প্রতিভা উঠে দাঁড়াল, দূরত্ব ও সম্ভ্রম বজায় রাখার কথা মনে পড়ায়।
‘বিদ্যুৎ রাজি হলে টাকাটা কে দেবে, অসিত?’
‘তবে না তো কে! ফুর্তি করবে আর দাম দেবে না?’
সহদেব আশ্বস্ত বোধ করল। বিদ্যুৎকে বিদায় করতে পারলে সেও বাঁচে। অন্যের টাকায় যদি সেটা করা যায় তো ভালোই।
‘আমি তাহলে আসি। ওর সঙ্গে কথা বলেই আপনাকে জানাব।’ সহদেব এই প্রথম স্বচ্ছন্দ বোধ করছে প্রতিভার সামনে। তাই নয়, কিঞ্চিৎ চপল হবার মতো সাহসও সে ইতিমধ্যে সংগ্রহ করে ফেলেছে। সিঁড়ির দিকে দু-পা গিয়েই দাঁড়িয়ে পড়ল।
‘নাকছাবিটা তো বয়স অন্তত তিরিশ বছর কমিয়ে দিয়েছে। রোজ পরেন না কেন?’
প্রতিভা হকচকিয়ে দিশাহারার মতো তাকাল। বাঁ-হাতটা নাকে ঠেকাল। রং ফরসা হলে লাল অবশ্যই হয়ে উঠত মুখটা।
‘আজ সকালেই বাসকোটা ঘাঁটতে ঘাঁটতে পেলুম। সাবান জল দিয়ে পরিষ্কার করে ভাবলুম কাবুলকে এটা দিয়ে দিই। ওকে পরাতে গেলুম … জোর করে ও আমায় পরিয়ে দিল। … আপনার সবদিকে নজর।’
অত্যন্ত সুখদায়ক এই লাজুক ধমক সহদেবকে কেন জানি কৈশোর বয়সের অনুভব এনে দিল। তার থেকেও বয়সে বছর পাঁচেকের বড়ো, তাতে কি আসে যায়। প্রতিভা এখনও যৌবন ধরে রেখেছে।
‘ওটা খুলবেন না।’ বলেই প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য সহদেব আর দাঁড়াল না।
কালীমাতা মিষ্টান্ন ভাণ্ডারে এত রাতে কচুরি পাওয়া যায় না। সহদেব দই আর বোঁদে কিনল। ওরা পাতলা একটা পলিথিন থলিতে ভাঁড় আর বাক্সটা ভরে দিল। আজকাল এই থলির খুব চল হওয়ায় সুবিধেই হয়েছে। সহদেব রাস্তা থেকে একবার আপেল কিনেছিল শুধু এই থলিতে বওয়ার সুবিধা দেখেই। কালীমাতার পাশেই রুটি-তরকারির একটা দোকান। কুলি, মজুর, ঠেলা আর রিকশাওয়ালারাই এর প্রধান খদ্দের। সহদেবের মনে হল, এ বেলায় বোধহয় শমি রান্না করবে না। এই রকম আগেও তিন-চারবার হয়েছে। দোকানের রুটি, আলুর দম বা ঘুগনি সবাইকে খেতে হয়। আজও হয়তো তাই হবে। তবু সাবধানের মার নেই ভেবে সে চারটে মোটা রুটি আর তরকারি কিনল।
বোধহয় তার ফেরার কথা ভেবেই সদর দরজায় খিল দেওয়া নেই। ছিটকিনিটা সোজা করে তোলা থাকে। কড়া ধরে পাল্লাটা টানলেই সেটা খট করে নীচে পড়ে। সহদেব টান দিল, শব্দও হল।
শমিদের শোবার ঘরের দরজা খোলা, আলো জ্বলছে, টিভি থেকে বাজনা আর গানের শব্দ আসছে। খাটে শোয়া শমির খোঁপা, পিঠ এবং একধারে বসা সেবাকে ঘরের অন্যদিক থেকে কেউ কিছু জিজ্ঞাসা করল। সেবা তাকে বলল, ‘মেজোমামা।’
মেয়েটার কি খাওয়া হয়েছে? জানার জন্য সহদেব ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়াল।
‘সেবা খেয়েছিস?’
‘হ্যাঁ।’
দরজার পাশ থেকে চেয়ারে বসা বিদ্যুৎ মাথা বাড়িয়ে বলল, ‘মেজদা আপনার খাবার আমি দিয়ে আসছি।’
সহদেব টিভি-র দিকে তাকাল। ভরত নাট্যম বা কুচিপুড়ি, তফাতটা সে বোঝে না, একজন নাচছে। শমিতা পাশ ফিরে ঘুমোচ্ছে বা ঘুমের ভান করে আছে। গম্ভীর চাপা গলায় সে বলল, ‘বিদ্যুৎ, কথা আছে তোমার সঙ্গে।’
‘আপনি ওপরে যান, আমি যাচ্ছি।’
দশ মিনিটের মধ্যেই বিদ্যুৎ ভাতের থালায় দুটি বাটি নিয়ে উঠে এল।
‘দুপুরে খাননি। গরম করে নিয়ে এলুম।’
‘এ বেলা রান্না হয়নি?’
‘না। আলুর দম, পাউরুটি দিয়েই চালিয়ে দিয়েছি।’
‘কেন হয়নি?’
বিদ্যুৎ চুপ করে রইল।
‘বোসো, কিছু কথা আছে, মন দিয়ে শুনে উত্তর দেবে।’
ইতস্তত করে বিদ্যুৎ চেয়ারে বসল, সহদেব খাটে।
‘আমি জানি আপনি কী বলবেন।’ বিদ্যুৎই শুরুটা করল।
‘কী বলব?’
‘এই আমাদের ঝগড়াঝাঁটির কথা। কিন্তু কতদিন এ সব সহ্য করা যায় বলুন তো?’
‘আস্তে, আস্তে কথা বলো, রাত্তির বেলায় অনেকদূর পর্যন্ত শোনা যায়।… হ্যাঁ এটাই আমি বলতে চাই, কতদিন আর সহ্য করবে।’ সহদেবের শান্ত, সহৃদয় স্বর। একটা পুরুষ মানুষ, আর একটা পুরুষ মানুষের জীবনের দুঃখে বেদনা, নৈরাশ্য, যাবতীয় মর্মান্তিক অবস্থাটা বুঝেছে, এমন একটা জায়গায় দাঁড়িয়ে সহদেব কথা বলতে চায়, যেখানে বিদ্যুৎ তাকে বন্ধু ভাবতে পারে, শমির দাদা নয়।
‘তোমাদের বিয়ে সফল নয়। না হবার কারণ অবশ্যই শমি। ওকে তো আমি তোমার থেকে বেশি জানি। তোমাদের বনিবনা হয়নি, প্রেম ভালোবাসা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বিশ্বাস, স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে যেগুলো প্রধান বন্ধন সেটা তোমাদের নেই, তোমরা বন্ধু হতে পারনি। ঠিক কিনা?’
সহদেব উত্তরের জন্য অপেক্ষায় রইল। বিদ্যুৎ মেঝের দিকে তাকিয়ে চিন্তায় নিমগ্ন, উত্তর দিল না।
‘এভাবেই কি সারাজীবন চলবে? তোমরা এখনও ইয়াং। এভাবে কি চলতে পারে, চলা উচিত?’ সহদেব প্রশ্নটা রাখল স্বর আরও নরম করে।
‘লেখাপড়া করেছি, কিছু বোধবুদ্ধি হয়েছে, নিজেদের ভালোমন্দ বুঝতে শিখেছি…’
‘আমাদের মধ্যে মিল হওয়ার নয় মেজদা, হবে না।’ বিদ্যুতের ভাঙা স্বর থেকে সহদেব বুঝল ও মথিত হচ্ছে।
‘আমারও তাই মনে হয়। এ ক্ষেত্রে পরস্পরকে ছেড়ে দিয়ে সরে যাওয়া, একেবারে সরে যাওয়াটাই তো বুদ্ধিমানের, তাতে দুজনেরই লাভ।’
‘বিবাহ বিচ্ছেদ বলছেন?’
তাকিয়ে থাকা বিদ্যুতের চোখে চোখ রেখে সহদেব মাথাটা এক ইঞ্চি সামনে ঝোঁকাল।
‘মাঝে মাঝে আমি এটা ভেবেছি। দূর ছাই, কী হবে এই রকম একটা সংসার করে আর স্বামী সেজে থেকে… তার থেকে বরং দেশের বাড়িতেই চলে যাই! কিন্তু কী জানেন মেজদা, অনেক সমস্যাও এতে রয়েছে।’
