‘মেজোমামা জান,’ টাবলি বলল, ‘রাতে আমি তিনখানা রুটি খাই। মা একটা রুটি থেকে একটু ছিঁড়ে, চারখানা করে দেবে।…কী সুপারস্টিশাস! তিনটে দিলে তিন শত্তুর হয় বলে ওই পদ্ধতিতে চারখানা?’
‘আচ্ছা মেজদা, তিনখানা দিলে তিন শত্তুরই তো হয়, হয় না?’
সহদেব হেসে মাথা নাড়ল। এই অনি ছ মাস আগে আলুথালু হয়ে ছুটে গেছল। ‘ওর একদিন কি আমারই একদিন। অনেক সয়েছি মেজদা।’ সেই অনিই আধপোড়া বোনকে নার্সিং হোমে রেখে জলের মতো টাকা খরচ করল, বাঁচিয়ে তোলার জন্য।
এইভাবেই জীবন বয়ে চলেছে। সহদেব জানে এই সব সস্তার দার্শনিক কথাবার্তা শুনতে ও শোনাতে ভালোই লাগে। এর মধ্যে কোনো জটিলতা নেই, চাষাভুষোরাও বুঝতে পারে। কিন্তু জীবন কি এতই সরলভাবে বয়ে যাচ্ছে?
শিঙাড়া, সন্দেশ, চা এল। নাকছাবিটা আবার পরেছে প্রতিভাদি। কাবলি আবার একটা অঙ্ক ফেঁদেছে। ‘এম এম এম, এক কিলোটনের একটা বোমা মানে হাজার টন টি এন টি। হিরোশিমায় যে অ্যাটম বোমাটা ফেটেছিল সেটা কুড়ি কিলোটনের, মানে কুড়ি হাজার টন টি এন টি এন টির, তাতে মারা গেছল এক লাখ একচল্লিশ হাজার মানুষ। মনে রাখ এটা। এবার, এক মেগাটন মানে দশ লক্ষ টন টি এন টি, পৃথিবীতে এখন বারো হাজার মেগাটন ক্ষমতার বোমা জমা করে রাখা আছে। সবগুলো একসঙ্গে যদি ফাটে তা হলে বারো হাজার ইনটু দশ লক্ষ টন টি এন টি, তা হলে কটা হিরোশিমার লোক মারা যাবে?’
‘লিখে দে, বাড়ি গিয়ে উত্তরটা বার করব। তবে অঙ্ক না কষেই বলতে পারি পৃথিবী থেকে মানুষ সাফ হয়ে যাবে?’
‘তা হলে বোমা বানিয়ে লাভ কী হল?’
এর উত্তর আমি জানি না কাবলি। অনেক প্রশ্নেরই উত্তর অজানা থেকে গেছে। তোর বাবা যে টাকা শমিকে বাঁচাবার জন্য দিল সেটা বিদ্যুৎকে দিলে ঘটনাটা একদমই ঘটত না। ঊর্মি যদি ছুটে গিয়ে শমিকে জড়িয়ে উঠোনে ফেলে, আগুন না নেভাত তাহলে ও বাঁচতে পারত না। কিন্তু ঊর্মির মতো সাহস আমি দেখাতে পারলুম না কেন? অতই যদি সাহসী তা হলে একটা বদমাসের হাতের পুতুল হয়ে ঊর্মি ছিল কেন?
বাড়ি ফেরার সময় সহদেব বাসে দাঁড়িয়ে এই সব ভাবল। একবার তার মনে হল, যদি সে কেয়াকে প্রত্যাখ্যান না করত তা হলে কেয়া কি বড়ো হয়ে ওঠার জন্য সাধনা করত? কে জানে! অনেক প্রশ্নেরই উত্তর অঙ্কর নিয়মে পাওয়া যায় না।
কড়া নাড়তে দরজা খুলল বিদ্যুৎ। এখন ওর গলার আওয়াজ একদমই পাওয়া যায় না। বোঝাই যায় না ও বাড়িতে আছে। সহদেব দোতলায় ওঠার আগে ওদের ঘরের দিকে তাকাল। টিভি চলছে। সেবা খাটে বসে।
‘মেজদা খাবার দেব?’
‘দে।’
সহদেব দোতলায় উঠে এল। শমি থালা হাতে একটু পরেই এল। পরনে গলা থেকে পা পর্যন্ত ঢাকা ম্যাকসি। আধখানা মুখে পোড়া দাগ এখনও মেলায়নি। মেলাবেও না। একটা কান গলে গেছে। শমি আর বাড়ি থেকে বেরোয় না।
কাবলির দেওয়া কাগজের টুকরোটা ফেলে দিতে গিয়েও সহদেব ফেলতে পারল না। অঙ্কটা কষে ওদের তাক লাগিয়ে দিলে কেমন হয়! কলমের খোঁজে সে ছোটো ঘরটায় এল। চেয়ারে বসে একটা সাদা কাগজের জন্য র্যাকের দিকে তাকাতেই সার সার পুরোনো ফাইলগুলোয় তার চোখ পড়ল।
ওর কোনো একটার মধ্যে ‘তাজমহল’ গল্পটা আছে। কোনটায়? একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকতে থাকতে সহদেবের মনে পড়ল, তাজমহল তো সে দেখে এসেছে!
রাজা গার্ডেন
এক
অঘ্রানের শেষাশেষি ভাত খেয়ে উঠে দুপুরে রোদ্দুরে বসে থাকার আরামের মতো সুখের কিছু হয় না। নগেন্দ্রনারায়ণ রায়চৌধুরী ছিয়াত্তরে পড়েছেন গত ফাল্গুনে, তার মনে হয় এটা তার জীবনের অন্যতম সেরা বিলাসিতা, এই বারান্দাটায় দুপুরে ঘণ্টাখানেক চেয়ারে বসে খবরের কাগজ অথবা সাপ্তাহিক পত্রিকা পড়া। পড়ার ব্যাপারে তার বাছ-বিচার নেই, বিজ্ঞান স্বাস্থ্য ধর্ম সিনেমা পুস্তক সমালোচনা রাজনীতি ভ্রমণ ইত্যাদি বিষয়ে লেখাটি আকর্ষণীয় বোধ করলেই তিনি পড়ে ফেলেন। পড়ার পরই সদ্য আহরিত তথ্যটি কাউকে জানিয়ে দেবার জন্য তিনি ব্যাকুলতা বোধ করেন। কাছাকাছি পুত্রবধূ রেবা অথবা পরিচারিকা শোভা যদি থাকে তা হলে তাদের জানিয়ে দিয়ে স্বস্তি লাভ করেন। এই দুটি স্ত্রীলোক ছাড়া দুপুরে আর কেউ এই পরিবারে লভ্য নয় তাঁর কথা শোনার জন্য। পুত্র অতীন্দ্রনারায়ণ খুবই ব্যস্ত ডাক্তার, আক্ষরিক অর্থেই তার নাওয়া খাওয়ার সময় নেই, নাতি কীর্তিনারায়ণ বারো ক্লাসের ছাত্র, এবারই উচ্চচ-মাধ্যমিক পরীক্ষা দেবে। বালিগঞ্জে যে কলেজে কীর্তি পড়ে সেখানে লেখাপড়ায় কমজোরি ছেলেরা বারো ক্লাসে পৌঁছতে পারে না সুতরাং ধরে নেওয়া যায় সে ছাত্র হিসাবে গড়-পড়তার ঊর্ধ্বে।
বিপত্নীক নগেন্দ্র নাতিস্থূল, গৌরবর্ণ, মাথার চুল ও ভুরু সাদা, দীর্ঘদেহী। যৌবনে ইচ্ছা ছিল ব্যায়ামবীর হওয়ার। তাঁর আদর্শ ছিল ভীমভবানী। বাল্যেই তিনি বাবা প্রতাপনারায়ণের সঙ্গে বরিশাল থেকে কলকাতায় চলে এসে ভরতি হন স্কটিশচার্চ স্কুলে। দেশে জমিদারির দায়ভার জ্যাঠা ও কাকার হাতে ছেড়ে দিয়ে কলকাতার সিমুলিয়ায় অর্থাৎ সিমলায়, একটা পুরোনো স্টিমার ও গাদাবোট কিনে তিনি পণ্য পরিবহণ ও পূর্ববঙ্গ থেকে চাল ও পাট আমদানির ব্যাবসা শুরু করেন। ব্যাবসা লাভজনক হয়ে উঠতেই তিনি কলকাতার দক্ষিণ প্রান্তে অনুন্নত পল্লি অঞ্চলে গাছপালা পুকুর সমেত প্রায় পঞ্চাশ বিঘা জমি কিনে একটি দোতলা বাড়ি তৈরি করেন। এই সময়ে তাঁর স্ত্রী অর্থাৎ নগেন্দ্রর মা মারা যাওয়ায় তিনি দ্বিতীয়বার বিয়ে করেন। তাঁর দ্বিতীয় পক্ষের স্ত্রী কুসুমকুমারীর সন্তানাদি এখন সিমলার বাড়িতে থাকে।
