‘তুই একা এসেছিস না সঙ্গে কেউ আছে?’
‘ট্যাক্সিতে এসেছি, একাই।’
‘বাড়িতে কেউ নেই, সেবা ছাড়া। ওপরে চল।’ সহদেব কথাটা বলেই দোতলার দিকে তাকাল। সেবা বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়িয়ে।
‘না যাব না।’ উঠোনের ধারে রকের উপর অনিতা বসে পড়ল।
‘কী করতে এসেছিস এত রাতে?’
‘হেস্তনেস্ত করতে । অসুক শমি… ওর একদিন কী আমারই একদিন। অনেক সয়েছি মেজদা, আর নয়।’ অনিতা দুই হাঁটুর মধ্যে মুখ গুঁজে কাঁদতে শুরু করল।
‘এত রাতে হেস্তনেস্ত করে আর লোক হাসাতে হবে না। বাড়ি চল। যা করার, বলার আমিই করব। চল তোকে পৌঁছে দিয়ে আসি।’
সহদেব হাত রাখল অনিতার মাথায়। ধীরে-ধীরে হাতটা বোলাতে থাকল। মিনিট তিনেক দুজনের কেউই কথা বলল না।
‘আমি একাই যেতে পারব।’ অনিতা উঠে দাঁড়াল। তার সুন্দর মুখে বিষাদ আর শ্রান্তি। সহদেব কষ্ট বোধ করল।
‘দাঁড়া, পাঞ্জাবিটা পরে আসি। একা যেতে হবে না।’
ছুটেই সে দোতলায় গেল। পাঞ্জাবিটা মাথা দিয়ে গলাবার সময় সেবার সঙ্গে চোখাচোখি হল। বিবর্ণ মুখে অপরাধীর মতো তাকিয়ে রয়েছে।
‘সদর দরজাটা বন্ধ করে দিয়ে নীচেই থাক। আমি এখুনি আসছি।’
ট্যাক্সিতে যেতে যেতে একসময় অনিতা আলতোভাবে বলল, ‘বিদ্যুৎ একটা কথা বলেছে, সেবার বাবা নাকি ও নয়, অসিত বসুমল্লিক।’
সহদেব শুনে অবাক হয়নি, রাগেওনি, শুধু কষ্ট পায় বাচ্চচা মেয়েটার জন্য।
অনিতাকে তার বাড়িতে দোতলার শেবার ঘর পর্যন্ত সহদেব পৌঁছে দিল। ‘এখন একটু শুয়ে থাক।’
খাটে শুয়ে অনিতা পাশ ফিরে বালিশে মুখ চেপে ধরল। ওদের সঙ্গেই ঘরে ঢুকেছে প্রতিভা। সে নীচু গলায় জিজ্ঞাসা করল, ‘বউমণি কি আপনাদের বাড়িতে গেছিল?’
‘হ্যাঁ।’
সহদেবের মনে হল প্রতিভা সব কিছু জানে, অনি কী কারণে গেছে তাও।
‘আমি যেতে বারণ করেছিলুম, শুনল না’। প্রতিভা ঘর থেকে বেরিয়ে যেতে গিয়ে ফিরে দাঁড়াল।
‘চা খাবেন?’
‘হ্যাঁ’।
দেয়ালের ধারে দুটি চেয়ার, সহদেব একটিতে বসল। অনিতা একই ভাবে পাশ ফিরে শুয়ে। এখন ওর সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা একদমই করা উচিত নয়। ও একা থাকুক। এই ভেবে সহদেব ঘর থেকে বেরিয়ে বসার দালানে এল। ভাগনি দুজনের সাড়াশব্দ পাওয়া যাচ্ছে না। বোধহয় তিনতলায় পড়ার ঘরে। অনিকে নিয়ে একতলা থেকে নিঃসাড়েই সে শোবার ঘর পর্যন্ত গেছে। তার খবর ওরা এখনও পায়নি।
রাস্তার দিকে লাল-সবুজ-হলুদ শার্সি লাগানো পুরোনো চারটে জানলা। সন্ধ্যায় একটা দমকা ঝড় উঠেছিল, পাল্লাগুলো এখনও বন্ধ। একটা জানলার পাল্লা ধরে টানতে গিয়ে খুলল না। সহদেব দ্বিতীয় চেষ্টা করতে গিয়ে থমকাল। ধাক্কাধাক্কি করল যদি শার্সি ভেঙে পড়ে! ইন্ডিয়া ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে বারান্দার কাচের দরজা তার মনে পড়ল। শার্সিতে নাক ঠেকিয়ে সে ওধারে কী দেখা যায় ঠাওর করতে চাইল। কিছুক্ষণ পর সে মুখ সরিয়ে নিল। সবই কালো।
‘মেজদা চা।’
পাখাটা ঘুরছে, প্রতিভা কাপ হাতে। সোফায় বসে চা-এ চুমুক দিয়ে সহদেব ওর মুখের দিকে তাকাল। প্রতিভা দৃষ্টি নামিয়ে কিছু একটা বলার জন্য উসখুস করছে বুঝে সে বলল, ‘কিছু কি বলবেন।’
‘হ্যাঁ।’ প্রতিভা দু-পা এগিয়ে সামনের সোফার পিঠে হাত রেখে দাঁড়াল। ‘এদের এই ব্যাপারটা … আগাগোড়াই আমি জানি। আমিই ঘটক ঠিক করে দিয়েছিলুম আপনার ছোটো বোনের বিয়ের জন্য।’
সহদেব বুঝতে পারল না, প্রতিভা কী বলতে চায়। তবে ওর স্বরে লাগানো অনুশোচনা আর বিমর্ষ ভাবটা তার কানে লেগেছে।
‘আপনার আর কী দোষ, তখন যা করার ছিল তাই করেছেন। কিন্তু ব্যাপারটা যে ওরা এভাবে টেনে চলবে তা তো আপনি, আমি তখন আর বুঝিনি।’
সহদেব ধীরে-ধীরে বলার সময় মুখটা লক্ষ্য করল। কী যেন ভাবছে আর সেটা গুছিয়ে প্রকাশ করার চেষ্টা চলছে। আর চোখে পড়ল নাকে সোনার ফুলটাকে। নাকটা একটু চাপা আর ছাড়ানো। নাকছাবিটা বোধহয় কাবলির দাদুর দেওয়া, পুরোনো ধরনের নকশা কিন্তু মন্দ দেখাচ্ছে না। ওকে নাকছাবি পরতে সে আগের দিনও দেখেনি। হঠাৎ এই বয়সে আবার পরার শখ হল কেন!
‘আচ্ছা বিদ্যুৎকে যদি,’ প্রতিভা সামনের সোফাটায় কোণ ঘেঁষে আড়ষ্টভাবে বসল। ‘কিছু টাকা দিয়ে বিদেয় করা যায়!’
‘ডিভোর্স!’
‘হ্যাঁ।’ প্রতিভা উৎসুক হয়ে ঝুঁকল। সহদেব খালি কাপ টেবিলে রাখার জন্য ঝুঁকল। প্রতিভা সেটা হাত বাড়িয়ে নেবার সময় বলল, ‘করা যায় না?’
সহদেব সিলিংয়ের দিকে মুখ তুলে চোখ বন্ধ করে ভাবল। ঠোঁট কামড়াল। তার সামনে এই প্রথম সে প্রতিভাকে বসতে দেখছে। এই মুহূর্তে ও নিজেকে আর কাজের লোক মনে করছে না। সংসারটাকে নিজের বলেই ভাবে, মায়ামমতা না থাকলে অনির ব্যক্তিগত বিপর্যয় নিয়ে এভাবে মাথা ঘামাত না। … প্র্যাকটিকাল বুদ্ধিটা রাখে, শৌখিনও।
‘করা যায়। অত্যন্ত লোভী, অর্থ পিশাচ … টাকা দেখালে রাজি হয়েও যেতে পারে, তবে ভালো টাকাই চাইবে।’
‘কত চাইবে? আপনি কি ওর সঙ্গে একবার কথা বলবেন?’
‘বলতে পারি।’ এরপরই সে যোগ করল, ‘কিন্তু এভাবে কি আসল সমস্যাটা মিটছে?’
‘একটা যন্ত্রণার হাত থেকে বউমণি তো রেহাই পাবে। তারপর দেখা যাবে অন্যটা।’
‘অন্যটা মানে অসিত?’
‘হ্যাঁ।’
‘কী করবেন?’
‘কী আবার করব, সামলেসুমলে চলতে বলব… বউমণি যেন মনোকষ্ট না পায় সেদিকে নজর রাখতে বলব। বড়োঘরের জোয়ান পুরুষ মানুষ, তার বেশি আর কিছু তো বলা যায় না।’
