‘আমরা তো শুনেছি ‘ওঠ ছুঁড়ি তোর বিয়ে’, আর এটা হল, ওঠ ছোঁড়া তোর বিয়ে। কী ব্যাপার না ওখানকার এক মাস্তানটাইপের লোক ঊর্মিকে বিয়ে করার জন্য খেপে উঠেছে, জীবন দুর্বিষহ করে তুলেছে, বলেছে ওকে না পেলে খুন করে নিজেও গলায় দড়ি দেবে। সুতরাং একজোড়া মৃত্যু রোধ করতে হলে এখুনি বিয়ে করে ফেলা ছাড়া আর পথ নেই। কী আর করি… ‘ পঙ্কজ তাকাল ঊর্মির দিকে, চোখে মিটমিটে হাসি। মুখ নামিয়ে ঊর্মি হাসল।
‘বেশ ব্যাপার তো!’ সহদেবের হঠাৎই শমিকে মনে পড়ল। ঊর্মিও কি ওই রকম একটা অসুস্থ অসুখী জীবনের দিকে এগোচ্ছে?
‘বেশ তো বটেই, তবে আমি বলে দিয়েছি চাকরিটা এবার ছাড়ো। প্রতি হপ্তায় দুদিনের জন্য কলকাতায় আসা আর ফিরে যাওয়া, আর নয়। পারাদ্বীপের কাজটা তো শেষ হয়েই এল, এবার পাকাপাকি এখানে এসে জমিয়ে সংসার করবে।’ পঙ্কজ আবার ঊর্মির দিকে তাকাল। ‘না না, কোনো ওজর আপত্তি নয়। জানলেন সহদেবদা, কালিকাপুরে একটা জমি কিনেছি, স্টুডিও করব। কাল সকালেই আর্কিটেক্টকে নিয়ে ওটা দেখাতে যাব। টাকাপয়সার টানাটানি ছিল তা সেটার অনেকটাই মিটেছে পারাদ্বীপের কাজটা পেয়ে। একটা নতুন ইলেকট্রনিকস কোম্পানির বাড়িতে চারটে তলায় মুরালের কাজ, আশি হাজার টাকার।’
তিনটে স্টিলের রেকাবিতে মালাই দিয়ে গেল। সহদেব চামচ দিয়ে একটা কোণ ভাঙার চেষ্টা করতে করতে বলল, ‘বিয়ে হয়ে গেছে দেখে মাস্তান কিছু করেনি। মানে গলায় দড়িটড়ি দিয়ে ফেলেনি তো?’
প্রশ্নটা সে ঊর্মির দিকে তাকিয়ে করেছে। ঊর্মি এতক্ষণে পূর্ণ দৃষ্টিতে এই প্রথম তার দিকে তাকাল। বুঝতে পেরেছে সহদেব তাকে খেলাবার জন্যই কথাটা বলল।
‘না, সেসব কিছু হয়নি।’ সংক্ষিপ্ত, দ্রুত উত্তর দিল ঊর্মি। ওর চাহনিতে কী যেন একটা বলার চেষ্টা, যেটাকে সহদেবের মনে হল মিনতি। একটা জ্বালা সে বোধ করল। এই রকম একটা চহনি সে কেয়ার কাছে প্রত্যাশা করেছিল। পায়নি।
মালাইয়ের একটা টুকরো মুখে ঢুকিয়ে পঙ্কজ বলল, ‘দারুণ। লোকে কেন যে আইসক্রিম খায়! মালাই করাটা শিখে ফেল ঊর্মি, এখন তো প্লাস্টিকের কুলপি পাওয়া যায়, ফ্রিজও আছে।’
‘তৈরি শুরু হলেই আমি যেন চেখে দেখার নেমন্তন্নটা পাই।’ সহদেব খোশমেজাজি ভাব গলায় আনল। ‘পঙ্কজ তোমার ফোন আছে তো, তাহলে মাঝেমাঝে খবর নোব।’
‘আছে। কলমটা আর একটুকরো কাগজ দাওতো।’ পঙ্কজ উর্মির সামনে হাত বাড়িয়ে ধরল।
‘নেই আমার কাছে।’
সহদেবের মনে হল, বলার আগে ঊর্মি চট করে কী যেন ভেবে নিল। ঝুলির মধ্য থেকে জটার পেন আর নোটবইটা বার করে সে পঙ্কজের সামনে ধরল। ফোন নম্বর আর ঠিকানাটাও সে লিখে দিল।
‘আপনার ঠিকানাটা বলুন লিখে নি… এর থেকে একটা পাতা ছিঁড়ব?’
‘দাও, আমি লিখে দিচ্ছি। আমার কিন্তু ফোন নেই।’
পাতাটা ছিঁড়ে পঙ্কজকে দিতেই সে কাগজটা ঊর্মিকে দিয়ে বলল, ‘তোমার কাছে রেখে দাও।’
সহদেব দেখল, ব্যাগের মধ্যে কাগজটা রেখেই ঊর্মির মুখ পাথরের মতো হয়ে গেল। রেকাবিতে মালাই গলে যাচ্ছে, খাচ্ছে না।
‘জান ঊর্মি, সহদেবদা ব্যাচিলার। বিয়ে করার মতো কাউকে এখনও পাননি। …একি খাচ্ছ না কেন! আমি তো আরও তিনটে আনাব।’
‘ভালো লাগছে না, মাথাটা বড্ড ধরেছে।’
ভিতর থেকে ঊর্মির ভাঙন শুরু হয়েছে। সহদেবের মনে হল ও যেন তাকেই জানিয়ে দিতে চাইল, অসহ্য লাগছে। কিন্তু এই দেখা হয়ে যাওয়াটা তো তার তৈরি করা জিনিস নয়! আগ্রা যাবার পথে তার সামনের সিটে একজোড়া স্বামী-স্ত্রী ছিল। এখন একেবারেই কাকতালীয় ভাবে সে জানল ওরা স্বামী-স্ত্রী নয়।
মেয়েটি এমন একজনের স্ত্রী যে তার খুবই পরিচিত এবং সেই পরিচিত লোকটি জানে না যে তার স্ত্রী দিল্লি, আগ্রা ঘুরে এসেছে অন্যের স্ত্রী সেজে। অবশ্য দুজনের মধ্যে সম্পর্কটা সে দেখেছে, খুবই তিক্ত ধরনের ছিল। কিন্তু আসল কথা, আজ তাদের দেখা হয়ে যাওয়াটা একদমই একটা দুর্ঘটনা। ঠিকমতো বললে, পঙ্কজ যদি ওর সঙ্গে না থাকত বা অন্য কোনো পুরুষও যদি থাকত তাহলে আজ এই দেখা হওয়াটা এমন বিপর্যয়কর হয়ে উঠত না। যতটুকু আলাপ হয়েছিল তাতে পাঁচ সেকেন্ড হাসি বিনিময় ছাড়া আর কী করার থাকত! আমরা অডিটোরিয়াম থেকে বেরিয়ে যে যার নিজের রাস্তা ধরতুম।
সুতরাং তোমার যদি অসহ্য লাগে, তার জন্য আমার কিছু করার নেই। এটা একেবারেই দৈব কাণ্ড। সহদেব মনে মনে ঊর্মির সঙ্গে কথা বলা শুরু করল। এর থেকেও অবাক হবার মতো ঘটনা পৃথিবীতে বহু ঘটেছে। কিন্তু আগ্রায় যার সঙ্গে গেছলে সে কে? কেনই বা যাওয়া?
‘পঙ্কজ আমিও কিন্তু আর খাব না। কিছুদিন আগে দারুণ সর্দি জ্বরে ভুগেছি।… তাছাড়া আমার একটু তাড়া আছে।’
‘সে কী, দুজনেই খাবে না!’ পঙ্কজকে হতাশ দেখাল। ‘তাহলে আর কী করা যায়। উঠি।’
‘তোমার কাছ থেকে অনেক কিছু শোনার আছে। তুমি নিজের কাজ সম্পর্কে কী ভাবছ, বিদেশে কী ভাবনা হচ্ছে, এদেশেই বা কে কী কাজ করছে, আমার কৌতূহল বিরাট।’ সহদেব ‘কৌতূহল’ শব্দটায় জোর দিল। ঊর্মি মুখ তুলে তার দিকে তাকাল।
‘তাহলে একদিন সকালে আসুন অনেকক্ষণ জমিয়ে আড্ডা দেওয়া যাবে, অবশ্য পারাদ্বীপ থেকে ফিরে আসার পর। কাল রাতেই চলে যাচ্ছি।’
নীচে নেমে দাম চুকিয়ে পঙ্কজ বলল, ‘এক মিনিট, ল্যাভাটরিটা একবার ঘুরে আসি।’
