‘তা কেন, অন্যদের লেখা গানও অনেক গেয়েছি।’
‘শাজাহান মুখস্থ তোমার! কবে করলে?’
‘সেই তখন, যখন বলেছিলে আমার মাথার মধ্যে আছে, সম্ভবত গোবর।’
সহদেব সিঁটিয়ে গেল। মনে করে রেখেছে এখনও। মুখে হাসি টেনে এনে বলল, ‘মুখে বলেছিলুম না চিঠিতে?’
‘মুখেই। আমাকে যা খুশি বলা তো তোমার মুখে আটকাত না।’ কেয়া উদারভাবে হেসে উঠল। যেন একটা মজার কথা বলল।
সহদেব মজা পাচ্ছে না। চিঠির কথাটা ইচ্ছে করেই সে যোগ করেছে। ‘পরশু বইগুলো রোদে দিতে গিয়ে তোমার কটা চিঠি পেলুম। পড়লুম। বেশ লাগল।’
‘রেখে দিয়েছ! এত বছর ধরে!’ কেয়াকে অবিশ্বাসীর মতো দেখাচ্ছে।
‘আসলে তাড়াহুড়োয় বইয়ের মধ্যে গুঁজে রেখেছিলুম, তাই ওইভাবেই রয়ে গেছে। ভাগ্যিস রেখেছিলুম! নয়তো এখন আবার পড়ার সুযোগ হত না। ভীষণ ইমোশন্যাল ছিলে, অভিমানীও।’
‘দেখাবে চিঠিগুলো, কটা আছে? … অবশ্য আমি ফেরত দিয়ে দোব।’
‘না না, দেখানো যাবে না, ওগুলো আমার, একান্তই আমার সম্পত্তি। তাছাড়া তোমার এখানে ওসব জিনিস রাখার বিপদ আছে। কখন তোমার স্বামীর হাতে পড়ে যাবে।’
কেয়া একদৃষ্টে তাকিয়ে। চোখের মণি দুটো নড়ছে না কিন্তু ভ্রূ দুটো জোড়া লাগানো। সহদেব হাসল। হাসির মধ্যে পুরোনো প্রণয় যতটা ভরে দেওয়া সম্ভব তাই দিল।
খুব ধীরে কেয়ার ঠোঁটে একটা হাসি জেগে উঠল। কি একটা বলতে গিয়েও বলল না।
‘তুমি খুব সুখে আছ কেয়া। নাম, যশ, অর্থ, জীবনে যা যা কাঙ্ক্ষিত, পেয়েছ। একটা সুন্দর সংসারও। জানি না স্বামীটি কেমন। যে ভদ্রলোকের সঙ্গে কথা বললুম উনিই তো?’
‘হ্যাঁ।’
‘তুমি ওকে ভালোবাসো?’ সহদেব ঝুঁকে মৃদু স্বরে বলল। একটা উদবেগ তার মুখে ছড়ানো।
‘ওকে আমি প্রায় জোর করেই বিয়ে করেছি, উনি রাজি হচ্ছিলেন না। দেখতে খারাপ, বয়সেরও অনেক ডিফারেন্স, একটা গানের স্কুলে মাস্টার, এইসব বলে এড়িয়ে যেতে চেয়েছিলেন।’
‘তাহলে কেন…।’ অকৃত্রিম বিস্ময়ে সহদেব তাকিয়ে রইল। এমন একটা লোককে কেন?
কেয়ার মুখে এমন একটা হাসি ফুটে উঠল যার বারো রকম অর্থ করা যায়। সহদেব তেরো-তম তথ্যটি করল, ঘৃণা।
‘কেন, তা তো বলতে পারব না।’
‘আমাকে তুমি মন থেকে একদমই নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছ। তাই না?’
কেয়া যেন ভাবনায় পড়ল। জানলা দিয়ে কিছুক্ষণ বাইরে তাকিয়ে থেকে বলল, ‘এত ব্যস্ত আমি।’
‘আমার কিন্তু মনে পড়ে।’
‘পড়ে নাকি? কেন।’ কেয়ার কোনো কৌতূহল বা বিস্ময় নেই। ‘কেন’ শব্দটা যেন একটা চিন্তার চেহারা নিয়ে তার সামনে দাঁড়িয়েছে। উত্তর দেওয়ার দায় যেন তারই।
‘পড়ার কোনো তো কারণ নেই। বোধহয় তুমি ব্যস্ত নও। বই পড়া আর লেখা নিয়েই আছ নিশ্চয়, লোকজনের মধ্যে থাকাটা তো পছন্দ কর না। ভুল করেছ। পৃথিবীতে নানান রকম লোকের সঙ্গে মেলামেশা না করলে জানার বোঝার কাজটা হবে কী করে? শুধু বই পড়ে কি হয়? গাইবার সময় আমি একদম পিছনে বসা লোকেদের কথাও ভাবি।’
‘বাড়িতে অনেক ঝামেলা কেয়া, ব্যতিব্যস্ত করে মারে। আমার ব্যস্ততাটা অন্য রকমের, একদমই আনপ্রোডাক্টিভ। তারই মধ্যে যখন একা হতে পারি তখন বহু কথা, স্মৃতি, মনে পড়ে, আমাদের সেই সময়টাকেও।’
‘তুমিও ইমোশ্যানকে প্রশ্রয় দিচ্ছ!’
‘এটা কি খারাপ জিনিস? বই পড়তে পড়তে, গল্প শুনতে শুনতে বা সিনেমা দেখতে দেখতে বহু ঘটনা, কথা, দৃশ্য চোখে জল এনে দেয়। ইমোশ্যনাল হই বলেই তো আমরা মানুষ।’
‘আর আমার বেলায় চোখে জল এসে যাওয়াটা দোষের হয়েছিল।’ কেয়ার স্বরে অনুযোগ নেই। ঠান্ডা, কঠিন, নৈর্ব্যক্তিক স্বরে কথাটা বলল।
ছটফটিয়ে উঠল সহদেব। কী কথা দিয়ে আত্মপক্ষ সমর্থন করবে সেটা চট করে তার মুখে আসছে না। অগোছালোভাবে সে বলে উঠল, ‘তুমি বুঝতে পারছ না, কুড়ি-বাইশ বছর আগে আমি এক রকম ছিলুম, এখন বয়স বেড়েছে… তুমি কি ঠিক বুঝতে পারবে মানে আমি কি বোঝাতে পারব বয়স কীভাবে মানুষকে বদলে দেয়? বয়স দুর্বল করে দেয়, ঝাঁঝ কমিয়ে আনে, নানান রকমের ভয় এগিয়ে আসে। এই ধরো আজ যদি আমার ক্যানসার হয়, এইডস, কিডনি, বাইপাস হার্ট সার্জারি, কোথায় টাকা, কে দেবে টাকা? … আশ্চর্য তোমার কথাটা প্রথমেই মনে এল।’
‘আমার কথা কেন? এখন আমার কিছু টাকা হয়েছে বলে? … ওই সব অসুখগুলো তো আমার বা আমার স্বামীরও তো হতে পারে, পারে না? তখন আমারও টাকার দরকার হবে…কার কাছে চাইব, কে আমাকে দেবে?’ একটা স্থির উত্তেজনাকে, গান গাইবার সময় স্বরকে কঠিন নিয়ন্ত্রণে রাখার মতো, কেয়া তার কণ্ঠে বশীভূত করে রেখেছে।
সহদেব জেনে গেছে এখানে আসাটা ব্যর্থ হয়েছে। মিথ্যা ভান আর ছল দিয়ে শুরু করে সে আন্তরিক উঠেছিল। কিন্তু কেয়ার কাছে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। কুড়ি-বাইশ বছর আগে কেয়াও অন্যরকম ছিল। দুজনের বদলটা দু-রকমভাবে হয়েছে, ঠিকভাবে বললে, কেয়াই শুধু বদলেছে। জীবনধারায় পরিবর্তন ওরই ঘটেছে। নিজেকে বাড়িয়েছে, ছড়িয়েছে সঙ্গে সঙ্গে কঠিন হয়েছে।
দু-হাতে চায়ের কাপ আর সন্দেশের রেকাব নিয়ে কাজের মেয়েটি এল। সোফার পাশে ছোটো একটা তেপায়ায় সে দুটো রাখতেই সহদেব বলল, ‘মিষ্টি আমি খাই না, খেতুম, ছেড়ে দিয়েছি। চিনি দেওয়া চাও নয়।’
খাব না বা খেতে ইচ্ছে করছে না বলার থেকে এই ধরনের মিথ্যা বললে চাপাচাপির ঝঞ্ঝাট এড়ানো যায়। অবশ্য অনুরোধ-উপরোধ কেয়া করবে, সহদেবের তা মনে হল না।
