কোথায় আমি অস্বাভাবিক? সহদেব খুঁজে দেখার চেষ্টা করল, কোথায় আমি অ্যাবনর্মাল? যাকে প্রত্যাখ্যান করেছি, যখন তখন অপমান করেছি তাকে আবার দেখার ইচ্ছা হতেই পারে। স্বাভাবিক ইচ্ছা! একবারই শুধু দুর্বলতা দেখিয়েছে : ‘বয়স কীভাবে মানুষকে বদলে দেয়’ কথাটা বলে। ক্ষমা চাওয়ার মতো শোনাচ্ছে। আজ অনেকগুলো মিথ্যা কথা কেয়াকে বলেছে কিন্তু এটাও সত্যি, মনের গভীর থেকেই সে জানতে চায় : ‘আমাকে তুমি মন থেকে একদমই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছ, তাই না?’
মাথার মধ্যে একটা তপ্ত সিক ঢুকে যাবার মতো যন্ত্রণা সহদেব বোধ করল। এ কী দীনতা, এ কী কাঙ্গালেপনা! কেয়া যদি তাকে মনে না রাখে তাতে কিই বা আসে যায়? তাতে তার প্রতিদিনের জীবনে এক সেন্টিমিটার হেরফেরও ঘটবে না। তবুও প্রশ্নটা কেন সে করল? কেয়ার হৃদয়ে বসবাসের জন্য একটা নিগূঢ় বাসনা কি তার মধ্যে রয়ে গেছে? এই বাসনা কি সবারই হয়? হলেই কি সে অ্যাবনর্মাল?
ঘুমিয়ে পড়ার আগে সেবার মুখটা সে দেখতে পেল। অসহায় ভীত চাহনি।
অনিকে দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে বসে থাকতে দেখল। ‘অনেক সয়েছি মেজদা, আর নয়।’ বেচারা, ওকে যে আজীবনই দুঃখে কাটাতে হবে এটা ও জানে না।
শমিকে পাশ ফিরে খাটে শুয়ে থাকতে দেখল। কি অদ্ভুত স্বার্থপর! মানবিক ছোঁয়া থেকে নিজেকে দূরে রাখার কৃতিত্ব ও দেখিয়েছে। বড়ো কষ্টে ওর শেষ জীবনটা কাটবে।
পঙ্কজও একবার ভেসে উঠল তার চোখের সামনে। গালে ব্রণর গর্ত, সবুজ ট্রাউজার্স, লম্বা ঢোলা পাঞ্জাবি : ‘আসলে আপনি খুব কুঁড়ে, উদ্যোগী নন…. চমৎকার মহিলাদের তো আবিষ্কার করতে হয়।’
সহদেবের ঠোঁট নড়ে উঠল হাসির টানে। ‘তুমি উদ্যোগী হয়ে তাহলে আবিষ্কার করেছ? …’অবশ্যই’।
পাকাপাকি ঘুমিয়ে পড়ার আগে সে একটা নাকছাবি দেখতে পেল : ‘আপনার সবদিকে নজর।’
দশ
সহদেব আমেরিকান সেন্টারে পৌঁছল চার মিনিট দেরিতে। দেরির কারণ ট্রাফিক জ্যাম আর একটা কারণ বেলগাছিয়ায় যাওয়া।
বিদ্যুতের এক লাখ টাকা দাবির কথাটা প্রতিভাকে জানাতেই তার বেলগাছিয়া যাওয়া। সদরে ধনঞ্জয়কে দেখে সে নীচু গলায় তাকে বলে, ‘প্রতিভাদিকে একবার নীচে আসতে বলো। বলবে আমি অপেক্ষা করছি একটা কথা বলার জন্য। আলাদা ডেকে বলবে, কেউ যেন না জানতে পারে।’
সহদেব সিঁড়ির গোড়ায় অপেক্ষা করে, তিন মিনিটেই প্রতিভা নেমে আসে।
‘এখানে কেন, ওপরে গিয় বসবেন চলুন।’
‘না না, আমার তাড়া আছে, এক জায়গায় সিনেমা দেখতে যেতে হবে।’
‘একা!’
‘য়্যাঁ?’ সহদেব প্রশ্নটার মর্মার্থ বুঝতে পারল না।’
‘বলছি, একাই সিনেমা দেখতে যাচ্ছেন?’ প্রতিভা মুচকি হাসিটা যোগ করায় সহদেবের কাছে কথাটা পরিষ্কার হল।
‘যাবেন নাকি, একটা একস্ট্রা টিকিট আছে।’ সহদেব ভরসা করে রঙ্গ করার মতো মুখভাব করল।
‘আমি!’ প্রতিভা চোখ কপালে তোলার চেষ্টা করল। সহদেব তখন দেখল নাকছাবিটা নেই। সে একটু দমে গেল।
‘আপনার পাশে বসে সিনেমা দেখব আমি! হায় পোড়া কপাল, কোনো রকম যোগ্যতাই তো আমার নেই!’ প্রতিভা মাথার ঘোমটা আধ-ইঞ্চি টেনে দিল। ওর অনামিকায় একটা লাল পাথর বসানো আংটি দেখল, এটা আগে সে কখনো দেখেনি।
‘কী বলবেন বলে এলেছেন যেন?’ প্রতিভা হালকা প্রসঙ্গটাকে এক কথায় ভারী করে দিল।
‘ওহ, যা বলতে এসেছি।’ স্বরটা নামিয়ে সহদেব বলল, ‘এক লাখ চেয়েছে।’
‘এক লাখ, বলছেন কী!’
ঠিক এই ভাষায় এই ভঙ্গিতে সহদেবও বলেছিল বিদ্যুৎকে। তবে তখন সে ঢোঁক গিলে হাসার চেষ্টা করেছিল, প্রতিভা তা করল না।
‘সেয়ানা, বজ্জাত। আপনি কি বলেছিলেন কে টাকা দেবে?’
‘না। তবে ও ঠিক ধরে নিয়েছে এই বাড়ি থেকেই টাকাটা আসবে তাই অ্যামাউন্টটা এক লাখ করেছে।’
‘এ কি কম টাকা!… অসিদাদাকে বলে দেখি। দেশের বাড়িতে গেছে গাড়ি নিয়ে, সন্ধেবেলাতেই ফিরবে। … আপনি কি রাতে ফোন করতে পারবেন?’
‘চেষ্টা করব, নয়তো কাল সকালে।’ সহদেব যাবার জন্য পা বাড়াল।
‘আপনি কি ওকে সব ব্যাপার ভালো করে বুঝিয়ে বলেছিলেন?’
‘বেশি আর বোঝাতে হয়নি, ও নিজেই বোঝে। আশ্চর্যের কথা, বিদ্যুৎ ঠিক আপনার মতোই বলল, তবে অন্য ভাষায়, ফুর্তি করতে গেলে টাকা তো খসাতে হবেই।’
সহদেব লক্ষ করল প্রতিভার মুখটা একটু অন্যরকম হয়ে গেল। দোনামনা করে প্রতিভা বলল, ‘আপনি আর একবার বলে দেখুন না যদি কমসম করে, আমি অসিদাদাকে রাজি করাচ্ছি।’
‘বেশ।’
সেখান থেকে সহদেব এল শ্যামবাজার পাঁচমাথার মোড়ে। কী একটা ব্যাপার নিয়ে রাস্তা অবরোধ হয়েছিল। পাঁচটা রাজপথে সার দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে যায়। অবরোধ উঠে গেছে কিন্তু গাড়ির জট এখনও ছাড়ায়নি। সহদেব সেন্ট্রাল অ্যাভেনিয়ু দিয়ে ধর্মতলা যাওয়ার একটা বাসে উঠল। ঘড়ি দেখে হিসাব করল যদি স্বাভাবিক ভাবে যায় তাহলে সে সিনেমা শুরুর পাঁচ মিনিট আগে পৌঁছবে।
কিন্তু বউবাজারে মোড় থেকে আবার ট্রাফিক জ্যাম, তবে বড়ো রকমের নয়। থেমে থেমে বাসটা মেট্রো সিনেমার সামনে আসতেই সে নেমে পড়ে প্রায় ছুটেই আমেরিকান সেন্টারের ফটকে পৌঁছাল।
বাঁ দিকে একটা মানুষ ঢোকার মতো দরজা। একটি লোক দাঁড়িয়ে। টিকিটটা তার হাতে দিতেই দরজা খুলে তাকে যেতে দিল। আলো থেকে অন্ধকার ঘরে ঢুকে প্রথমেই যা হয় সহদেব সহদেব সামনের স্ক্রিনে ছবি ছাড়া কিছুই দেখতে পেল না। তবে এই ছোট্ট ঘরটা তার প্রায় মুখস্থ, বহুবার এসেছে সিনেমা দেখতে। তার প্রিয় বসার জায়গা একদম পিছনে দেয়াল ঘেঁষে।
