কিন্তু এখন আর সেখানে খালি সিট আশা করা যায় না। টর্চ জ্বালিয়ে একটি লোক তাকে বাঁ দিকে মাঝামাঝি সারির ধারের আসনে বসিয়ে দিল। মিনিট কয়েকের মধ্যেই সে গল্পটা আঁচ করে ধীরে ধীরে সেঁধিয়ে গেল বিষয়ের মধ্যে।
নিগ্রো মহিলা মিসেস প্যাটারসনের সারা জীবনের কথা। এখন তাঁর বয়স শতাধিক। আমেরিকান গৃহযুদ্ধের সময়, এক প্ল্যান্টেশনে তিনি তখন ক্রীতদাসী বালিকা। সবার সঙ্গে তিনিও মুক্তি পেলেন। এরপর তার যৌবন, প্রৌঢ়ত্ব আর বার্ধক্য নিয়ে পৌঁছলেন আমেরিকান সিভিল রাইটস আন্দোলনে, গৃহযুদ্ধ শুরুর ঠিক একশো বছর পর উনিশশো বাষট্টিতে। লোল চর্ম, বলি রেখাঙ্কিত মুখ, শত বছর ধরে কালোদের উপর সাদাদের অন্যায়, অবিচার, অত্যাচার দেখেছেন, সয়েছেনও।
অথচ ক্রোধ, দ্বেষ থেকে মুক্ত, যুক্তিবাদী, উদার, সহৃদয় মিসেস প্যাটারসন আইন অমান্য করতে এগিয়ে এলেন। লাঠি হাতে শতাধিক বছরের বৃদ্ধা, ঠুকঠুক করে এগোচ্ছেন আদালত বাড়ির দিকে। বিরাট পুলিশ বাহিনী দরজার সামনে ব্যাটন আর আগ্নেয়াস্ত্র নিয়ে দাঁড়িয়ে। বিশাল জনতা উদগ্রীব হয়ে দূর থেকে দেখছে, বৃদ্ধা লাঠিতে ভর রেখে পা পা করে এগিয়ে যাচ্ছেন। একা। পুলিশ বাহিনী বিব্রত, বিভ্রান্ত। তারা বুঝতে পারছে না বৃদ্ধা কী করতে চায়? ভেবে পাচ্ছে না বৃদ্ধাকে তারা কীভাবে বলপ্রয়োগ করে আটকাবে। দরজার বাইরে খাবার জলের কল। কালো মানুষদের সেই কল থেকে জল খাওয়া বারণ। নিষেধাজ্ঞা লেখাও রয়েছে। বৃদ্ধা কল খুললেন। যেন মানবতার উৎসমুখ খুলে গেল সারা বিশ্বের জন্য। প্রাণদায়িনী জল উছলে উঠল। তিনি মুখ নামিয়ে জল পান করলেন। সারা জীবনের অন্যায় বঞ্চনার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানিয়ে তার মুখ তৃপ্তিতে ভরে উঠল।
ছবি শেষ হয়ে গেছে। সহদেবের চোখের কোল বেয়ে জল গড়িয়ে নেমেছিল। সে মোছার চেষ্টা করেনি। চোখ বন্ধ করে বসে রইল কিছুক্ষণ। দর্শকরা বেরিয়ে যাচ্ছে। সরু ছোটো দরজা, সময় লাগছে বেরোতে। সহদেব উঠে দাঁড়িয়ে চোখ বোলাতেই দেখল সার দিয়ে পা পা করে দরজার দিকে এগোচ্ছে যারা তাদের মধ্যে পঙ্কজ। কিন্তু সামনে যার কাঁধে হাত রেখেছে পঙ্কজ তাকে দেখে সহদেব চমকে উঠল। ঊর্মি! পঙ্কজের সঙ্গে!
দরজা থেকে বেরিয়েই পঙ্কজ সিগারেট ধরাচ্ছিল। সহদেব আলতো করে তার পিঠে হাত রাখতেই সে লাইটারটা নামিয়ে মুখ ফেরাল।
‘আরে সহদেবদা। কেমন দেখলেন বলুন, দারুণ না? খুব ভালো লাগল… পরিচয় করিয়ে দিই, আমার বউ ঊর্মি আর ইনি হলেন সহদেব মিত্র, আমাদের সহদেবদা, একসঙ্গে আমরা কতদিন…’
সহদেব আর কিছু শুনতে পাচ্ছে না। দুটো এক্সপ্রেস ট্রেনের মুখোমুখি সংঘর্ষ হলে যা হয় এখন তার ভিতরে সেটাই ঘটল। কয়েক মিনিট আগে সে আবগে মথিত হয়ে চোখ থেকে জল বার করেছে আর এখন তার জীবনের সেরা চমক! দুটোর ধাক্কা প্রকৃতিস্থ থাকার লাইন থেকে ছিটকে তাকে অবাস্তব অবিশ্বাস্য জমিতে আছড়ে ফেলে দিল। সে ফ্যালফ্যাল চোখে ঊর্মির দিকে তাকিয়ে রইল।
বোধহয় একই ব্যাপার ঘটেছে ঊর্মিরও। সেও একই ভাবে তাকিয়ে। মুখ থেকে রক্ত সরে গেছে। দু-হাত তুলে নমস্কার করার সময় স্পষ্টভাবেই আঙুলগুলো কাঁপল। হাসার একটা চেষ্টা করল।
তাহলে ওই লোকটা কে? কার সঙ্গে ঊর্মি তাজমহল দেখতে গেছল!
‘চলুন সহদেবদা একটু বসি কোথাও। শিঙাড়া খাবেন?’
‘না ভাই।’
‘কচুরি? আলুর চপ?’
‘আজ থাক।’
‘কেন অম্বলটম্বল হচ্ছে নাকি? আগে তো খুব খেতেন। আপনার বাড়ির কাছে বাসস্টপে একটা দোকান, কী যেন নামটা?’
‘কালীমাতা মিষ্টান্ন ভাণ্ডার।’
‘হ্যাঁ হ্যাঁ কালীমাতা। এখনও কি আগের মতো শিঙাড়ার টেস্ট আছে।’ পঙ্কজ রাস্তা পার হবার জন্য দুদিকে তাকাল। ‘কুইক ঊর্মি… সুরেন ব্যানার্জি রোড খালি পাওয়া একটা দুর্লভ ব্যাপার।’
তারা তিনজন ছুটেই ওপারের ফুটপাথে উঠল।
‘চলুন ওদিকের দোকানটায় ভালো মালাই করে। …কালীমাতার শিঙাড়া একদিন ঊর্মিকে নিয়ে গিয়ে খাইয়ে আসব।’
‘খাইয়ে আসবে কী, আমিই তো খাওয়াব। বিয়েতে তো নেমন্তন্ন করনি… কদ্দিন হল বিয়ে করেছ?’
এই সময় চৌরঙ্গি অঞ্চলে বেশ ভিড় থাকে। ওরা পদে পদে বাধা পাচ্ছে। পাশাপাশি তিনজনের হাঁটা কিছুতেই সম্ভব হচ্ছে না। সহদেবের পাশেই পঙ্কজ তার পাশে একহাত পিছনে ঊর্মি। সহদেব দেখার চেষ্টা করল ঊর্মির মুখটা। কানে মুক্তো, ঠোঁটে খুবই হালকা গোলাপি রং, সুতির ছাপা শাডি, বাহু উন্মুক্ত। কাঁধ থেকে ঝুলছে চামড়ার সেই ব্যাগটাই। ঊর্মিকে অন্যরকম লাগছে। মোলায়েম, অনুগ্র। শুধু মুখের উপর ভয় পাওয়ার একটা ছোপ। পঙ্কজ সেদিনের মতো পোশাকেই, সবুজ ট্রাউজার্স তবে হাফ হাতা গেরুয়া পাঞ্জাবিটা হাঁটুর নীচে ঝুলে থাকায় আলখাল্লার মতো দেখাচ্ছে।
‘দেড় মাসই তো?’ পঙ্কজ মুখ ফিরিয়ে ঊর্মিকে প্রশ্নটা করল। ঊর্মি শুধু হাসল।
তাহলে সেই লোকটা ওর স্বামী নয়!
‘এইটেতেই ঢুকি।’ পঙ্কজ হাত ধরে সহদেবকে টানল। দোকানের নীচের টেবলগুলো ভরা। সরু কাঠের সিঁড়ি দিয়ে দেড়তলায় উঠে তারা টেবল পেল। সহদেবের মুখোমুখি হয়ে বসল ওরা দুজন।
‘নেমন্তন্ন করব কী, বিয়েটা তো কালীঘাটে মন্দিরে গিয়ে করেছি। ইচ্ছে ছিল রেজিস্ট্রি করে করব। একমাসের নোটিস দিতে হয়, দেব দেব করছি তখন ঊর্মি আসানসোল থেকে ছুটে এসে বলল কালকেই বিয়ে করতে হবে, যেভাবেই হোক।… আসানসোল থাকে ওখানেই একটা স্কুলে আর্টের টিচার।’ কথা বলা থামিয়ে পঙ্কজ তিনটে মালাই দিতে বলল অপেক্ষমাণ লোকটিকে।
