‘কী সমস্যা… সেবা?’
‘ওটা তো আছেই … লোকে কী বলবে?’
‘এখানে তোমরা দুজনে যা করছ তাতেও তো লোকে হাসে, অনেক কথা আড়ালে বলে। আজ তুমি যা করেছ…’ আপনা থেকেই সহদেবের গলা কঠিন হয়ে উঠল।’ অনিকে তুমি কী সব কথা বলে এসেছ? অসিতকে খুন করবে? ভালো কথা, কিন্তু সেবা সম্পর্কে… ছি ছি ছি।’
বিদ্যুতের মুখ ফ্যাকাসে হয়ে এল। মাথা নামিয়ে বলল, ‘রাগের মাথায় বলে ফেলেছি।’
‘রাগ! এইরকম নোংরা কথা রাগের মাথায়ও কোনো বাবা বলতে পারে না। আসলে তুমি ভয়ংকর একটা মানসিক ঘূর্ণির মধ্যে পড়ে গেছ বিদ্যুৎ, তুমি ধীরে ধীরে তলিয়ে যাচ্ছ। এর থেকে বেরিয়ে আসতে হলে… বাঁচতে হলে একটাই পথ খোলা আছে।’
সহদেব পথটার নাম আর করল না। বিদ্যুৎ আনমনার মতো দরজার বাইরে তাকিয়ে। ক্রমশ তার মুখ কঠোর হতে হতে হতাশায় নরম হয়ে এল।
‘কিন্তু আমি একা কেন বদনামের বোঝা বইব? ওকে যা খুশি করার পাসপোর্ট দিয়ে আমি সরে যাব… কেন? বাড়ির লোকের কাছে মুখ দেখাব কী করে? বউ খেদিয়ে দিয়েছে, ব্যাটা হিজড়ে, এই ধরনের কথাই তো শুনতে হবে! তাছাড়া এ চাকরিটাও আর আমি করতে পারব না, ছেড়ে দেব। আমি তো একেবারে পথে বসে যাব!’
সহদেব যেদিকে কথাবার্তাটা আনতে চাইছিল বিদ্যুৎ নিজেই সেই দিকে তা টেনে নিল।
‘পথে বসবে কেন! চাকরি নাই করলে, ব্যবসাট্যাবসা কিছু একটা করো। আবার বিয়ে করো, সেটেল্ড হও, নতুন করে জীবন শুরু করো।’ সহদেব দ্রুত বলে গেল। তার ভয় হয়েছিল, কথাগুলো বলার সুযোগ বোধহয় আর পাবে না।
‘ব্যবসা… আবার বিয়ে!’ হতভম্বের মতো বিদ্যুৎ তাকিয়ে রইল। ‘বলছেন কী?’
‘ঠিকই বলছি। ডিভোর্স কি পৃথিবীতে কেউ করেনি না এ দেশে ওটা হয় না? যারা ডিভোর্স করেছ তারা কি সব পথে বসে গেছে?… না না এসব কোনো কথা নয়, এটা কোনো যুক্তি? তুমি লেখাপড়া শিখেছো, ম্যাচিওরড লোক… কিছু একটা ব্যবসা ধরে নিতে পারবে। চাও তো টাকার ব্যবস্থা আমি করে দেব।’ তীক্ষ্ন দৃষ্টিতে সহদেব তাকাল।
বিদ্যুতের ঢিলেঢালা ধসেপড়া ভাবটা মুহূর্তে বদলে গেল। সহদেব মনে মনে হাসল। যে দেবতা যে পুজোয় সন্তুষ্ট হয়! টাকার গন্ধ পেয়েই ওর ষষ্ঠ ইন্দ্রিয়টি সজাগ হয়ে উঠেছে। সহদেব প্রস্তুত হল দরাদরির জন্য।
‘টাকা দেবেন? কত?’
‘তুমিই বল। একটা ছোটোখাটো ব্যবসা, তুমি খাটিয়ে লোক, অনেস্টলি কাজ করলে নিশ্চয় বড়ো হয়ে উঠতে পারবে। খুব বেশি তো আমি জোগাড় করতে পারব না।… হাজার দশেক হয়তো পারব।’
‘আপনি তো এখন বেলগাছিয়া থেকে আসছেন, দিদিকে পৌঁছে দিতে গেছলেন, না?’
সহদেব সতর্ক হল। কী বলতে চায় ও? টাকা দেবার আইডিয়াটা কোথা থেকে মাথায় ঢুকল? সেটা বুঝতে পেরেছে বোধহয়।
‘হ্যাঁ গেছলুম। হঠাৎ এ কথা?’
‘এমনিই। দশ হাজার টাকায় কী ব্যবসা শুরু করব?’ বিদ্যুৎ ভালোমানুষি গলায়, সরল মুখে জানতে চাইল।
বিব্রত হল সহদেব। তার কোনো ধারণা নেই এই ব্যাপারে। চোখ কুঁচকে বিদ্যুৎ অপেক্ষা করছে উত্তরের জন্য বা মজা দেখছে। মানুষের প্রয়োজনে যা কিছু লাগে তাই নিয়েই ব্যবসা করা যায় কিন্তু দশ হাজার টাকা দিয়ে তার কোনটার শুরু সম্ভব, সহদেব তা আন্দাজ করতে পারছে না। হঠাৎ চোখ পড়ল দই আর বোঁদের পলিথিন থলিটায়।
‘তুমি খাবারের দোকান দিতে পার। মিষ্টির দোকান।’
‘একটা শো-কেস, দুটো টেবিল আর আটটা চেয়ার করতেই দশ হাজার বেরিয়ে যাবে। তারপর?’ বিদ্যুৎ মিটমিট করে হাসতে লাগল। ‘এরপর বলবেন দর্জির দোকান বা লন্ড্রি বা চুলকাটার সেলুন!’ বিদ্রূপটা ঢাকা দেবার কোনো ইচ্ছা তার স্বরে নেই।
‘তাহলে কুড়ি হাজারে হয় এমন ব্যবসার কথা ভাব।’ সহদেব নিলামে দর দেবার মতো অঙ্কটা বাড়াল।
‘না ভাবব না। আজকের দিনে কুড়ি-পঁচিশ হাজারে কোনো ব্যবসা হয় না, অন্তত একলাখ হাতে নিয়ে ছোটোখাটো ব্যবসায় নামার কথা ভাবা যায়।’
‘এক লাখ!’ সহদেব আবার বলল, ‘বলছ কী! একলাখ?’
‘হ্যাঁ একলাখ। নগদে পেলেই কোর্টে দাঁড়িয়ে বলে আসব, মদ খাই, মাগিবাড়ি যাই,বউকে পেটাই, অত্যাচার করি। যা শিখিয়ে দেবেন তাই বলব, যে কাগজে বলবেন তাতেই সই করে দোব। নিঃশব্দে এই বাড়ি ছেড়ে চলে যাব, কাকপক্ষিতেও টের পাবে না। জীবনে আর আমার মুখ আপনারা দেখতে পাবেন না, এ কথা স্ট্যাম্প কাগজে রেজেস্ট্রি করে লিখে দিয়ে যাব।… একলাখ চাই।’
সহদেব ঢোঁক গিলল, হাসার চেষ্টা করল। বিদ্যুৎ উঠে দাঁড়িয়ে ধীর স্বরে বলল, ‘টাকা কোথা থেকে, কে দেবে তা আমি জানি। ফুর্তির পথ থেকে কাঁটা সরাতে গেলে একটু তো কাঁটা ফুটবেই মেজদা। আপনি জানিয়ে দেবেন, এক লাখ খসালেই পথটা ফুলে ঢেকে যাবে। শালিকে নিয়ে যা খুশি করতে পারবেন।… আমি যাচ্ছি।’
বিদ্যুৎ ঘর থেকে বেরিয়ে যখন সিঁড়ির কাছে সহদেব তাকে ডেকে আনল। পলিথিনের থলিটা তার হাতে তুলে দিয়ে বলল, ‘দই বোঁদে আর রুটি আছে সেবার জন্য, কাল সকালে ওকে দিও, আর টাকার ব্যাপারটা পরে তোমায় জানাব।’
বিনীত বাধ্য ছেলের মতো বিদ্যুৎ মাথাটা হেলাল।
রাতে বিছানায় শুয়ে সহদেব সকাল থেকে এখন পর্যন্ত, একটা দিনে তার যা কিছু অভিজ্ঞতা হয়েছে সেগুলোর একটা তালিকা গড়ার চেষ্টা করল। তারপর সে তালিকা থেকে কেয়ার নামটা বাদ দিল। অল্প বয়সে তাজমহল গল্প লেখার থেকেও বোকামি হয়েছে আজ তার কেয়ার কাছে যাওয়াটা। তার আসাটাকে নিয়ে কেয়াও নিশ্চয় ভাববে এবং নিশ্চিতই হাসবে। কিংবা তার অধঃপতন দেখে কিছুক্ষণের জন্য বিষণ্ণবোধ করবে। চমৎকারভাবে শোধ নিল : ‘পার তো একটা মেয়ে খুঁজে নিয়ে এবার বিয়ে করো, বাবা হও, নইলে স্বাভাবিক থাকতে পারবে না। একটা নর্মাল লাইফ থাকা দরকার।’
