেও তিনি সিঁটিয়ে উঠতেন। যতীন ইলেকট্রিক সুইচ টিপে আলো জ্বালতে গিয়ে শক খেল বা অতীন পা হড়কে সিঁড়ি দিয়ে গড়িয়ে পড়ে পাঁজরে চোট পেল, নগেন্দ্র তাতেই এর মধ্যে অমঙ্গলের ছায়া দেখতে পেতেন। শনির দৃষ্টির ধারণাটা পাকাপোক্ত হয়ে তাঁর মনে ভিত গেঁথে দিল যখন তারাতলায় ব্যাক থেকে সাত হাজার টাকা তুলে বাসে ফেরার সময় তার পাঞ্জাবির পকেট থেকে টাকাটা উধাও হয়ে গেল। বাস থেকে নেমে পকেটে হাত দিয়েই যখন বুঝলেন নোটের তাড়াটা নেই তখন একটা কথাই মুখ দিয়ে বেরিয়ে আসে। শনি ভর করেছে নয়তো গাড়ির ফ্যানবেল্ট কি না আজই ছিঁড়ে গেল!
এর কয়েকদিন পর গোয়ালে আগুন লাগে। হরিচরণ বলেছিলেন বটে আবার শুরু কর, সূয্যি বেঁচে থাকলে হয়তো শুরু করতেন সুধারানী জীবিত থাকলে অবশ্যই গোয়ালঘর আবার খাড়া করতেন। তা না করে তিনি পরিচিত এক পাঞ্জাবি দুধব্যবসায়ীকে ডেকে এনে গোরুমোষগুলো দিলেন প্রায় অর্ধেক দামে। প্রাণীগুলোকে হাঁটিয়ে তার বাড়ির সামনে দিয়ে নিয়ে যাবার সময় তিনি বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন। মন্থর চালে মাথা দুলিয়ে দুলিয়ে ওদের হেঁটে যাওয়া দেখে তার বুকে মোচড় দিয়েছিল। তার মা ভারী নিতম্বের জন্য অনেকটা এইভাবেই ধীর গতিতে হাঁটতেন মাথাটা একদিকে হেলিয়ে। পলকের জন্য ছোটোবেলা তার চোখে ঝলসে ওঠে।
