‘তাই নাকি! কে বলল তোকে?’
‘ও বলল, তুমিই নাকি ব্যবস্থা করে দিচ্ছ।’
‘এত টাকা অসিত কী জন্য দেবে সেটা কি বিদ্যুৎ তোকে বলেছে?’
‘হ্যাঁ, ডিভোর্স করলে দেবে। … সত্যি মেজদা, আমি আর পারছি না, আমি তাহলে বেঁচে যাব যদি ও জীবন থেকে সরে যায়।’
‘তারপর কী করবি, তোর চলবে কী করে? সেবাও রয়েছে।’
‘সে যাহোক করে, দুমুঠো ভাত আর ছেঁড়া ন্যাকড়া পরেও চালিয়ে নোব কিন্তু এ জীবন আর আমার সহ্য হচ্ছে না।’
সহদেব কয়েক সেকেন্ড শমির জ্বলজ্বল করা চোখ দুটো দেখল। ভীষণভাবে আশা করে আছে। কিন্তু এটাকে আর বাড়তে দেওয়া উচিত নয়। ওকে বাস্তবে দাঁড় করিয়ে দেওয়া ভালো।
‘কিন্তু অসিত টাকা দেবে না। লাখ টাকা কেন, এক টাকাও নয়।’
‘দেবে না! কেন?’ শমিতা বুঝে উঠতে না পারার মতো তাকাল, তার মাথায় যেন কিছু ঢুকছে না।
‘দেওয়ার কোনো দরকার আছে বলে সে মনে করে না তাই দেবে না। ও আমাকে একটু আগে ফোনে বলল কোনো ব্যাপার তোর সঙ্গে ওর নেই, একটা সময় পর্যন্ত ছিল কিন্তু এখন আর নেই।’ শমির মুখ এখন দেখবে না বলেই সহদেব দুটো হাত আড়াআড়ি চোখের উপর রাখল।
অস্ফুট একটা আর্তনাদের মতো শব্দ হল। ‘তোমাকে একথা বলল? ঠিক বলছ?’
‘হ্যাঁ, এই কথাই বলল।’
‘ঠিক বলছ? ঠিক শুনেছ মেজদা?’
সহদেব উত্তর দিল না। কিছুক্ষণ পর হাত সরিয়ে দেখল ঘরে কেউ নেই। সে খাবার জন্য উঠল না। ইচ্ছাটাই নেই। আলোটা চোখে ধাক্কা দিচ্ছে, নেভাবার জন্য উঠল আর তখনই দেখল বিদ্যুৎ সিঁড়ির শেষ ধাপে।
‘দেবে না বলল? আমি তো জানতুমই দেবে না।’ বিদ্যুৎ ঘরে ঢুকেই মুখটা খুশিতে ভরিয়ে ফেলল অনুমান মিলে যাওয়ায়।
‘তুমি জানতে? তাহলে জেনে শুনেই লাখ টাকা দর হেঁকেছিলে!’
বিদ্যুতের মুখে টানা দু-তিনবার হাসি খেলে গেল। ‘জানাজানির আর কী আছে। একটা মেয়েমানুষের জন্য লাখ টাকা দিয়ে দেবে! তাও বয়স হয়ে গেছে, শরীর ধসে গেছে এমন একজনের জন্য। আপনি হলে দেবেন… কি দেবেন?’ যাত্রার ভিলেনের মতো ত্যারচা চোখে তাকিয়ে খিকখিক করে হেসে উঠল বিদ্যুৎ।
‘তাহলে তুমি জানতে… তাহলে তুমি এই জীবনের মধ্যেই থাকতে চাও, এতগুলো লোকের জীবনকে নরক করতে চাও… জীবন বদলাতে চাও না… ইউ ব্যাস্টার্ড।’
তরকারির বাটিটা ছুঁড়ে মারল সহদেব। বিদ্যুৎ বোধহয় এই রকম কিছু হবে আঁচ করেছিল, হাতটা মুখের সামনে যথাসময়ে তোলায় বাটিটা মুখে আঘাত করল না। তরকারি ছিটিয়ে পড়ল মেঝেয়, বিছানায়।
বিদ্যুৎ ছুটেই প্রায় পালিয়ে গেল।
এগারো
খবরের কাগজ পড়া শেষ করে, দাড়ি কামিয়ে সহদেব ভাবল অরুণকাকার খবর নেবে। হাসপাতাল থেকে আজও ফেরেননি। একটা পা বাদ গেলেও মানুষ অথর্ব হয়ে যায় না। সেবাও তো এক পা নিয়ে চলাফেরা করছে। এইরকম ভেবে সে গড়িমসি করছিল, পাঞ্জাবিটা চড়িয়ে সামনের বাড়ি থেকে একবার ঘুরে আসবে কি না।
তখনই নীচের থেকে সেবার ডাক সে শুনল, ‘মেজোমামা, মেজোমামা।’
ঘর থেকে বেরিয়ে সে বারান্দায় এল। খোলা সদরে সেবা দাঁড়িয়ে। মুখ তুলে সে বলল, ‘তোমাকে একজন খুঁজছেন।’
দরজার কাছে এসে সেবার পাশে দাঁড়িয়ে যে এবার উপরদিকে তাকাল, তাকে দেখে সহদেব হেসে বলল, ‘ওপরে চলে আসুন।’
ঊর্মি দোতলায় উঠে আসার আগেই সে ছুটে ঘরে গিয়ে পাঞ্জাবিটা পরে নিল। ছোটো ঘরটা খুলে বলল, ‘জায়গা কম, বসতে একটু অসুবিধে হবে।’
‘কিছু অসুবিধে হবে না। এইরকম ছোটো ঘরেই আমার বাবা-মা এখনও থাকেন, আমিও থেকেছি।’
ঊর্মি সারা ঘরে একবার চোখ বোলাল। বইগুলোর নাম পড়ার চেষ্টা করল।
‘বসুন।’
সহদেব তার নিজস্ব চেয়ারটাকে দেখিয়ে বলল। ওটায় হলুদ কাপড়ে ওয়াড় দেওয়া, চার ইঞ্চি পুরু ফোম রাবার পাতা আর হাতল আছে।
‘না না আমি এটায় বসছি।’ দরজার পাশে দেওয়াল ঘেঁষা চেয়ারটায়, যাতে হাতল নেই, ঊর্মি বসল।
‘চিনে এলেন কী করে?’
‘কেন অসুবিধের কী! ঠিকানাটা তো আছে আর পঙ্কজের কাছ থেকে জেনে নিয়েছি বাস থেকে কোথায় নামতে হবে। শুধু দুবার বাস বদলাতে হয়েছে।’
‘পঙ্কজের তো কালিকাপুর যাওয়ার কথা, গেছে?’
‘সকালেই বেরিয়ে গেছে।’
‘ও বোধহয় জানে না আপনি এখানে আসবেন।’
‘জানে না। বলতে অবশ্য পারতাম কিন্তু অযথা ওকে কিউরিয়াস করে তোলার দরকার কী। ও ফিরে আসার আগেই তো আমি বাড়ি পৌঁছে যাব।’ ঊর্মি ঘড়ির দিকে তাকিয়ে ভ্রূ কুঁচকে সময়ের একটা হিসাব কষে নিল।
ঠিক এই ভাবেই তো তুমি দিল্লি, আগ্রা ঘুরে এসেছ, পারাদ্বীপ থেকে পঙ্কজ এসে পড়ার আগেই। সহদেব মনে মনে ঊর্মির সঙ্গে কথোপকথন শুরু করল।
‘পঙ্কজের কাছে লুকিয়ে রাখার কি দরকার আছে, মানে দিল্লি সফরটা?’
‘হ্যাঁ আছে। আপনার কাছে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ, পঙ্কজের সামনে আমাকে না চেনার ভান করেছিলেন বলে।’
‘ব্যাপারটা কী? লোকটাই বা কে?’ সহদেব তার নিজস্ব চেয়ারে পায়ের উপর পা তুলে বসল।
ঊর্মি ইতস্তত করল না। কোনোরকম অপরাধবোধ বা লজ্জা তার মুখে দেখা গেল না। হাঁটুর উপর শাড়িটা দুই আঙুলে ধরে ছড়িয়ে দিতে দিতে বলল, ‘ব্যাপার হল, লোকটা আমাদের প্রতিবেশী। লোকটাই বলছি, নাম আর বলার দরকার নেই, ওটা কোনো ফ্যাক্টর নয়। কেমিক্যালসের আর ফার্টিলাইজারের এজেন্সি নিয়ে প্রচুর টাকা করেছে। ও আমার মায়ের অসুখের সময়,… ব্লাড ক্যানসার… প্রায় চল্লিশ হাজার টাকা খরচ করে। আমি তখন সবে কলেজে ঢুকেছি। বাবার এমন সামর্থ্য ছিল না যে এত টাকা খরচ করে চিকিৎসা করাতে পারেন। ওর জেনরসিটি আমাকে মুগ্ধ করে। ওকে তখন দেবতা বলে মনে হয়েছিল… আমার বয়স তখন উনিশ। বুঝতেই পারছেন বুদ্ধি আর মন দুটোই তখন কাঁচা। কৃতজ্ঞতাবশতই বলতে পারেন, আমি নিজেকে ওর কাছে সাবমিট করি।’
