‘ডায়াবেটিস নাকি?’
‘সামান্যই, তবে যাতে না বাড়ে সেজন্য বন্ধ করেছি।’
‘উনিও চিনি খান না, বরাবরের অভ্যেস, ডায়াবেটিসের জন্য নয়… তাহলে আর কী দেওয়া যায়… ওমলেট খাও।’ কেয়াকে ব্যস্ত না হলেও কিছুটা বিব্রত দেখাল। ‘একেবারেই কিছু মুখে না দিয়ে … এই প্রথম এলে।’ কেয়া জিজ্ঞাসু চোখে এমন ভাবে তাকাল যেন সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায় সহদেবেরই।
‘কিচ্ছু দরকার নেই, স্রেফ এক গ্লাস ঠান্ডা জল। দুপুরে খাওয়ার কথা এই কাছেই গভমেন্ট হাউসিংয়ে, অফিসের এক কলিগের ছেলের পৈতে।’ সহদেব জানিয়ে দিল, পুরোনো প্রেম কবর থেকে তোলার জন্য এখানে আসিনি।
‘এগুলো নিয়ে যা আর ফ্রিজের থেকে এক গ্লাস জল দে।’ মেয়েটিকে নির্দেশ দিয়ে কেয়া টেবল ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অস্ফুটে ‘ও ও ওহ’ বলেই ছুটে গিয়ে ফোনের রিসিভার তুলে ডায়াল করতে শুরু করল।
জল খেয়েই চলে যাবে, এমন একটা প্রস্তুতি সহদেব ইতিমধ্যে নিল। একটা খুব ছেলেমানুষি কাজ আজ সে করে ফেলেছে এখানে এসে, এমন এক আত্মগ্লানি তাকে এখন চেপে ধরেছে। এটা বুঝতে পারার সঙ্গে সঙ্গে একটা রাগও ঘনিয়ে উঠছে তার মধ্যে। কেয়া কী ভাবল বা ভাববে সেটা নয়, নিজেকে সে কোন যুক্তি দিয়ে বোঝাবে, আজ এখানে, এতবছর পর প্রাক্তন প্রেমিকার কাছে, যে এখন বিবাহিতা, তার কাছে, যে এখন জনপ্রিয়তার একটা উঁচু জায়গায়, রোজগারও ভালো, তার কাছে আসার কোনো দরকার ছিল কি? কেয়া এখন খুব নামি, এটাই কি তাকে লুব্ধ করেছে? কেয়ার শারীরিক আকর্ষণ, অবশ্যই যৌন আকর্ষণ, কতটা তীব্র বা আরও ভোঁতা হয়েছে কি হয়নি, এসব মাথায় না রেখেই তো সে এসেছে। তাহলে সে কেন এল?
তার মধ্যে কোনো হতাশা, চেতনার অত্যন্ত গভীরে মনোবাসনা পূরণ না হওয়ার কোনো অতৃপ্তি কি তাকে এখানে ঠেলে নিয়ে এল! সহদেব বিমূঢ় হয়ে তাকিয়ে রইল টেলিফোন কানে লাগানো একটু ঝুঁকে নীচু স্বরে কথা বলায় ব্যস্ত কেয়ার দিকে। ওর শতগুণে বেশি বোধবুদ্ধি শিক্ষা আমার অথচ ওই নারী আমার থেকে শতগুণে বেশি পরিচিতা। কাদের কাছে? এটা কোনো প্রশ্ন নয়, এটা ঈর্ষার ব্যাপারও নয়। নিজের ক্ষেত্রে কেয়া গুণী, পরিশ্রম করে খ্যাতি অর্জন করেছে, এটা তো মানতেই হবে।
আসলে ওই মেয়েমানুষটা,-সহদেব হাত বাড়িয়ে জলের গ্লাসটা প্লেট থেকে তুলে নিয়ে মেয়েটির দিকে তাকিয়ে হাসল-কেয়া তাকে অপ্রতিভ করেছে। আমাকে ছাড়াই ও সুখী এটাই বোধ হয় অসহ্য ঠেকছে। সহদেব স্বস্তি পেল কারণটা আবিষ্কার করে।
‘গুরুজির সত্তর বছর বয়স পূর্ণ হল, একটা সংবর্ধনার ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।’ কেয়া রিসিভার রেখে বলল।
সহদেব ছবিটার দিকে তাকিয়ে বলল, ‘সেই সময় থেকেই ওঁর কাছে শিখছ?’
‘সেই সময়’ বলতে সে কী বোঝাতে চায়, কেয়াকে সেটা হৃদয়ঙ্গম করাবার জন্য সহদেব চোখ, ভ্রূ, ঠোঁট মিলিয়ে একটা ছেলেমানুষি ভাব আনার চেষ্টা করল।
‘হ্যাঁ সেই সময় থেকেই। … অসাধারণ জ্ঞানী, উজাড় করে দিয়ে তেমনি শেখানও। অন্য কারুর কাছে নাড়া বাঁধার কথা আর ভাবতেও পারিনি। ওঁকে যে পেয়েছি, এটা আমার ভাগ্য!’
‘তোমার আর একটা সৌভাগ্যের কথা বোধ হয় ভদ্রতাবশতই আর বললে না… আমাকে স্বামীরূপে না পাওয়া।’ সহদেব উঁচু গলায় হেসে উঠল। এতটা জোরে হাসার মধ্যেই যেন সে তার মনের জ্বালাটা বার করে দিল। সে উঠে দাঁড়াল।
কেয়া প্রথম বিব্রত হয়ে সঙ্গে সঙ্গে সামলে নিয়ে বলল, ‘পরে আমারও তাই মনে হয়েছে, স্বার্থপর মানুষের বউ হওয়ার মতো দুঃখের আর কিছু হতে পারে না। নিজেকে নিয়েই তুমি মশগুল, চারপাশের মানুষ আর জগৎ সংসারকে তুমি গ্রাহ্য কর না। নিজেকে একা রেখে রেখে এখন তুমি নিঃসঙ্গ। বললে বয়স বেড়েছে তাই ভয় পাচ্ছ, দুর্বল হয়ে গেছ,… এসব কথা উঠছে কেন?’
সহদেব উত্তর দেবার চেষ্টা না করে তাকিয়ে রইল। কেয়ার স্বরে ঝাঁঝ ফুটে উঠেছে। ঘরের মাঝের টেবলটার কাছে এগিয়ে এসে সহদেবের মুখোমুখি হল।
‘পারো তো একটা মেয়ে খুঁজে নিয়ে এবার বিয়ে করো, বাবা হও…নইলে স্বাভাবিক থাকতে পারবে না। … একটা নর্মাল লাইফ থাকা দরকার।’ কেয়া নিজেকে থামিয়ে দিল সহদেবের মুখে ক্ষীণ, করুণ হাসিটা দেখে।
‘তুমি এবার যাও।’ প্রায় ফিসফিসিয়ে কেয়া অনুরোধ জানাল।
সহদেব দরজার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে চোখটা একবার বুজিয়ে ফেলায়, হাঁটুতে টেবলের কানাটা লাগল। কেয়ার ‘আহহ’ শোনার পর দরজার নব ঘোরাল। সিঁড়ি দিয়ে যখন নামছে তখন শুনতে পেল।
‘আমি কিন্তু শমির কথাটা কাউকে আজও বলিনি।’
নয়
পাওয়ার কাট। সারা অঞ্চল অন্ধকার। বাড়িগুলোর খোলা জানলা দিয়ে মোমবাতির বা হারিকেনের আলো রাস্তা পর্যন্ত আর এসে পৌঁছয় না। ঘুটঘুটে অন্ধকারে রাস্তায় যদি কেউ টর্চ জ্বেলে চলে তা হলে জানা যায় গর্ত বা ঢিপি কোথায়। মুখে বিড়ি বা সিগারেট থাকলে ধাক্কা লাগাটা এড়ানো যায়। একটি বাড়ির তিনতলার ঘরে আলো জ্বলছে ইনভার্টার থেকে। এই পাড়ায় ওরাই সম্পন্ন।
রাস্তাটা সহদেবের মুখস্থ। চল্লিশ বছর সে এই পথ ধরে হাঁটছে, অন্ধকারে তার অসুবিধে হয় না। এই সময় তার ভয় শুধু একটাই, কুকুর না মাড়িয়ে ফেলে। দু-তিনজন কামড় খেয়েছে বলে সে শুনেছে। তবে কুকুরগুলো পাগলা নয়। তা না হলেও একটা ভয় তো মনের মধ্যে ঢুকে যায়! কবে জলাতঙ্ক রোগ ধরবে এবং মরে যাবে, এই ভয় নিয়ে বছরের পর বছর কিছু লোক কলকাতায় জীবন কাটাচ্ছে। তাদের অন্যতম হতে সহদেব একদমই রাজি নয়।
