ক্ষুব্ধ হয়েছেন যেন এমন একটা ভাব দেখিয়ে তিনি পাশ ফিরলেন। তারপরই মনে হল বোধ হয় বাড়াবাড়ি হয়ে গেল, রেবা হয়তো মনে আঘাত পেল। পতিনিন্দা কোনো বউ-ই ভালো মনে নেবে না।
‘কাল মিসেস মুখার্জির সঙ্গে দেখা হল, গেটের কাছে নাতিকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন। বললেন ওর কর্তার পেটের কষ্টটা অনেক কমে গেছে অতীনের ওষুধ খেয়ে। এখন তিনি সকালে আগের মতো বেড়াতে বেরোচ্ছেন। অতীনকে বললেন ধন্বন্তরী। গত সাত বছর ধরে কষ্ট পাচ্ছিলেন, হেন চিকিৎসা নেই যে করাননি।’ নগেন্দ্র মুখ ঘুরিয়ে রেবাকে দেখার চেষ্টা করলেন, বুঝতে পারলেন না, মুখে ভাবান্তর নেই। এরপর যোগ করলেন, ‘শুনে আমার খুব ভালো লাগল। মুখার্জিরা সহজে তো কারও গুণ গায় না।’
‘উনি বললেন, অ্যালকোহলে মোসোমশাইয়ের লিভারটা নষ্ট হয়ে গেছে, সাবধান না হলে বেশিদিন বাঁচবেন না।’
‘সেটা কি মুখার্জিকে বলেছে?’
‘বলেননি। শুধু বলেছেন মদ খাওয়াটা এবার বন্ধ করুন, সময়মতো খাওয়াদাওয়া আর নিয়মিত ওষুধগুলো খেয়ে যান।’
‘মুখার্জি এখন বোধ হয় খাওয়া বন্ধ রেখেছে, একটু ভালো থাকলেই আবার শুরু করবে। মরবে তো বটেই আর তখন অতীনের বদনাম হবে ওকে বারণ করে দিয়ো বউমা মুখার্জির চিকিৎসা যেন আর না করে। ওরা ফি দেয় কি?’
‘দেয়, তবে উনি অর্ধেক নেন।’
‘সামান্য টাকা। ছেড়ে দিক মাতালটাকে।’
বাড়ির সামনে মোটরগাড়ির হর্নের শব্দ হল। গাড়ি থেকে নেমে এসে অতীন নিজেই গেট খুলবে। সিমেন্ট বাঁধানো চওড়া চাতালে গাড়ি রেখে এবার উপরে উঠে আসবে।
বহু বছর আগে নগেন্দ্রর ছিল অস্টিন গাড়ি, সেটা বিক্রি করে কেনেন অ্যাম্বাসাডার। তখন অতীন সবে ডাক্তার হয়েছে। গাড়িটা তিনি ছেলেকে ব্যবহার করতে দেন। পনেরো বছর সেই গাড়িতে চড়ার পর অতীন বলল, এবার এটাকে বানপ্রস্থে পাঠানো যেতে পারে, ইঞ্জিনটা গোলমাল করছে।
গাড়িটা বহু বছর নগেন্দ্রকে বহন করে তাকে মায়ার বাঁধনে বেঁধে ফেলেছিল। প্রথমে বিক্রি করতে রাজি হননি। বলেছিলেন, ‘দেখ না, সারিয়ে-সুরিয়ে যদি আরও কিছুদিন চলে।’ গ্যারাজে পাঠানো হয়। কিন্তু তারপর একদিন অতীনকে পথে বসিয়ে ট্যাক্সিতে রুগির বাড়ি যেতে বাধ্য করায় অবশেষে। নগেন্দ্র বলেন, ‘তা হলে ওটা বিক্রি করে তুই নতুন একটা কেন, কাগজে কত নতুন নতুন বিদেশি গাড়ির বিজ্ঞাপন দেখি, দেখতেও বেশ।’
শুনেই লাফিয়ে উঠেছিল কীর্তি। ‘বাপি, ওপেল অ্যাস্ট্রা, জার্মান গাড়ি, দ্যাখোনি স্টেফির শার্টে ওপেলের লোগো থাকে?’
অতীন অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল ছেলের দিকে।
‘স্টেফি গ্রাফ। টেনিস প্লেয়ার।’ কীর্তিও সমান অবাক হয়ে তাকায় তার বাপির দিকে। অতীন লজ্জা পেয়ে শুধু বলে ‘ওহ’।
কীর্তির ইচ্ছা মেনেই কেনা হয় অ্যাস্ট্রা। রবিবার অতীন ডাক্তারিতে বেরোয় না, সারাদিনই প্রায় বাড়িতে থাকে। সেদিন অ্যাস্ট্রাকে ধুয়েমুছে রাখার কাজটা করে কীর্তি। গাড়িটাকে সে হাত বুলিয়ে আদর করে, দু-হাতে জড়িয়ে ধরে। একটু জোরে কেউ দরজা বন্ধ করলে যেন ব্যথা পেয়েছে এমনভাবে সে ‘উহহ’ করে কাতরে ওঠে। নগেন্দ্র ঠাট্টা করে বলেছিলেন, ‘বউমা একটা বালিশ দাও কীর্তিকে, রাতে গাড়ির মধ্যে গিয়ে শুয়ে থাকুক।’
গেট খোলা আর বন্ধের জন্য একজন লোক রাখার কথা তুলেছিল অতীন। খারিজ করে দিয়ে রেবা বলেছিল, ‘শোভাই তো কাজটা করে আসছে এতকাল। এমন কিছু শক্ত ব্যাপার নয় যে পুরুষমানুষ দরকার হবে।’
নগেন্দ্র তাকে সমর্থন করে বলেছিলেন, ‘শোভা তো একটা পুরুষের সমানই, আবার দারোয়ানের কী দরকার?’
‘অতীনের আজ যেন একটু দেরি হল।’ নগেন্দ্র টেবল ক্লকটার দিকে তাকিয়ে বললেন।
রেবা ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। মুখ নীচু করে বারান্দায় বসে শোভা চুল শুকোচ্ছে। নগেন্দ্র পাশ ফিরলেন এবং তিন মিনিটের মধ্যেই ঘুমের মধ্যে প্রবেশ করলেন।
দুই
বিকালে নগেন্দ্র বেড়াতে বেরোন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেট বন্ধ করে স্থির করেন কোন দিকে যাবেন। উত্তরে, আর পশ্চিমে তিনদিকে রাস্তা গেছে। উত্তরে মিনিট সাতেক হাঁটলেই আর একটি বসত এলাকা ‘হীরকনগর’। গুটি ত্রিশ একতলা-দোতলা বাড়ি নিয়ে সাজানো সুরুচিকর একটি কলোনি, অবস্থাপন্ন লোকেরা এখানে থাকে। বছর পনেরো আগে এখানে বাড়ি তৈরি হতে শুরু করে। নগেন্দ্র এই দিকটায় বেড়াতে ভালোবাসেন। পুবদিকে তিন মিনিট হাঁটলে বিপ্লবী পূর্ণ সরকার রোড। সেটি বেঁকে পুবদিকে গেছে, পাঁচ মিনিট হাঁটলেই ডায়মন্ডহারবার রোড। এই ডায়মন্ড থেকেই হীরকনগর নামটির উৎপত্তি। নগেন্দ্র পুবদিকে কদাচিৎ যান। পূর্ণ সরকার রোড ভাঙাচোরা, অটো রিকশা ও সাইকেল রিকশা অধ্যুষিত, রাস্তার ধারে খোলা ড্রেন ও কাঁচা বাজার বসে, প্রচুর দোকান ইত্যাদি থাকায় বেড়াবার পক্ষে একদমই স্বাচ্ছন্দ্যকর নয়। পারতপক্ষে এই দিকটা তিনি এড়িয়ে চলেন।
তাঁর ভালো লাগে পশ্চিমদিকে যেতে। সাত-আট মিনিট হাঁটলেই বেরিয়ে আসে গ্রাম। পুকুর-ডোবা, খোলা জমি, ফুটবল মাঠ, খেজুর-নারকেল গাছ, ছোটো ছোটো সবজি খেত, টালির চালের মাটির ঘর। রাস্তার খানিকটা ইটবিছানো তারপরই মাটির। প্রাচীন একটা বিশাল অশ্বত্থ গাছের গুঁড়ির ধারে বিসর্জিত রং চটা, বৃষ্টিতে গলে যাওয়া শীতলা প্রতিমা পর্যন্ত তিনি হেঁটে আসেন। এখানেই ছোটো বরহাট গ্রামের সীমানা শেষ হয়ে শুরু হচ্ছে মঙ্গলতলি গ্রাম। নগেন্দ্র এখান থেকেই প্রতিবার ফিরে আসেন। দূর থেকে মঙ্গলতলিকে দেখে তার রাজার বাগানকে মনে পড়ে। হুবহু একরকম দেখতে। ওইসব গাছপালা মাটি আর খড়ের ঘর আর ক-বছর পর থাকবে না। টাকার থলি নিয়ে একদল লোক নিশ্চয়ই ঘুরে বেড়াচ্ছে গ্রামের লোকেদের লোভ দেখিয়ে জমি কেনার জন্য।
