নগেন্দ্রর ব্যায়ামবীর হওয়ার স্বপ্ন বিনষ্ট হয়ে যায় বাবার দ্বিতীয় বিবাহে। বিমাতা বাড়িতে পদার্পণ করেই সাংসারিক ব্যয়সংকোচে মনোযোগী হয়ে পড়েন কেননা তখন প্রতাপনারায়ণের ব্যাবসা একটা গুরুতর ধাক্কা খেয়েছে। আড়িয়াল খাঁ-য় প্রবল ঝড়ে মালপত্র সমেত স্টিমারটি ডুবে যাওয়ায় প্রতাপ বিধ্বস্ত, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ তখন তুঙ্গে। জাপান সিঙ্গাপুর দখল করে রেঙ্গুনের দিকে এগোচ্ছে। বাজার থেকে চাল-পাট উধাও। প্রতাপ বুঝলেন এবার তিনি মধ্যবিত্ত হতে চলেছেন। যেখানে যা সঞ্চিত অর্থ ছিল তা সংগ্রহ করে এবং কুসুমকুমারীর কিছু গহনা বিক্রি করে তিনি তাই দিয়ে স্ত্রীর নামে স্থাবর সম্পত্তি কিনতে থাকেন। কলকাতায় তখন জাপানি আক্রমণের ভয়ে জলের দামে বাড়ি বিক্রি করে বহুলোক গ্রামে চলে যাচ্ছিল। প্রতাপনারায়ণ এক লাখ টাকায় কিনে ফেলেন তিনটি বাড়ি।
প্রখর ব্যক্তিত্বের অধিকারিণী কুসুমকুমারী ব্যয়সংক্ষেপ করতে গিয়ে প্রথমেই অর্ধেক করে দেন নগেন্দ্রর ভোজন তালিকাটি। বাদাম-পেস্তার শরবত, ডিম, দুধ, মাংস কমে গেল তো বটেই ব্যায়ামের জন্য চার ঘণ্টা সময়ও ছাঁটাই করে দু-ঘণ্টায় নামিয়ে দেন। নগেন্দ্রকে তিনি জানিয়ে দেন, ‘ব্যায়াম করার থেকেও ভালো কাজ লেখাপড়া করা, ভবিষ্যতে তোমার ভালো হবে, বাড়িরও ভালো হবে। আমাদের এখন এত টাকা নেই যে রোজ রোজ তোমাকে হাতির খোরাক জোগাতে পারব, সবাই যা খাচ্ছে তাই খাবে। ম্যাট্রিক পরীক্ষা তো এসে গেল, দু-জন মাস্টার আছে আরও একজন রাখব, ব্যায়ামের সময় কমিয়ে এখন থেকে সেই সময়টায় পড়ো।’
নগেন্দ্রর মাথায় হাত বুলিয়ে কথাগুলো বলেছিলেন কুসুমকুমারী। তিনি অত্যন্ত সজাগ ছিলেন সৎপুত্রের প্রতি সৎমায়ের মনোভাব ও আচরণ সম্পর্কে যেসব অপবাদ দেওয়া হয় সেটা যেন তার ভাগ্যে না জোটে এবং তাই করতে গিয়ে আদিখ্যেতার বাড়াবাড়িও যাতে না ঘটে সেদিকেও তার দৃষ্টি ছিল। ব্যায়ামবীর হওয়ার পথে পাঁচিল তুলে দেওয়ায় নগেন্দ্র খুবই রুষ্ট হন। বাবার কাছে এই নিয়ে নালিশও জানান। প্রতাপনারায়ণ জবাব দিয়েছিলেন, ‘মুগুর ভেঁজে আর ডন-বৈঠক দিয়ে শেষ পর্যন্ত একটা পালোয়ান হবি তাতে লাভটা কী? এখন থেকে রোজগারের কথা ভাব, আমাদের আর আগের অবস্থা নেই।’
নগেন্দ্রনারায়ণ ম্যাট্রিকে প্রথমবার ফেল করে দ্বিতীয়বারে তৃতীয় ডিভিশনে পাশ করেন। কুসুমকুমারীর পরামর্শে প্রতাপনারায়ণ তাকে ডেকে বলে দেন, ‘পড়াশুনো তোর দ্বারা হবে না, এই বিদ্যে নিয়ে চাকরিও কোথায় পাবি না তার থেকে বরং এখনই কোনো ব্যাবসা শুরু করার চেষ্টা কর।’
ভীষণ ফাঁপরে পড়ে যান নগেন্দ্র বাবার কথা শুনে, কী ব্যাবসা করবেন? তা ছাড়া কীভাবে ব্যাবসা করতে হয় সেটাই তো জানেন না। স্কুলের বন্ধু অমল ক্ষেত্রিদের মিষ্টির দোকান ‘ক্ষেত্রি ব্রাদার্সের’ তখন বিশাল নাম, কলকাতায় চারটে ব্রাঞ্চ। নগেন্দ্র ধরে পড়লেন অমলকে। সে নিয়ে গেল তাদের ব্যাবসার প্রধান কর্তা জ্যাঠামশাই হরিচরণ ক্ষেত্রির কাছে। ভাইপোর বন্ধু আর বয়সটাও কাঁচা এবং কিছুক্ষণ কথা বলেই বুঝে গেলেন ছেলেটার ব্যাবসা বুদ্ধি একদমই শূন্য। উৎসাহ দিলেন না, নিরুৎসাহিতও করলেন না, শুধু বললেন, ‘কিছুদিন দোকানে এসে আমার কাছে বসো, চোখ কান খুলে বুঝে নাও কীভাবে ব্যাবসা চালাই, কীভাবে হিসেবপত্তর রাখি, কাঁচামাল কিনি, তৈরি জিনিস বেচি। তারপর ঠিক করো কী ব্যাবসা তুমি করবে।’
নগেন্দ্র একমাস হরিচরণের পাশে বসে চোখ কান খুলে দেখলেন ও শুনলেন এবং ঠিক করলেন দুধের ব্যবসায় নামবেন। ক্ষেত্রি ব্রাদার্সদের চারটে দোকানের জন্য প্রতিদিন কম করে চার মণ দুধ লাগে, ছানা, দই, ক্ষীর ও রাবড়ির জন্য তো বটেই ওরা ঘি-ও তৈরি করে খুচরো বিক্রি করে। ওদের নিজেদের গোশালা আছে বারুইপুরে, সেখান থেকে রোজ দুধ আসে ভ্যান লরিতে জোড়াসাঁকোর কারখানায়। নগেন্দ্র বারুইপুর, জোড়াসাঁকো ঘুরে সবকিছু খতিয়ে দেখে নেয়।
হরিচরণ নগেন্দ্রর দুধের ব্যবসায় নামার ইচ্ছার কথা শুনে বলে, ‘ভালোই তো, তোমাদের তো কোথায় যেন অনেক জমি আছে সেখানেই ডেয়ারি করো, আমি তোমার কাছ থেকে দুধ নেব। সাউথ ক্যালকাটায় লোক বাড়ছে, বালিগঞ্জের দিকে নতুন নতুন রাস্তা হচ্ছে, নতুন নতুন বাড়ি উঠছে, আমরা রাসবিহারী অ্যাভিনিউয়ে গড়িয়াহাট মোড়ের কাছাকাছি দোকান খোলার জন্য ঘর খুঁজছি, তখন দুধের দরকার হবে। নর্থ আর সেন্ট্রাল ক্যালকাটা তো ঘিঞ্জি, সচ্ছল কালচার্ড লোকেরা এখন সাউথের ডেভেলপড জায়গায় বাড়ি করছে। তুমি দেখে নিয়ো কুড়ি-পঁচিশ বছরের মধ্যে ওদিকটায় লোক কত বেড়ে যাবে।’
কথাগুলো হরিচরণ বলে ছিল দেশভাগের দু-বছর আগে। পঁচাত্তর বছর বয়সে নগেন্দ্রনারায়ণ বারান্দায় চেয়ারে বসে অঘ্রানের রোদ পোয়াতে পোয়াতে পাশে টুলে বসা পুত্রবধূকে তার প্রথম যৌবনের কথা শোনাচ্ছিলেন। রেবা তার ছেলে কীর্তিনারায়ণের জন্য সোয়েটার বুনছে, যন্ত্রের মতো তার হাতের কাঁটা চলেছে।
‘লোকটার দূরদৃষ্টি ছিল স্বীকার করতে হবে। তখন ওই গড়িয়াহাটা মোড় কী ছিল আর আজ কী হয়েছে! বহু বছর ওদিকটায় যাই না। তুমি তো যাও, কী দাঁড়িয়েছে বলো তো?’
