সদর দরজা খোলা রয়েছে দেখে সে বিস্মিত হল। পাওয়ার কাট-এর সময় ছিঁচকে চোরের উপদ্রব শুরু হয়, কেউ সদর খুলে রাখে না। নিশ্চয় কোনো কিছু একটা ঘটেছে। সহদেব ইতস্তত করল, কড়া নাড়বে কি নাড়বে না।
‘মেজোমামা আমি এখানে।’
পাশের বাড়ির রক থেকে সেবার গলা শোনা গেল। সহদেবের বিস্ময় আরও বাড়ল। অন্ধকারে, বাড়ির বাইরে, এই সময়ে!
‘তুই এখানে কেন?’
রক থেকে নেমে, ক্রাচে ভর দিয়ে বারো বছর বয়সি মেয়েটি তার কাছে এল। চলাফেরার সময় সেবার ক্রাচ শব্দ করে না। খটখট শব্দে কেউ বিরক্ত হোক বা তার পায়ের দিকে তাকাক এটা বোধহয় সে চায় না।
‘বাড়িতে কেউ নেই।’
‘কেন! তোর মা?’
‘মা বেরিয়ে গেছে, বাবাও।’
‘আশ্চর্য, কখন বেরিয়েছে?’
‘অনেকক্ষণ, তখন আলো ছিল সন্ধে থেকেই লোডশেডিং।’
‘একসঙ্গে বেরিয়েছে? গ্যাছে কোথায়? ঝগড়া হচ্ছিল?’
‘মাসিমার বাড়িতে গ্যাছে। প্রথমে বাবা বেরিয়ে গেল, তার একটু পরেই মা।’ সেবা একটি প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার দরকার বোধ করল না।
‘কী নিয়ে ঝগড়া হয়েছে?’ সহদেব যে অস্বস্তিটা পেতে ঘৃণা করে, এখন সেটা পাওয়াই শুরু হল। নিশ্চয় ওই দুটো চিৎকার শুরু করে, হয়তো হাতাহাতিও এবং অসিতকে কেন্দ্র করেই, নয়তো অনির বাড়িতে দৌড়বে কেন বিদ্যুৎ!
সেবা চুপ করে রইল। সব কিছু বোঝার বয়স না হলেও, বাবা-মায়ের মধ্যেকার সম্পর্কটা সে জেনে গেছে। সহদেবের কাছে এটা যন্ত্রণার মতো। এক একসময় তার মনে হয়েছে, ক্যানসার বা এইডস বোধহয় এর থেকে আরামদায়ক। মেয়েটার ভবিষ্যৎ বলে কিছু আর রইল না।
‘মেজোমামা ভেতরে যাবে?’ সেবা শান্ত ক্ষীণস্বরে অনুরোধ জানাল।
‘চল।’
ঘোর অন্ধকারে বাড়িটাকে পোড়ো মনে হচ্ছে। সেবার কাঁধ ধরে সহদেব তাকে সিঁড়ির কাছে এনে বলল, ‘ওপরে চল, আমার আগে ওঠ।’
দোতলায় ঘরের তালা খুলে সহদেব টেবল হাতড়ে টর্চটা খুঁজে নিল। তারপর কেরোসিনের ল্যাম্পটা জ্বালল।
‘আয়, ভেতরে এসে বোস।’
জানলা দুটো খুলে দিয়ে সহদেব আন্দাজেই বলল, ‘কিছু খাওয়া হয়নি তো?’
সেবা চুপ। ঝুলির মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কাগজে মোড়া সাবানের মতো একটা কেক সে বার করল। কেয়ার বাড়ি থেকে বেরিয়ে ধর্মতলায় এসে এক চিনে দোকানে খেয়ে সে বইয়ের দোকানগুলোয় খানিকটা সময় কাটায়। তারপর সেন্ট্রাল অ্যাভেনিয়ুয়ের কফি হাউসে ঘণ্টা তিনেক। মিনিবাস-এ আধঘণ্টা ভিড়ের চাপে দাঁড়িয়ে থেকে সে খুবই ক্লান্ত বোধ করছিল। বাস থেকে অন্ধকারের মধ্যে নেমে দুটো কেক আর বিস্কুটের একটা প্যাকেট কিনেছে। সকালে চা-এর সঙ্গে শমি যা খেতে দেয় প্রায়শই তাতে তার মন ভরে না। সকালে মিষ্টি জিনিস খেতে তার ভালো লাগে।
‘এটা এখন খেয়ে নে। রান্নাবান্না আজ আর বোধহয় হবে না। আমরা দুজনে কালীমাতায় গিয়ে তাহলে কচুরি খাব। ওরা ছোলার ডাল দেয়, খেতে দারুণ।’
সহদেব লক্ষ করল কেকের মোড়কটা কত যত্নে সেবা ছিঁড়ল। কামড় দেওয়া এবং চিবোনোর মধ্যে ব্যস্ততা নেই। মুখটা নামিয়ে রেখেছে। ওর সংযত ভাবের মধ্যে এমন এক আভিজাত্য প্রকাশ পাচ্ছে যা এই বাড়ির কারুর নেই। সহদেব নিজেকেও তার অন্তর্ভুক্ত করল।
‘বাইরে গিয়ে বসেছিলিস। তোর ভয় কচ্ছিল, না?’
সেবা লাজুক হাসল।
‘নীচে তোর পড়ার অসুবিধে হয়, আমি জানি। এক কাজ কর, আমি যখন থাকব তুই বই নিয়ে ওপরে চলে আসবি।’
‘তুমি তো অনেক রাত করে ফেরো।’
‘রোজ তো রাত হয় না। আচ্ছা এবার চেষ্টা করব খুব তাড়াতাড়ি ফিরতে। একটা ইনভার্টারও কিনব ভাবছি, হাজার পাঁচেক টাকা লাগবে।’ পাঞ্জাবিটা খুলতে খুলতে সে কথাগুলো বলল।
এরপর সহদেব কুঁজো থেকে জল গড়িয়ে গ্লাসটা সেবার হাতে দিল। জল খেয়ে গ্লাসটা ফিরিয়ে দেবার সময় সেবা যেভাবে তাকাল, সহদেবের তাতে মনে হল ওর তেষ্টা মেটেনি। কিন্তু আর এক গ্লাস চাইতে যেন ও কুণ্ঠিত।
দ্বিতীয় গ্লাস জল খেয়ে দেবা তৃপ্ত ও কৃতজ্ঞ চোখে যখন তাকাল সহদেবের মনে হল, সারাদিনে জমে ওঠা মনের গ্লানি ও দেহের নিরুৎসাহ বোধ থেকে সে ছাড়া পাচ্ছে। একটা তীব্র আবেগ এখন তার দিকে ধেয়ে আসছে। আর তখনই বাইরে থেকে একটা ‘হা আ আ আ’ রব সে শুনতে পেল।
‘আলো এসেছে মেজোমামা।’ সেবা ব্যস্ত স্বরে বলল।
সুইচ টিপতেই আলোয় ভরে গেল ঘর। দুজনেই উজ্জ্বল চোখে দুজনের দিকে তাকিয়ে। তখনই সদরে কড়া নাড়ার আওয়াজ তারা শুনল। ব্যস্ত, অধৈর্য আওয়াজটা। সেবার মুখ ম্লান হয়ে এল।
‘তুই বোস।’ সহদেব দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে নীচে নেমে এল। দরজা খুলেই সে চমকে উঠল।
‘অনি তুই।’
‘মেজদা, শমিটা শুরু করেছে কী? আমার সব্বোনাশ না করে কি ও ছাড়বে না? আমাকে কি শান্তিতে থাকতে দেবে না?’
‘চুপ, চুপ,…আস্তে বল। ভেতরে আয়।’ হাত ধরে অনিতাকে ভিতরে এনে সহদেব দরজা বন্ধ করল।
‘হয়েছে কী?’
‘আর হয়েছে!’ ফুঁপিয়ে উঠল অনিতা, ‘বিদ্যুৎ গিয়ে যা নয় তাই বলে কী সব নোংরা নোংরা কথা শোনাল, ওর আর শমির নামে। বলল, ওকে খুন করে ফাঁসিতে যাবে।’
সহদেব ভেবে উঠতে পারছে না, এখন তার কী বলা বা করা উচিত। এই রকম একটা পরিস্থিতি যে ঘনিয়ে আসছে সে আঁচ করেছিল। এতকাল জেনেও না জানার ভান করে সবাই চলেছে শুধু বিদ্যুৎই মাঝেমধ্যে ফেটে পড়ত। অনির মধ্যে কোনোরকম প্রতিক্রিয়া না দেকে সে অবাক হত।
