শালের খুঁটির উপর কাঠ আর বাঁশের কাঠামো তার উপর টিনের চালা, চার ফুট উঁচু দেয়ালে ঘিরে তৈরি হয় গোয়ালঘর, শানবাঁধানো মেঝে। শুরু করেছিলেন সাতটি গোরু দিয়ে। তার মধ্যে দুটি ছিল মুলতানি। পরে তৈরি করেছিলেন জ্বাল দিয়ে ঘি তৈরি করার ঘর, কিনেছিলেন দুটি মোষ এবং আরও দুটি মুলতানি গোরু। গাওয়া আর ভয়সা দু-রকম ঘি তৈরি করে সবটাই নিয়ে আসতেন হরিচরণ ক্ষেত্রির জোড়াসাঁকোর প্যাকিং ঘরে। সেখানে আধসেরি আর একসেরি ‘রাজা ঘি’ ছাপমারা টিনে ভরে বিক্রির জন্য দোকানে দোকানে পাঠাত ‘ক্ষেত্রি ব্রাদার্স।’
নগেন্দ্র ম্যাগাজিনটা হাতে নিয়ে শোবার ঘরে এসে খাটে বসলেন। দরজা দিয়ে দেখা যাচ্ছে বারান্দায় রেবা উলের কাঁটা হাতে নিয়ে বসে। হাত চলছে না, চোখ কুঁচকে রয়েছে। নগেন্দ্র ম্যাগাজিনটা ছুড়ে রাখলেন টেবিলে। বালিশটা গুছিয়ে নিয়ে কাত হয়ে গড়িয়ে আলোয়ানটা পায়ের উপর ছড়িয়ে দিলেন।
‘বাবা!’
চোখ বুজে আসছিল, খুলে তাকালেন নগেন্দ্র।
‘বাবা হঠাৎ ওকথা বললেন কেন ডায়ালিসিসের জন্য কারোর কাছে টাকা চাইব না? ছেলে কি আপনার পর? ও আপনার জন্য কয়েক লাখ টাকা খরচ করবে না, এটা ভাবলেন কী করে?’ রেবার গলায় স্পষ্ট অভিমান।
নগেন্দ্র মনের গভীরে সুখবোধ করলেন। নির্বাচনে ভুল করেননি, প্রতিদিন মুঠোভরে টাকা পায় কিন্তু মুঠোটাকে বন্ধ করে তালা দিয়ে ফেলেনি, আলগা করে রেখেছে। খরচটা আসলে অতীন তো করবে না, করবে রেবাই। তিনি জানেন তার নরম ঠান্ডা প্রকৃতির ছেলেটি নিজের বিশ্বাসে দৃঢ় থাকলেও বউয়ের ভ্রূকুটিতে বা ছোট্ট একটা ধমকেই কাতর হয়ে পড়ে। অতীনের মা সুধারানি কখনো স্বামীর সঙ্গে গলা তুলে কথা বলেনি বরং ধমক খেয়েছে। অতীন অনেকটা ওর মায়ের মতো।
‘আমি কিছু ভেবে বলিনি বউমা।’ নগেন্দ্র ইচ্ছা করেছিল বউমা না বলে রেবা বলতে। পুত্রবধূকে নিজের মেয়ের মতো নাম ধরে ডাকবে শ্বশুর-শাশুড়ি, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু তাদের পরিবারে বউমা বলে ডাকাটাই রীতি। তিনি রীতি ভাঙতে পারেননি বা চাননি।
‘অতীন অনেক কষ্ট আর পরিশ্রম করে টাকা রোজগার করে। দেখি তো, সকালে কিছু খেয়েই বেরিয়ে পড়ে, ফেরে একটা-দেড়টায়, ঘণ্টাতিনেক বাড়িতে থেকে আবার বেরোয়। তারপর ফেরার আর ঠিক নেই। রাত দশটাও হয়, এগারোটাও হয়। দেখে আমার কষ্ট হয়। জীবনটা যে কত বিচিত্র আর মজার সেটাই ও আর জানার চেষ্টা করছে না। অথচ একসময় ও রোজ রেডিয়োয় গান শুনত, টেপরেকর্ডার কিনল গান শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়বে বলে, সিনেমায় যেত, মোহনবাগান হারলে রাতে খেত না। নিয়মিত ফ্রিহ্যান্ড ব্যায়াম করত, কোমরের মাপ বাড়লে খাওয়াদাওয়া নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ত। এখনকার কীর্তিকে দেখলে তুমি বুঝতে পারবে তখন অতীন কীরকম ছিল। ভালো কথা, তোমায় বলা হয়নি, আজ কীর্তিকে ফোন করেছিল একটি মেয়ে নাম বলল ক্ষণপ্রভা, তুমি তখন কলঘরে ছিলে, কীর্তি বাড়ি ছিল না, বলল বাড়ি এলেই যেন ওকে ফোন করে। কীর্তিকে এটা বলে দিয়ো। মেয়েটিকে চেনো নাকি?’
নগেন্দ্রর পায়ের কাছে খাটে হেলান দিয়ে চোখ নামিয়ে রেবা শ্বশুরের কথাগুলো শুনছিল, বলল, ‘আগেও ফোন করেছে, আমি ধরে কীতুকে ডেকে দিয়েছি। ওরা একই ক্লাসে পড়ে। কিন্তু বলেছে ওকে একদিন নেমন্তন্ন করে খাওয়াবে।’
রেবা ইতস্তত করছে, বলতে চায় কিছু। নগেন্দ্র মৃদুস্বরে বললেন, ‘তুমি বোধ হয় কিছু বলবে।’
‘হ্যাঁ, আপনি যা বললেন সেটা আমিও ভেবেছি। উনি কেমন যেন একটা গোলকধাঁধায় পড়ে গেছেন, সকাল থেকে রাত পর্যন্ত একই রাস্তায় ঘুরপাক খাচ্ছেন, বেরোবার চেষ্টাও করছেন না। একদিন ওকে বললাম সেই কোন যুগে ‘টিনের তলোয়ার’ দেখিয়েছিলে তারপর আর থিয়েটার দেখিনি, চলো একটা দেখে আসি। শুনেই বললেন, ‘কীতুকে বলো ও দেখিয়ে আনবে, আমি সময় করে উঠতে পারব না।’
‘আর কী বলল, একবেলা রুগি না দেখলে রুগিরা সব মরে যাবে?’ নগেন্দ্রর স্বর বিদ্রূপ ঘেঁষা।
‘না তা বলেননি। তবে যেটা বুঝলুম জীবনটাকে উনি ওর মতো করে তৈরি করে নিয়েছেন, রুগি দেখার ব্যাপারটা ওর বেশ ভালোই লাগে, টাকা না পেলেও উনি রুগি দেখে যাবেন। ব্যাপারটা প্রায় ড্রাগের নেশার মতো হয়ে দাঁড়িয়েছে। মুখে খালি বিধান রায়ের গপ্পো, রুগির মুখ দেখেই তিনি নাকি রোগটা কী বলে দিতেন। তাই উনিও চেষ্টা করেন বিধান রায় হতে।’
‘কতকগুলো টেস্ট প্রথমেই করিয়ে নিলে তো রোগ ধরা পড়ে যাবে, তাই করলেই তো পারে!’ দরকার কী বিধান রায় হবার! নগেন্দ্র সহজ গলায় পরামর্শটা যেন অতীনকেই দিলেন।
‘আমিও ঠিক তাই বললুম। তাইতে বললেন, শুধুমাত্র রুগিকে খরচ করাব কেন, প্রথমে চেষ্টা করে দেখি না।’
‘আরে বোকা, চেষ্টা করতে করতে তো অমূল্য সময় চলে যাবে, টেস্ট করলে রোগটা সঙ্গে সঙ্গে ধরা পড়বে আর সেটাই তো দরকার। বুঝি না যন্ত্রপাতির সাহায্য ছাড়াই ডাক্তারি করব এমন গুমোর করার মানে কী! এই যে এক্স-রে মেশিন, ই.সি.জি মেশিন তারপর আরও কত রকমের যে মেশিন মাথা খাটিয়ে মানুষ তৈরি করেছে, সবই কি মিছিমিছি? ওকে কোবরেজি কী হোমিয়োপ্যাথি করতে বলো বউমা, এম.বি.বি.এস অক্ষরগুলো নেমপ্লেট আর প্যাড থেকে তুলে ফেলুক। বুঝি না এমন ডাক্তারের কাছে লাইন দিয়ে রুগিরা বসে থাকে কেন!’
