এই পর্যন্ত বলে, থেমে ঊর্মি লক্ষ করল সহদেবের প্রতিক্রিয়া। সহদেব নড়ে বসে বলল, ‘মার কী হল?’
‘ব্লাড ক্যানসার, ন্যাচারালি মারা গেলেন। আমরা দু-তিনবার এইভাবে বাইরে গেছি পুরী, পণ্ডিচেরি, গোয়া, স্বামী-স্ত্রী হয়ে, বলা বাহুল্য কৌমার্য বহু আগেই হারিয়েছি। বাবা এসবের কিছুই কিন্তু জানেন না। অতি সরল, পড়াশুনো পাগল, আদর্শ মেনে চলা এক সামান্য কেরানি। এখনও আমার এই একটাই ভয় বাবা যেন না জানতে পারেন। কিছুতেই নয়, কোনোভাবেই যেন এসব কথা ওঁর কানে না পৌঁছয়।
‘প্রত্যেক মানুষেরই একটা নোঙর থাকে, নইলে সে ভেসে চলে যায় জীবনের বাইরে। বাবাই আমার নোঙর। সহদেবদা, আমি কিন্তু জীবনকে খারাপ, ভালো সবরকম ভাবেই গ্রহণ করতে চাই। কিন্তু তা করার জন্য যে মনের জোর দরকার, সেটাই আমার নেই।
‘আমি একটা বোকা, কী ভয়ংকর বোকামি যে করেছি এখন তা বুঝতে পারছি। আমার কিছু ফোটো ওর কাছে আছে, কিছু চিঠিও। লোকটাকে দেখতে কেমন তা তো আপনি নিজেই জানেন। খারাপ নয়। কিন্তু ওর শিক্ষা, রুচি, ব্যবহার, ওর অনুভূতি ওর বোধ বুদ্ধি, ওর হৃদয় কিছুই আর আমার কাছে গ্রহণযোগ্য মনে হচ্ছিল না। আমি ওর থেকে দূরে সরে যাবার চেষ্টা করছিলাম। আসানসোল থেকে পাঁচ মাইল ভিতরে স্কুলের চাকরিটা পেয়েই কলকাতা ছাড়ি। আসলে ওর কাছ থেকে পালাবার জন্যই। কিন্তু সমানে আমাকে তাড়া করে যাচ্ছিল।’
দু-হাত তুলে বাস থামাবার মতো সহদেব ওকে থামাল। ‘আর কিছু বলার দরকার নেই, শোনার কোনো আগ্রহও বোধ করছি না। খুবই সেকেলে গল্প। অবোধ সরল বালিকা আর কুটিল, খল নায়ক। অতঃপর মঞ্চে গুণবান, সহৃদয়, খ্যাতিমান পঙ্কজ মাইতির প্রবেশ এবং বালিকার হুঁশ ফিরে আসা, তাই তো?’
ঊর্মি নিষ্পলক সহদেবের মুখের দিকে তাকিয়ে, তার চোয়ালের পেশি দপদপাল। মুখ কঠিন হয়ে উঠেছে।
‘এখন মনে হচ্ছে এখানে না এলেই হত।’
‘এ কথা মনে হওয়ার কারণ?’
‘আপনি বিদ্রূপ করলেন, অতি সাধারণ একটা মন এর মধ্য থেকে বেরিয়ে এল। আমি যে দুঃসহ, অপমানকর অবস্থার মধ্য দিয়ে গেছি আর তার থেকে বেরিয়ে আসার চেষ্টা করছি সেটাই আপনি ধরতে পারলেন না। …ইয়েস আই লাভ পঙ্কজ, সত্যিকারের ভালোবাসা।…লোকটা আমাকে ভয় দেখিয়েছে, বাবার কাছে ধরিয়ে দেবে বলেছে। কিন্তু আমি বাবাকে আঘাত দিতে চাইনি, সেজন্য আমি নিজেকে বিক্রি করেছি, আমার চরিত্র মাপার একটা কি মাপকাঠি?… পঙ্কজকে মিথ্যে বলেছি, মাস্তানের গল্প সাজিয়েছি। কিন্তু আর নয়।’
সহদেব গালে হাত দিয়ে টেবলে কনুইয়ের ভর রেখে শুনে যাচ্ছিল। ঊর্মিকে দাঁড়িয়ে উঠতে দেখে, বসার জন্য হাত নেড়ে বলল, ‘আর নয়-এর মানেটা কী? পঙ্কজের কাছে কনফেস করবেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘সেটা আগেই করেননি কেন? … ইউ আর স্টিল অ্যান ইডিয়ট … এতদিনেও ওকে সব খুলে বলেননি কেন? এ সব ব্যাপার চেপে যাওয়ার ফল কী হতে পারে জানেন?’
‘মেজোমামা, মেজোমামা শিগ্গিরি এসো… মা পুড়ে যাচ্ছে।’ নীচের থেকে সেবার আকুল চিৎকার ভেসে এল।
‘কী ব্যাপার! কে পুড়ে যাচ্ছে?’ ঊর্মি সচকিত হয়ে সহদেবের দিকে তাকাল।
‘ও মেজোমামা শিগ্গিরি এসো, মা মরে গেল।’
সহদেব চেয়ার ছেড়ে ওঠার আগেই ঊর্মি ছুটে ঘর থেকে বেরোলো। বারান্দা থেকে নীচে তাকিয়েই সে সিঁড়ি দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে নীচে নেমে গেল।
সহদেবও বারান্দায় এসে উঠোনে তাকাল। তখনই শমিকে জাপটে ধরে উঠোনে ফেলে ঊর্মি গড়াগড়ি দিল। ধোঁয়া বেরোচ্ছে শমির দেহ থেকে। কেরোসিনের গন্ধ সহদেবের নাকে লাগল। উঠোনের একধারে ক্রাচ বগলে সেবা বিস্ফারিত চোখে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে। পাশের বাড়ির জানলা থেকে একজন চিৎকার করল, ‘অ্যাম্বুলেন্স ডাকুন, এক্ষুনি হাসপাতালে নিয়ে যান।’
বারান্দার রেলিং ধরে সহদেব করুণ স্বরে জানলার লোকটিকে বলল, ‘অ্যাম্বুলেন্সে একটা খবর দেবেন।’
‘এম এম এম এটা কিন্তু ধাঁধা নয়, স্রেফ অঙ্ক। কত তাড়াতাড়ি উত্তর দিতে পার দেখি। পাঁচ বছরে টাকা ডাবল হয় ইন্দিরা বিকাশ পত্রে, জান তো? একশো টাকা পাঁচ বছরে দুশো, রিনিউ করো, দুশো টাকা পাঁচ বছর পর চারশো। এইভাবে কতবার রিনিউ করলে একশো টাকার পত্রটি এক কোটি টাকা ছাড়িয়ে যাবে?… কাগজ কলম দেব?
সহদেব চোখ কুঁচকে কাবলির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘একশো টাকার কাগজ এক কোটিতে যখন পৌঁছবে তখন আমার নাতির নাতি হায়ার সেকেন্ডারি পাশ করছে।’
‘এটা কোন অ্যানসার হল না।’ টাবলি বলল।
সহদেব অনিতাকে লক্ষ করে বলল, ‘অনি, তোর এখানে আসা আমায় বন্ধ করতে হবে। … শিঙাড়া টিঙাড়াও আসছে না। ব্রেন কাজ করবে কী করে?’
‘আসবে, আসবে। পিসি এখানে অনুপস্থিত, তার মানে অর্গানাইজ করছে। কিন্তু আমার অঙ্কটা?’
‘পারব না বাপু, তুই বরং বলে দে কতবারে কোটি ছাড়াবে।’
‘সতেরোবারে। সতেরো ইনটু পাঁচ পঁচাশি বছরে একশো টাকার পত্রটা হবে এক কোটি একত্রিশ লক্ষ সাত হাজার দুশো টাকা। … তুমি কালই একটা কিনে ফ্যালো।’
‘কোটি টাকা নেবে কে, বংশধর কই! আমি তো বিয়েই করিনি।’
‘ইয়েস ইয়েস, বিয়ের ব্যবস্থা তো… মা, তোমার দাদার বিয়ের ব্যবস্থা এখনও করোনি কেন? তুমি ক্রমশই কুঁড়ে হয়ে যাচ্ছ।’
সহদেব অনাবিল আনন্দে সবার মুখের দিকে তাকাল। তার বোন, বড়ো ভালো মেয়ে। তার ভাগনিরা,ওরাও বড়ো ভালো, তার বন্ধুর মতো। কাবলি ফার্স্ট ডিভিসন পেয়েছে হায়ার সেকেন্ডারিতে। সে জানে, এ মেয়ে ড্রাগ ধরবে না, অনি মিথ্যেই ভেবে মরে। এইবার শিঙাড়া, সন্দেশ, চা নিয়ে আসবে প্রতিভাদি। পঞ্চাশের কাছাকাছি, ধবধবে পাতলা থান, মলমল-এর ব্লাউজ, ব্রেসিয়ার। ঠাসা মজবুত গড়ন। রসিকা এবং উইট বোঝে। অসিত বলেছিল, ‘গ্রাম্য অশিক্ষিত মেয়েমানুষ।’ তাতে কী বোঝায়? মেয়েমানুষ ইজ মেয়েমানুষ। একটা নিরাপদ জায়গা।
