‘হ্যাঁ।’
‘আমি প্রথম মিছিলে বেরোই থার্টি টু-এ, রঙপুরে। এই যে কনুইটা বাঁকা দেখছেন,পুলিশের লাঠিতে।’
তারক ভাবল, ‘আহা’ বলা উচিত। কিন্তু সেটা যেন খুবই সস্তা হয়ে যায়। চোখ মুখে শ্রদ্ধা ফোটালেও তো দেখতে পাবে না। হাত বাড়িয়ে সে কনুইটাকে ছুঁতে পারে। কিন্তু অল্পবয়সি হলেই অবশ্য সেটা সম্ভব, এই বৃদ্ধের গায়ে হাত দিয়ে তারিফ জানানোটা বেমানান হবে।
‘তারকবাবু, শুনছি নাকি ওই পাওনা টাকাটার দশ পারসেন্ট ইউনিয়নকে চাঁদা দিতে হবে।’
‘কই শুনিনি তো!’
‘হ্যাঁ, কালই তো শুনলুম অনেকে বলাবলি করছে। তাহলে তো আমাকে তেতাল্লিশ টাকা প্রায় চাঁদা দিতে হবে।’
তারক হিসেব করে দেখল, তাকে দিতে হবে আট টাকা। ‘ইউনিয়নের জন্যই তো এতগুলো টাকা পাচ্ছ, মাইনে বাড়ছে, দিলেই না হয়, একবারই তো।’
বিড়বিড় করে পূর্ণ কি যেন বলল, তারক বুঝতে পারল না। বিমল মান্না শ্লোগান দিচ্ছে দুটো সারির মাঝে পিছু হটে চলতে চলতে, মুখের পাশে টার্জানের মতো হাত রেখে চিৎকার করে। তারকের খেয়াল হল, বহুক্ষণ সে গলা দেয়নি। হিরণ্ময়ের খুব কাছের লোক বিমল মান্না। অন্তত এটুকুও যদি বলে-তারক সিঙ্গি খুব গলা দিচ্ছিল দেখলুম।
‘রেশন কোটা বাড়াতে হবে।’
‘রেশনের দাম কমাতে হবে।’
‘মূল্য বৃদ্ধি রোধ কর।’
‘দ্রব্যমূল্য হ্রাস কর।’
‘দেশের শত্রু জোতদার।’
‘চোরাকারবারি মজুতদার।’
বিমল মান্না দেখছে। তারক ভাবল, যাক কাজ অনেকখানি হয়ে রইল। মিছিল সাজাবার সময় হিরণ্ময় দেখেছে, হেসেও ছিল। কালকেই ওকে নারানের জন্য বলা যেতে পারে একবার তো শুধু এজিএম-কে বলা-আমার লোক। চাকরি দেওয়ার অনুরোধ নয়। বাকিটা নারানের ভাগ্য।
লালবাজার পার হয়ে বেন্টিঙ্ক স্ট্রিট ধরে মিছিল চলেছে। তারক দেখল দু-ধারের ফুটপাথে লোকেরা বিরক্ত মুখে তাকিয়ে। বহু মুখ দেখে তার মনে হচ্ছে কাল কি পরশুর কোনো মিছিলে ওরা ছিল। এইভাবে শ্লোগান দিতে দিতে ময়দান কি ওয়েলিংটন স্কোয়ারে গেছে। আটকা পড়া ট্রাম-বাসের লোকেদের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে বলছে-আধঘণ্টার কম নয় দাদা, বিরাট লম্বা মিছিল। ভেদ করে কেউ রাস্তা পার হবার চেষ্টা করলে হইহই করে হয়তো ঠেলে দিয়েছে। বারো-চোদ্দো বছর আগে একবার চাষিদের একটা মিছিলের মধ্য দিয়ে তারক রাস্তা পার হয়েছিল। লুঙ্গিপরা মাঝবয়সি একজনকে গায়ে হাত দিয়ে বলে-কত্তা, ওপারে যাব? লোকটি হাসিমুখে দাঁড়িয়ে বলে-যায়েন!
চলতে চলতে তারকের বিরক্ত লাগল। ভেবেছিল অদ্ভুত কিছু লাগবে। যেমন ম্যাচের দিন ব্যাট হাতে নামার সময় যে শিরশিরানি পেটের মধ্যে হত বা ফাঁকা মাঠে বাউন্ডারির ধারে দুটো লোকও বসে থাকলে যেরকম ভয়-ভয় করত, সেই রকমের কোনো অনুভূতি। এখন সে দেখছে দু-ধারের দৃশ্য খুবই গতানুগতিক। যেসব লোক দাঁড়িয়ে বা চলতে চলতে ঘাড় ফিরিয়ে তাকাচ্ছে তাদের কারোর চোখে তারিখ বা সমীহ নেই। যেন বলতে চায়, খুটখাট করে আর কী হবে, তাড়াতাড়ি আউট হয়ে ফিরে এসো। এখন ফুটপাথের লোকেদের ইতর বলে তার মনে হচ্ছে।
অথচ বহুবার ফুটপাথে দাঁড়িয়ে মিছিল দেখতে দেখতে তার মনে হয়েছে, লোকগুলোর আস্ত নিজস্ব ঘুমোবার ঘর নেই, বুদ্ধিমতী বউ বা স্বাস্থ্যবতী প্রেমিকা নেই, কৌতূহলী ছেলেমেয়ে বা সহৃদয় বাবা নেই, ওদের ঘরে একটার বেশি জানলা নেই, বন্ধুরা আড্ডা দিতে আসে না। পরদিন অফিস যাওয়ার আগে পর্যন্ত ওরা, সম্ভবত এইভাবে মিছিল করে সময় কাটাতে পারে। ওদের বোধ হয় বাড়ি ফিরতে ইচ্ছে করে না। নিষ্প্রাণ উইকেটে যেন ঢিকিয়ে ঢিকিয়ে তিনশো-চারশো রান করে চলেছে। কোনোক্রমে প্রথম ইনিংসে এগিয়ে থাকাই যেন উদ্দেশ্য।
হঠাৎ চমকে উঠল তারক। অরুণ মিত্তির না? সাদা ফিয়াটে অফিস থেকেই বোধ হয় বাড়ি ফিরছে। মিছিলের জন্য আটকে পড়ে স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে, ভ্রূ কুঁচকে মিছিলের দিকে তাকিয়ে। তারক রুমাল বার করে মুখ মুছতে শুরু করল যেন না চিনতে পারে। নিখিল চাটুজ্যের কানের কাছে মুখটা ঝুঁকিয়ে দিল যাতে আড়াল পড়ে।
‘আপনার তো এপ্রিলে রিটায়ারমেন্ট, ওরা কিছু বলল-টলল?’
‘এক্সটেনশন? নাঃ, ধরাধরি করতে আমার ভালো লাগে না।’
‘আপনার ছেলেরা এখন কী করে?’
‘ছেচল্লিশের দাঙ্গাতেই সব শেষ হয়ে গেছে।’
তারক মুখ টেনে নিয়ে অরুণ মিত্তিরের সাদা গাড়িটাকে আড়চোখে দেখল। পিছনের জানলা দিয়ে কতকগুলো প্যাকেট আর বই ছাড়া আর কিছু দেখতে পেল না। এই লোকটাই বলেছিল, তোকে টিমে আনবই। সিলেকশন মিটিং-এ আমি লড়ব তোর জন্য। ওর রক্ষিতার মেয়েকে বিয়ে করলে নিশ্চয় এসে যেতাম।
একসময় মিছিলটা মনুমেন্টের তলায় পৌঁছল। মিটিং করে করে ঘাস উঠে গেছে। তারক রুমাল বিছিয়ে বসে সামনে তাকাল। দোতলা সমান উঁচু মঞ্চে দাঁড়িয়ে একটা লোক বক্তৃতা করে চলেছে। তারকের মনে হল এ সবই তার বহু বছর আগেই শোনা আছে। মাঠ থেকে ফেরার পথে চানা-মটর খেতে খেতে বটগাছটার তলায় দাঁড়িয়ে খানিক রোমাঞ্চিত হবার জন্য প্রায়ই শুনত। সেইসব কথা, ঠিক সেই গলায়ই লোকটা বলছে একই সুরে একই ভঙ্গিতে। তফাতের মধ্যে এই লোকটা নতুন।
এখানে একবার দেখা হয়েছিল সরোজদার সঙ্গে। পাড়াতেই ভাড়া থাকতেন, বিয়ে করেননি। একদিন শেষ রাতে বাড়ি ঘেরাও করে পুলিশ সার্চ করেছিল ওর ঘর। ওর বোন প্রীতিদি পার্টি করত, গ্রামে গ্রামে ঘুরে থিয়েটার করত, থলি হাতে বাজারে যেত, ছেলেদের সঙ্গে হা হা করে হাসত। তাই নিয়ে পাড়ায় অনেকে আপত্তি তুলেছিল। সরোজদা ইংরিজি আর অঙ্ক পড়াতেন, টাকা নিতেন না। ওঁর বাড়িতে গিয়ে পড়তে হত। হরদম বিড়ি খেতেন, ইংরিজি ডিটেকটিভ বই পড়তেন আর কথায় কথায় বলতেন, এ দেশে বিপ্লব হওয়া বড়ো কঠিন। মা প্রায়ই রান্না পাঠিয়ে দিত। এখানে সরোজদার সঙ্গে দেখা হতেই জিজ্ঞেস করেছিলেন, মা কেমন আছেন। তারপর বলেছিলেন, কাগজে মাঝে মাঝে তোমার নাম দেখি। এবারে তো দুটো সেঞ্চুরি করেছ, আর হচ্ছে না কেন? খুব ভালো করে খেলো। পরে যেন বলতে পারি ওই যে টি. সিনহাকে দেখছ, ওকে আমি ইংরিজি পড়াতাম। বলতে পারব তো?
