সোফায় অস্বস্তিকর ভঙ্গিতে আবার বসে সহদেব বলল, ‘কদিন আগে তাজমহল দেখতে যাই।’ কিঞ্চিৎ নিরুৎসুক স্বরে অতঃপর যোগ করল, ‘দিল্লিতে গত সপ্তাহে একটা সেমিনার ছিল, ট্র্যাডিশনাল ওরাল লিটারেচার সম্পর্কে, পেপার পড়তে গেছলাম। ওখানেই মনে হল, তাজমহল না দেখেই ওটার পটভূমিতে একটা প্রেমের গল্প লিখেছিলুম। তুমি সেটা পড়ে বলেছিলে, পড়তে পড়তে তোমার কান্না আসছিল নায়কের জন্য।’
‘সে তো অনেক বছর আগের কথা, তোমার এখনও মনে আছে দেখছি!’ কেয়া বাঁ দিকের সোফায় বসে পড়ল।
ওর বসাটা সহদেবকে আশ্বস্ত করল। তার মনে রাখাকে কেয়া কীভাবে নেবে সেটা এবার বুঝে নেওয়া দরকার।
ওর বসাটা সহদেবকে আশ্বস্ত করল। তার মনে রাখাতে কেয়া কীভাবে নেবে সেটা এবার বুঝে নেওয়া দরকার।
‘দিল্লিতে ভীষণ ভাবে মনে পড়ল…’ সহদেব মুখে একটু হাসি ফুটিয়ে বলল, ‘তোমার ওই কান্নার কথাটা। কী এমন ছিল ওই গল্পটায়? তাই ভাবতে ভাবতেই আগ্রা যাবার বাসের একটা টিকিট কেটে ফেললুম। আমার শুধু মনে হয়েছিল প্রেম, বিরহ, একনিষ্ঠতা, বিচ্ছেদ, মরণ, আত্মাহুতি, এই সব ব্যাপার মেয়েরা খুব পছন্দ করে। তাই তোমাকে নাড়া দিয়েছিল গল্পটা, ঠিক কিনা।’
‘হতে পারে, তখন বয়সটা তো কম ছিল।’
‘ওটা বেড়েছে নাকি! কই শরীরের বয়স তো বাড়েনি বরং আগের থেকে কমই দেখাচ্ছে। বছর খনেক আগে তোমার একটা ছবি দেখেছিলুম, কুড়ি-বাইশ মনে হচ্ছিল। পুরোনো ছবি নাকি?’
সহদেব তুষ্ট করার প্রথম অস্ত্রটি নিক্ষেপ করে ধাঁধায় পড়ে গেল। কেয়ার মুখে রক্ত ছুটে গেল না। চোখের পাতা পলকের জন্যও বেতালা হল না। বস্তুত মোনালিসা ধরনের একটা হাসি ছাড়া আর কোনো ভাবান্তরই নেই! কেয়া বোধ হয় আগের মতো নেই!
‘যাই হোক, তাজমহল দেখলুম। যমুনা নদীর দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে মনে পড়ল, আমার গল্পের নায়ক দুর্ঘটনায় মারা পড়া তার প্রেয়সীর শোকের ভার আর বইতে না পেরে, যমুনায় ঝাঁপ দিল। ওইখানে তখন দাঁড়িয়ে, কি জানি কেন ব্যাপারটা আমার কিন্তু হাস্যকর বা অবাস্তব বলে মনে হল না। মনে হল প্রেম মানুষকে দিয়ে কত কাজই না করিয়ে নেয়। কেউ আত্মহত্যা করে কেউ তাজমহল গড়ে চিরবিরহীর বীণা যুগাযুগান্তরের জন্য রেখে যায়। … আর তখনই তোমাকে ভীষণ ভাবে মনে পড়ল। মনে পড়ল, রবীন্দ্রনাথের ‘শাজাহান’ কবিতাটাও। পঁচাত্তর বছর হয়ে গেছে কবিতাটার বয়স, কিন্তু কী তরুণ আজও।’
‘বিরাট কবিতা। সবটাই কি মনে পড়ল নাকি দু-চারটে লাইন?’
সহদেব অপ্রতিভ হয়ে গেল। কেয়া তাকে সিরিয়াসলি বোধ হয় নিচ্ছে না। কিন্তু সে যে এত বছর পর আচমকা হাজির হল, সেটা তো যৌক্তিক করা দরকার।
‘সবটা কি মনে পড়া সম্ভব? কবিতাটার মূল সুর, বক্তব্য, এটা তো অদৃশ্য ভাবে মনের মধ্যে থেকে যায়ই। হয়তো দু-চারটে লাইনও মনে পড়বে।’
‘পড়বে? আচ্ছা বলতো…’ কেয়া চোখ পিট পিট করে, ধাঁধা বলার মতো স্বরে প্রশ্ন করল, ‘যে প্রেম সম্মুখ-পানে চলিতে চালাতে নাহি জানে, যে প্রেম পথের মধ্যে পেতেছিল নিজ সিংহাসন, তার বিলাসের সম্ভাষণ… তার পরের লাইনে কী আছে বল?’
সহদেব ফাঁপরে পড়ে গেল। সাহিত্য ভারতীয় সম্পাদক বাইশ বছর আগে জিজ্ঞাসা করায় সে বলেছিল, হ্যাঁ শাজাহান পড়েছি। সত্যিই তখন পড়েছিল, কিন্তু মুখস্থ করেনি। একটা লাইন অবশ্য এখনও মনে আছে।
‘দ্যাখো তোমার ওই লাইনের পরে কী আছে বলতে পারব না, তবে এটা মনে আছে… যুগ যুগান্তরে কহিতেছে একস্বরে ভুলি নাই, ভুলি নাই, ভুলি নাই প্রিয়া।’ সহদেবের মুখ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। ‘প্রিয়া’ শব্দটা আলতো কোমলভাবে টেনে রেখে সে কেয়ার দিকে ঠিকভাবেই তাকিয়েছে।
‘একটা লাইন ড্রপ করেছ, ‘যুগ’ নয় হবে ‘যুগে’ … যুগে যুগান্তরে কহিতেছে একস্বরে, তার পরের লাইন, চিরবিরহীর বাণী নিয়া-ভুলি নাই… যাক গে ভুলি নাই ভুলি নাই অনেক হয়েছে, বাড়ির খবর কী? শমির তো একটা মেয়ে, হয়েছে?’
সহদেব ধরেই রেখছিল অবধারিত প্রশ্ন হবে ‘বিয়ে করেছ?’ কিন্তু তার ধার কাছ দিয়েও কেয়া গেল না।
‘হ্যাঁ একটাই, বেচারার পোলিও। তোমার কটি?’
‘একটিও নয়।’ কেয়ার মুখে পাতলা হাসি। ‘আপাতত নয়।’
কেন নয়? আপাতত নয় মানে পরে হতে পারে! সহদেব ভ্রূ তুলে তাকাল। কাজের মেয়েটি তখনই তার পিছনে এসে দাঁড়াল। ইশারায় সে কিছু একটা বলতেই ‘ওহ, হ্যাঁ’ বলে কেয়া উঠে পড়ল। ভালো করে গা না মুছেই শায়া-শাড়ি পরার এবং বসার জন্য কাপড় ভিজে গিয়ে এঁটে রয়েছে দুই নিতম্বে। সহদেব লক্ষ করল খিলেনের মতো প্যান্টির বক্র রেখা। আগে তো এসব পরত না।
‘একটু বোসো, আসছি।’
সহদেব ঘাড় ঘুরিয়ে আর একবার দেখল। মিনিট দুয়েকের মধ্যেই ফিরে এল কেয়া।
‘নতুন একটা গান লিখছেন… মিল দিতে পারছিলেন না।’
‘কী রকম?’
‘তুমি যা বলতে পারলে না সেটাই বলে এলাম। ‘বিলাসের সম্ভাষণের’ পর আছে… ‘পথের ধুলার মতো জড়ায়ে ধরেছে তব পায়ে-দিয়েছ তা ধূলিরে ফিরায়ে।’ গোধূলির সঙ্গে মিল দেবার মতো শব্দ খুঁজছিলেন, বললুম এর থেকে বার করে মিল খুঁজে নাও। এরকম বহুবার হয় আর তখনই আমার ডাক পড়ে, এই ‘ডাক পড়া’ যে অতীব সুখের কেয়ার চোখমুখ তা গোপন করছে না।
‘তুমি শুধু ওনার লেখা গানই গাও?’
