তারা দুজনে মুখোমুখি। অতন্ত অস্বস্তিকর পরিস্থিতি। দুবার চোখাচোখি হল। স্বাভাবিক করে তোলার জন্য কেউ একটা কিছু বলুক, দুজনে সেটাই চাইছে। অবশেষে ঊর্মিই কথা বলে উঠল।
‘আপনাকে দু-একটা কথা বলতে চাই। ‘
‘বেশ তো।’
‘কাল বা পরশু যদি…।’
পঙ্কজ ফিরে এসেছে। ঊর্মি কথা শেষ করল না। খাবারের দোকান থেকেই তারা আলাদা হয়ে নিজেদের পথ ধরল। সহদেব দু-পা এগিয়েই থেমে ফিরে তাকায়। সে যা অনুমান করেছিল তাই হল। ঊর্মি পিছন ফিরে একবারও তাকাল না। পিছন থেকে দেখলে শমির সঙ্গে ওর গড়নের এমনকী চলার ধরনেও এ একটা মিল আছে। এটা মনে হওয়ায় সঙ্গে সঙ্গে সহদেব ব্যস্ত হয়ে উঠল। প্রতিভাদিকে ফোন করে জেনে নিতে হবে।
পাড়ায় ঢোকার মুখে ওষুধের দোকান বিনোদ মেডিক্যাল হল। সহদেবের সঙ্গে মালিকের ভালোই পরিচয়। দরকার হলে সে ওদের ফোন ব্যবহার করে, অবশ্যই পয়সা দিয়ে। ডায়াল করার আগে সহদেব ঘড়ি দেখল, প্রায় পৌনে দশটা।
ফোন ধরল কাবলি।
‘কে? এম এম এম! এত রাতে? … য়্যা, কী বললে, পিসিকে, আমাকে নয়, মাকেও নয়, প্রতিভাদিকে!… ধরো ডেকে দিচ্ছি…. ওহ মেঘ না চাইতেই জল! এসে গেছে।’
‘হ্যালো, কে মেজদা?’
‘অসিত ফিরেছে?’
‘হ্যাঁ। আমি ওকে বললুম…’ প্রতিভা থেমে রইল।
‘হ্যালো, অসিত কী বলল?’ সহদেবের মনে হল, আশাপ্রদ খবর নয় বলেই প্রতিভাদি কথা খুঁজে পাচ্ছে না।
‘মেজদা আপনি বরং ওর সঙ্গেই একবার কথা বলুন, নীচে অপিস ঘরে আছে। ফোনটা ওখানে দিচ্ছি।’
সহদেবের বুকের মধ্যে ঢিবঢিব করে উঠল। প্রতিভাদির দৌত্য যে ব্যর্থ হয়েছে সেটা বোঝা যাচ্ছে, কিন্তু সে এখন কী বলবে? প্রস্তাবটা তার মাথা থেকে বেরোয়নি তবে এতে তার সায় আছে। অসিতকে না জানিয়েই এতটা সে এগিয়েছে। লাখ টাকাটা তো কম নয়!
‘কে মেজদা? আমি অসিত।’ গম্ভীর ভরাট স্বর। ওর লম্বা চওড়া শরীরটার সঙ্গে খুবই মানানসই।
‘হ্যাঁ, প্রতিভাদির কাছে নিশ্চয় শুনেছ?’
‘শুনেছি। কিন্তু আপনারা এসব কী করছেন আমাকে না জানিয়ে? এতে আমার মত আছে কি না, সেটাও একবার জিজ্ঞোসা করে নিলেন না?’ সহদেবের গলায় স্পষ্ট বিরক্তি এবং অস্পষ্ট ধমক। সহদেব কুঁচকে গেল।
‘ঠিক, তোমাকে জিজ্ঞাসা করা উচিত ছিল। তবে বাপারটা এখন এমন জায়গায় এসে গেছে যে কিছু একটা করা দরকার, খুবই দরকার। এত অশান্তি -।’
‘এমন জায়গা মানে? কী জায়গায়, কোন জায়গায়?… কোনো জায়গাতেই কিছু পৌঁছায়নি।’
‘কী বলছ তুমি, বুঝতে পারছি না!’
‘পরিষ্কার বাংলা ভাষাতেই বলছি। শুনুন মন দিয়ে মেজদা, কোনো ব্যাপারস্যাপার আমার আর শমির মধ্যে নেই। হ্যাঁ নেই, একটা সময় পর্যন্ত ছিল কিন্তু আর নেই। সুতরাং টাকা দেওয়ারও কোনো প্রশ্ন ওঠে না, তাও কিনা লাখ টাকা। টাকা কি খোলামকুচি! একটা বদমাস, হারামজাদা, বলে কিনা আমায় খুন করবে?’ রাগে থরথর করছে অসিতের গলা। ‘ওটাকে পিঁপড়ের মতো টিপে মারতে পারি, কালই ওর লাশ ফেলে দিতে পারি। এটা ব্ল্যাকমেল, পরিষ্কার ব্ল্যাকমেল আর আপনিই ওকে ওসকানিটা দিয়ে লোভ জাগিয়ে দিয়েছেন…ছি ছি ছি, এত লেখাপড়া শিখে শেষকালে কিনা একটা অশিক্ষিত গ্রাম্য মেয়েমানুষের কথায় নেচে উঠলেন? আপনার কাছ থেকে এটা আশা করিনি।’
শুনতে শুনতে অবশ হয়ে এল সহদেবের শরীর, তার মাথার মধ্যের স্নায়ুকোষগুলো। তাকে এইসব কথা শুনতে হল! অসিত কিনা তাকে ছি ছি করল!
‘যে অশান্তি আমাদের বাড়িতে চলছে, তার মূলে কিন্তু তুমিই। এটা তো অস্বীকার করতে পার না?’ সহদেব আড়চোখে দোকানের কর্মচারীকে লক্ষ করল। কানটা নিশ্চয় এইদিকেই!
‘কতরকমের অশান্তিই তো কত পরিবারে রয়েছে আবার মিটেও যায়। তাই বলে লাখ টাকা দিতে হবে?’
‘শমির মুখ চেয়েও তো তোমার দেওয়া উচিত। তার জীবনটার কথা তুমি ভাববে না? আর সম্পর্ক নেই বলে দিলেই কি দায় চুকে যায়? তার দাদা হিসেবে বলছি না, একটা মানুষ হিসেবেই বলছি, এভাবে কি সম্পর্ক মিটে যায়? আমরা কি জানোয়ার?… ও একটা মেয়ে।’
ওধারে ফোন রেখে দিল অসিত। কর্মচারীটি এবং একজন খদ্দের তার মুখের দিকে তাকিয়ে আছে দেখে সহদেব বুঝল সে গলাটা খুব বেশিই চড়িয়ে ফেলেছিল। হাতের আঙুলগুলো এখনও থরথরাচ্ছে। টাকাটা দিয়েই সে ছুটে ওষুধের দোকান থেকে বেরোলো।
কড়া নাড়তে দরজা খুলল শমি। টিভি চলছে।
‘এখন খেতে দোব।’
‘দে।’
সহদেব উপরে উঠে গেল। মিনিট দশেক পর শোবার ঘরের দরজা থেকে শমি ডাকল, ‘মেজদা।’
‘রেখে যা।’
ঘর অন্ধকার। শমি আলো জ্বালল। খালি গায়ে চিৎ হয়ে সহদেব কপালে দুটো হাত আড়াআড়ি রেখে শুয়ে। আলো জ্বালতেই হাত নামাল। থালা আর বাটি টেবলে নামিয়ে রেখে শমি বলল, ‘শরীর খারাপ?’
‘না।’
‘বড়দার সঙ্গে দেখা করেছ?’
‘কেন, দেখা করতে হবে কেন? তাছাড়া কোথায় বন্ধুর বাড়িতে উঠেছে তাও জানি না। বউদিরা এলে শ্বশুরবাড়িতে ওঠে, তারা তো আসেনি।’
এরপর শমির চলে যাওয়ার কথা কিন্তু দাঁড়িয়ে রয়েছে।
‘কিছু বলবি?’
এগিয়ে এসে শমি খাটের পাশে দাঁড়াল। ‘একটা কথা জিজ্ঞাসা করার ছিল।’
আঁচলের খোঁটা ধরে নখ দিয়ে টানছে। বলতে দ্বিধা হচ্ছে। সহদেব বুঝে উঠতে পারল না কী জিজ্ঞাস্য থাকতে পারে।
‘শুনলুম অসিতদা নাকি ওকে একলাখ টাকা দেবে।’
সহদেব হতভম্ব চোখে তাকিয়ে থাকল। শমির মুখে ভেসে উঠেছে সুখী হাসি।
