‘ফুটপাথ দিয়ে হাঁটা যায় না বাবা, গিজগিজে ভিড় আর ফুটপাথে ছড়ানো মালপত্তর নিয়ে দোকান। আপনার ছেলে কাল বলল, গোলপার্ক থেকে গড়িয়াহাট মোড় ওইটুকু রাস্তা যেতেই গাড়িতে দশ মিনিট লেগে গেল।’
‘লোকটার দূরদৃষ্টি ছিল, এটা না থাকলে ব্যাবসা করে বড়ো হওয়া যায় না। পঞ্চাশ-পঞ্চান্ন বছর আগেই বুঝে গেছল ঝোপ-জঙ্গল ডোবা বাঁশবন ভরা শেয়ালডাকা জায়গাটা একদিন ব্যাবসাবাণিজ্যের বিশাল সেন্টার হয়ে উঠবে। একটা দুটো নয়, ক্ষেত্রিরা চার চারটে দোকান করে। তার মধ্যে একটা শাড়ির আর একটা ওষুধের, অতীন তো সেদিন বলল, নানান রকমের অসুখ পরীক্ষার একটা সেন্টারও খুলছে, রমরমিয়ে চলছে। দারুণ সব যন্ত্রপাতি নাকি আনিয়েছে।’
‘উনি বলেন, আগে যেসব রোগ আন্দাজে বা অভিজ্ঞতা দিয়ে ডাক্তাররা ধরতেন, এখন যন্ত্রেই নিখুঁতভাবে ধরা পড়ছে, ডাক্তারদেরও সুবিধে হচ্ছে চিকিৎসা করতে। দেখবেন লোক মরছে খুব কম, আমাদের আয়ু নাকি বেড়ে গেছে।’
‘আমাদের মানে কাদের আয়ু বাড়ার কথা বলছ বউমা?’ নগেন্দ্র চোখটা সরু করে রেবার দিকে তাকালেন। রেবা মুখের মধ্যে গালের একধারে পান রেখে কথা বলছিল। এবার সে চিবোতে শুরু করল। নগেন্দ্র ঠোঁট ও চোয়ালের নড়াচড়া দেখতে লাগলেন। অতীনের বিয়ের জন্য সাত-আটটি মেয়ে দেখার পর তিনি খবরের কাগজে ‘গ্র্যাজুয়েট প্রকৃত সুন্দরী’ পাত্রী চেয়ে বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন। ফোটোসহ আঠাশটি চিঠি পান, তাতে ডাক্তার, কলেজ শিক্ষিকা, কবি এবং সরকারি অফিসারও ছিল। অবশেষে তিনি মনোনীত করেন খদ্দরপরা এক স্কুল শিক্ষকের সাধারণ গ্র্যাজুয়েট কনিষ্ঠ কন্যা রেবাকে, যাকে দেখে মনে হয়েছিল ব্যক্তিত্বসম্পন্না, গেরস্থ এবং অবশ্যই রূপবতী।
রেবা উলবোনা থেকে চোখ নামিয়ে বলল, ‘যারা ভালো ডাক্তার দেখায়, ঠিকমতো টেস্ট করে, ওষুধপত্তর খায় তারাই বেশিদিন বাঁচে।’
‘তুমি যা বললে সেগুলো কি একটা চাষি বা মেছুনির পক্ষে পাওয়া সম্ভব? সম্ভব নয়। অথচ আমাদের দেশে গরিব লোকেরাই সংখ্যায় বেশি। এমনকী তেমন কোনো রোগ হলে আমার পক্ষেও চিকিৎসা করা কঠিন হবে।’
রেবা মুখ তুলে জিজ্ঞাসু চোখে শ্বশুরের দিকে তাকিয়ে হেসে বলল, ‘এই বয়সে আপনার যা স্বাস্থ্য অসুখবিসুখ ধারেকাছে আসবে না।’
একটা লেপ নিয়ে শোভা এল বারন্দার গ্রিলের উপর মেলে দেবার জন্য। বছর দশেক সে এই পরিবারে দিনরাতের কাজের লোক। সুন্দরবনের একটি দ্বীপে তার বাড়ি, স্বামী-স্ত্রী নদীতে নেমে বাগদার মীন ধরছিল, স্বামীকে কুমিরে টেনে নিয়ে যায়। শোভার গা ঘেঁষেই কুমির এগিয়ে এসে স্বামীকে ধরে, কেন যে তাকে ধরল না সেটা এখনও ভাবলে সে শিউরে ওঠে। ‘আমারে বলল জালটা নিয়ে আস্তে আস্তে আমার দিকে আয়। আমি তখন একমনে মীন খুঁজতেছি তখন একটা কাঠের মতো কী যেন ভেসে আইসা আমার কোমরের কাছে লাগল, বর্ষাকালে নদীতে তখন খুব জল, আমি তো জালের দিকে তাকাইয়া হঠাৎ শুনি ও চেঁচাইল ‘শোভারে আমাকে ধরছে’, মুখ তুলে দেখি ওর হাতদুটো ডুবতেছে, তারপর দেখি জলের মধ্যে ঝাপটাঝাপটি চলছে। কী করব ভেবে পাইলাম না, তাড়াতাড়ি ডাঙায় উঠে দৌড় দিলাম।’
শোভার কথা শুনে নগেন্দ্র বলে, ‘কুমিরে তো প্রথমে তোকেই ধরার কথা, তা যখন ধরেনি তুই অনেকদিন বাঁচবি।’
রেবার সঙ্গে আয়ু নিয়ে কথা হচ্ছে। শোভাকে দেখে এখন নগেন্দ্রর মনে পড়ল, ‘অনেকদিন বাঁচবি’ বলেছিলেন। এ বাড়িতে আসার পর শোভার একবারও জ্বরজারি হয়েছে বলে কেউ মনে করতে পারে না এমনকী সর্দিকাশিও নয়। রোগা, লম্বা কাঠামো, রং নদীর মাটির মতো, কষ আছে শরীরে, বয়স বোঝা যায় না। রেবার অনুমান পঞ্চাশ তো অবশ্যই পেরিয়েছে।
‘বউমা আমার স্বাস্থ্য দেখে মনে কোরো না আমি খুব সুস্থ।’ বলেই নগেন্দ্র শোভাকে উদ্দেশ্য করে বললেন, ‘লেপটা অত বাইরের দিকে ঝুলিয়ে দিসনি, বেশ হাওয়া রয়েছে নীচে পড়ে যেতে পারে।’ এবার রেবার দিকে মুখ ফিরিয়ে, ‘দেহের মধ্যে কোথায় কী রোগ কুমিরের মতো ঘাপটি মেরে আছে তা কেউ বলতে পারে না আমিও পারি না। অমন যে ভীমের মতো শক্তিমান ভবানী যাকে শ্মশানে নিয়ে যেতে আটটা লোককে কাঁধ দিতে হয়েছিল, এমন দশাসই চেহারা। সে কী জানত মাথায় হঠাৎ ব্যথা হবে, সামান্য জ্বরও, তার দু-দিন পরই মারা যাবে? এটা আমার জন্মের তিনবছর আগের ঘটনা, বাবার মুখে শুনেছি, মেডিক্যাল কলেজের প্রিন্সিপ্যাল ডাক্তার বার্নাডো স্টেথিস্কোপ ভবানীর বুকে লাগিয়ে হার্টবিট শুনতে পাননি, বুকে চার ইঞ্চি পুরু চর্বি! ব্যাপারটা বুঝেছ? রাক্ষসের মতো গাদা গাদা খেয়েছে আর চর্বি জমিয়েছে তারই ফল ফলল।’
হাত নেড়ে লেপের উপর বসা শালিখটাকে তাড়িয়ে রেবা বলল, ‘তখনকার বেশিরভাগ পালোয়ান খুব একটা শিক্ষিত ছিল না, ভাবত এন্তার খেলেই বুঝি গায়ের জোর বাড়বে। আমি কিন্তু মেপে খাই, উনি বলে দিয়েছিলেন যেমন যেমন পরিশ্রম করবে তেমন তেমন খাবে, ভাজাভুজি ছোঁবে না। অক্ষরে অক্ষরে আমি তা মেনে চলেছি। আচ্ছা মারা যাবার সময় ভীম ভবানীর বয়স কত ছিল?’
‘চৌত্রিশের কাছাকাছি। এখন আমি বুঝতে পারছি আমার রাক্ষুসে খাওয়া বন্ধ করে দিয়ে মা আমার কী উপকারটাই না করেছেন। তোমাকে তো বলেছি ভীম ভবানী হবার জন্য কীরকম খেতুম। বাবার তখন পয়সা ছিল, ষোলোবছর বয়সে আটটা কাঁচা মুরগির ডিম, ছ-টা মর্তমান কলা। দু-সের দুধ, আধসের মাংস, ইয়াবড়ো গেলাসে চার গেলাস পেস্তাবাদামের শরবত, পনেরোটা রুটি। ভাবতে পারো বউমা? এখনকার বডি বিল্ডার ছেলেরা শুনলে তো হেসে গড়িয়ে পড়বে। মা যদি বন্ধ করে না দিত তা হলে ওটাই তো চালিয়ে যেতাম, না থেমে তখন পাঁচশো বৈঠক, দুশো ডন দিতাম, মনে রাখবে, না থেমে!’ নগেন্দ্রর চোখে ষাট বছর আগের ডন-বৈঠক দেওয়ার বিস্ময় ফুটে উঠল। ‘কী করে পারতুম বলো তো!’
