রেবা হাসি টানল ঠোঁটে। শ্বশুর এখন গল্প করতে করতে প্রায়ই বলে ওঠেন, ‘কী করে পারতুম বলো তো!’ প্রশ্ন নয় অবাক হন। দরজার দিকে মুখ করে রেবা চেঁচিয়ে বলল, ‘শোভা আচারের শিশি আর বোয়েম রোদে দিয়ে যাও।’ তারপর টুল থেকে উঠে গ্রিলের ধারে গিয়ে মুখ থেকে পানের ছিবড়ে নীচের রাস্তায় ফেলল।
‘দেখে ফেলো বউমা।’
‘দেখেছি রাস্তায় লোক নেই।’
টুলে ফিরে এসে রেবা বলল, ‘আজ হাওয়াটা একটু বেশি মনে হচ্ছে, কাল ছিল তেইশ ডিগ্রি, আপনি বেশিক্ষণ আর বাইরে থাকবেন না।’
নগেন্দ্র ফতুয়ার উপর আলোয়ানটা আর একটু ভালো করে জড়িয়ে নিতে যেতেই হাত থেকে ম্যাগাজিনটা পড়ে গেল। রেবা ঝুঁকে কুড়িয়ে তুলে শ্বশুরের হাতে দিয়ে বলল, ‘কী পড়ছিলেন?’
‘আজকাল সব পত্রপত্রিকাতেই শরীর স্বাস্থ্য নিয়ে লেখা বেরোচ্ছে। লোকে এখন বাঁচার কথা খুব ভাবছে, এটা একদিক দিয়ে ভালোই, বেঁচে থাকার জন্য এই ভাবনাটা।’ নগেন্দ্র দেখলেন শালিখটা আবার উড়ে এসে বসল গ্রিলের উপর । তিনি হাসলেন। ‘পড়ছিলুম কিডনি নিয়ে এক ডাক্তারের লেখা। কিডনির রোগ কেন হয়, কী করে রোগ এড়ানো যায়, রোগ হলে কী চিকিৎসা করতে হবে এইসব। কিন্তু মুশকিল কী জানো রোগ আমরা ফেলে রাখি আর সেটাই সর্বনাশ ঘটায়। রোগ বাড়তে বাড়তে কিডনি যখন আর কোনোমতে কাজ করতে পারে না তখন তো মরা ছাড়া আর কোনো রাস্তা নেই।’
‘কেন নেই?’ রেবা বোনা থামিয়ে ভ্রূ তুলল। ‘ডায়ালিসিস করে বাঁচবে।’
ডাক্তার পুত্রের বউ কিছু ডাক্তারি জ্ঞান যে কুড়ি বছরে সংগ্রহ করেছে নগেন্দ্র তা বুঝতে পারছেন। আরও বোঝার জন্য কৌতূহলী হয়ে এগোলেন, ‘ডায়ালিসিসের খরচ কত সেটা জান কি?’
জবাব না দিয়ে রেবা শুধু মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। নগেন্দ্র বুঝলেন খরচ কত জানে না। বললেন, ‘হপ্তায় অন্তত দু থেকে তিনবার করতে হয়, মাসে খরচ মোটামুটি পনেরো হাজার টাকা। ভাবতে পারো!’
রেবা মনে মনে দ্রুত হিসেব করে নিয়ে বলল, ‘বছরে একলাখ আশি হাজার টাকা! সে তো অনেক টাকা।’
‘হ্যাঁ। যদি আমার এমন রোগ হয় তা হলে আমি কী করব বলতে পারো? একবছর, দু-বছর, তিনবছর পর্যন্ত চালাতে পারব বাড়ি জমিজমা যা আছে বিক্রি করে, ব্যাঙ্কের টাকা তুলে কিন্তু সেও তো একদিন ফুরিয়ে যাবে। ডায়ালিসিস ব্যাপারটা কষ্টকর, অতীন দু-বেলায় তিনটে জায়গায় বসে, পেসেন্টের বাড়ি ভিজিটেও যায় বোধ হয়, মাসে হাজার পঞ্চাশ রোজগার করে, ঠিক বলছি?’
রেবা অস্ফুটে বলল, ‘কাছাকাছি। ফি এখনও পঞ্চাশ টাকাই রেখেছেন রুগিদের অবস্থার কথা ভেবে নয়তো দু-বছর আগেই একশো টাকা করতে পারতেন। ওর বন্ধু ডাক্তার বিশ্বাস নিউরোলজিস্ট, তিনি তো ফি দুশো টাকা করে দিয়েছেন।’
হঠাৎই একদিন দেখে ফেলেছিলেন রেবার মুঠোয় নোটের গোছা, আলমারির লকারে মুঠো ঢুকিয়ে গোছাটা ভিতরে রাখছে। তিনি জানেন অতীন ব্যাঙ্কে টাকা রাখেন খুবই কম, বেশিরভাগটাই খাটে নানান মিউচুয়াল ফান্ডে আর ডাকঘর স্বল্প সঞ্চয়ে। অতীনের রোজগারের কথাটা তিনি তুললেন। শুধু রেবাকে একটা কথাই বলার জন্য, মাসে আধ লাখ টাকা রোজগার করা ছেলে বুড়ো বাবার ডায়ালিসিস কতদিন কর্তব্য বোধের চাপে চালাবে? তা ছাড়া তিনি ছেলের কাছ থেকে সাহায্য নেবেনই বা কেন?
রেবার মুখে হঠাৎই একটা ছায়া যেন পড়তে দেখলেন। ওকে আশ্বস্ত করার জন্য বললেন, ডায়ালিসিসের জন্য কারোর কাছ থেকে আমি টাকা চাইব না।’
‘তা হলে?’
রেবার মুখ থেকে ছায়াটা সরল না দেখে তিনি মুখ ঘুরিয়ে রাস্তার ওপারের চারতলা বাড়িটার দিকে তাকিয়ে সহজ গলায় বললেন, ‘তা হলে আর কী, পৃথিবী থেকে অদৃশ্য হয়ে যাব।’
‘তার মানে?’
নগেন্দ্রনারায়ণ জবাব দিলেন না।
‘আপনি কি তা হলে সুইসাইড করবেন!’ রেবার স্বরে আতঙ্ক।
নগেন্দ্র তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করলেন পুত্রবধূর মুখের ভাবটা। ভয়ে শুকিয়ে গেছে। ঢোঁক গিলল। শিরদাঁড়া আলগা হয়ে কুঁজো হয়ে যাচ্ছে। হাতের কাঁটা চলছে না।
হেসে উঠে নগেন্দ্র বললেন, ‘আরে দূর, একেই বলে গাছে কাঁঠাল গোঁফে তেল! আগে কিডনিটা অকর্মণ্য হোক তারপর তো ডায়ালিসিসের প্রশ্ন আসবে। তা ছাড়া কিডনি ট্রান্সপ্ল্যান্টও তো করা যেতে পারে। তোমাদের কারোর একটা কিডনি পেলে আর সেটা বসাবার জন্য লাখ দুই টাকা খরচ করলেই তো বেঁচে যাবে। এখানে যা জমি আছে তা বেচে ও টাকা আমার জোগাড় হয়ে যাবে। আর বসব না, শীত করছে।’
নগেন্দ্র উঠে দাঁড়ালেন। হাওয়াই চটিতে পা গলিয়ে বললেন, ‘একতলায় ভাড়াটে আসছে কবে?’
‘আসার কথা তো পয়লা তারিখে, ভদ্রলোক তো তাই বলে গেলেন।’
‘কে জানে কেমন লোক হবে!’
একতলাটা বড়োছেলে যতীন্দ্রনারায়ণের। সে পাটনায় থেকে ওকালতি করে। রোজগারের দিক থেকে অতীন যতটা সফল তার দাদা ততটা নয়। পাটনা থেকে যতীন বছরে একবার সপরিবারে কলকাতায় আসে, ওঠে গোয়াবাগানে শ্বশুরবাড়িতে। একদিন এসে বাবার সঙ্গে দেখা করে যায়। নগেন্দ্র বাড়িটি দুই ছেলেকে ভাগ করে দিয়েছেন জীবদ্দশাতেই। তিনি চান না তাঁর মৃত্যুর পর বাড়ির অংশ নিয়ে ছেলেদের মধ্যে সম্পর্ক নষ্ট হোক।
প্রতাপনারায়ণ পঞ্চাশ বিঘা জমি কিনেছিলেন মুর্শিদাবাদের এক জমিদারের কাছ থেকে, যাকে স্থানীয় লোকেরা রাজাবাবু বলত। আর জায়গাটাকে বলত রাজার বাগান। বাবার দেওয়া বাড়ি সমেত এই বাগানেই নগেন্দ্র তার ডেয়ারি করেছিলেন পঞ্চাশ বছর আগে।
