টুলে বসে বঙ্কুবিহারী মিস্ত্রি খাটাচ্ছে। তারক কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা সিঁড়ি দিয়ে উঠতে গেল। বঙ্কুবিহারী ডাকল। বৈঠকখানার দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, ‘কালকের মেয়েটি এসে বসে আছে অনেকক্ষণ।’
অনীতা! তারক মোটেই প্রস্তুত নয় এই সময়ে ওর আসায়। কী দরকার? বঙ্কুবিহারীকে বিরক্ত ও সন্দিহান চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে সে মুখখানি ব্যাজার করে বোঝাতে চাইল, সেও খুব বিরক্ত হয়েছে।
‘বসো বসো। কী ব্যাপার, গুহ কোথায়?’
‘আমি একা এসেছি।’ অনীতা চাপা গলায় বলল। তারক লক্ষ করল ওর চোখ দুটো ফোলা। বোধ হয় রাতে একদমই ঘুমোয়নি। শাড়িটা ঘরে কাচা, ইস্ত্রি হয়নি, শরীরে লেপটে। মনে হচ্ছে বাঁখারির ফ্রেমে কাপড় জড়ানো। তারকের ইচ্ছে করছে না ওর দিকে তাকাতে।
‘এই সময়? এখনই তো অফিস বেরোব।’
‘আপনাকে একটা কথা বলব বলে এসেছি। ডাক্তারের কাছে আপনি যাবেন না।’
‘কেন?’ বলে তারক প্রায় চেঁচিয়ে উঠতে যাচ্ছিল। কিন্তু বঙ্কুবিহারীর কান যে এদিকেই পাতা, তাতেও সে নিঃসন্দিগ্ধ।
‘তবে যে কাল এত কথা হল গুহর সঙ্গে! ব্যাপারটা কী?’
‘আমার ভালো লাগছে না, মানে, কীরকম যেন মনে হচ্ছে?’ অনীতা গুছিয়ে বলার জন্য দু-হাতের আঙুলগুলো জড়াল। তারক লক্ষ করল তিন-চারটে শিরা আঙুল থেকে কনুই পর্যন্ত ফুলে উঠে চুপসে গেল। ‘আপনি বরং ওকে বিয়ের ব্যবস্থা করতে বলুন।’
‘সে তো বলেই ছিলুম। কিন্তু ও চায় আগে এই ব্যাপারটা সেরে নিতে। বিয়ে হলে তো এ সবের দরকার নেই। আমিও অহেতুক একটা বাজে ব্যাপার থেকে মুক্ত হতাম।’
‘না না আপনি ওকে আগে বিয়ের জন্যই বলুন।’
‘তুমি তো বলতে পারো?’
‘বলেছিলুম। আপনাকে যা বলেছে তাই বলল।’
‘তাহলে আমি বললে আর কী হবে। ও তো ছোটোছেলে নয়, তা ছাড়া আমি ওর গার্জেনও নই।’
‘কিন্তু ওর কারণগুলো কি নেহাতই বাজে নয়। বহু মেয়েরই তো প্রিম্যাচুওর ডেলিভারি হয় তাই নিয়ে কি কলঙ্ক রটে? তা ছাড়া এ তো ওরই বাচ্চচা, অন্যের তো নয়?’
তারক মনোযোগ করে অনীতার মুখখানি দেখছিল। বাইরে বঙ্কুবিহারীর চড়া গলা শুনতে পেল, ‘দেবু ক-টা বাজে, অফিস-টফিস কি আজ বন্ধ?’
‘আচ্ছা পরে কথা হবেখন। দুপুরে গুহ টেলিফোন করবে, তখন তো এসব কথা বলা যাবে না। রাতে ওকে আসতে বলব। তোমার সঙ্গে আজ দেখা হবে?’
‘গিয়ে দেখা করতে পারি, কিছু বলতে হবে?’
‘না থাক।’
‘আপনাকে কিন্তু এইটুকু করতেই হবে তারকদা, ছোটোবোনের মুখ চেয়েও অন্তত করুন। ও তো রেজিস্ট্রি বিয়েও করে রাখতে পারে, তাহলে স্বচ্ছন্দে আমি সব কিছু করতে রাজি আছি।’
চান-খাওয়ার ফাঁকে ফাঁকে তারকের মনে হতে লাগল, আবার একটা ঝামেলায় জড়িয়ে পড়ছি। গুহ যদি আগে বিয়ে না করতে চায়, তবে আমাকে কি ওর সঙ্গে লেগে থেকে বোঝাতে হবে এই মেয়েটা চায় আগে বিয়ে হোক। দুজনেই যদি গোঁ ধরে বসে তাহলে আমার ভূমিকা কী হবে? অবশ্য ওরা আমার কেউ নয়। ওদের বাঁচা-মরায় আমার কোনো লাভ-লোকসান নেই। ওরা এটা জানে। তবু আমাকেই ওরা মাঝখানে রাখতে চায়। কী ভেবেছে যে ওরা আমাকে। আমার নিজের যে দু-বেলা ইঞ্জেকশন নেওয়ার এতবড়ো একটা সমস্যা রয়েছে!
ঠিক হাঁটা বলা চলে না, ওয়াকিং রেসের প্রতিযোগীর মতো তারক ট্রাম স্টপে হাজির হল। কালকের সেই স্ত্রীলোকটি ট্রামের জন্য দাঁড়িয়ে। ওকে দেখেই তারক কুঁকড়ে গেল। তার মনে হল, হয়তো ভাবতে পারে কাল গায়ে হাত-টাত দিয়ে লোকটার লোভ ধরে গেছে। আজও ঠিক পিছু পিছু হাজির হয়েছে।
ট্রাম আসতে স্ত্রীলোকটি এগিয়ে গেল এবং উঠল। তারক ক-মিনিট লেট হবে হিসেব করে, পরের ট্রামের জন্য অনেক দূর পর্যন্ত তাকিয়ে নিজেকেই বলল,-এ হচ্ছে এক ধরনের রোগ। ছেঁদাগুলো বন্ধ না করলে সারানো যাবে না। মেয়েটা আমার সম্পর্কে হয়তো ভালো-মন্দ কিছুই ভাবেনি। প্রায়ই হয়তো কেউ-না-কেউ ওকে কোমর ধরে পতন থেকে রক্ষা করে। হয়তো ভুলেই গেছে আমার চেহারাটা। আর আমি নিজেকে অপরাধী বানিয়ে অফিস লেট করে মুখ লুকোচ্ছি। আমি কে, যে অন্যে আমাকেই ভাবছে মনে হয়? আসলে তো লক্ষ লক্ষেরই একজন।
ছয়
‘জিততে হলে ঐক্য চাই!’
‘ঐক্য চাই ঐক্য চাই।’
‘বাঁচতে হলে লড়তে হবে।’
‘লড়াই করে বাঁচতে হবে।’
‘লাইন ভেঙে কাউকে যেতে দেবেন না তারকবাবু।’
‘কী করব জোর করে যে চলে যাচ্ছে।’ অসহায় সুরে তারক বলল।
পিছন থেকে পূর্ণ দপ্তরি পিঠে চাপ দিল-‘ঘন হয়ে থাকুন, আপনি বড্ড ফাঁক রাখছেন।’
তারক লম্বা পায়ে এগোতে গিয়ে নিখিল চাটুজ্যের গোড়ালিতে ঠোক্কর দিল। বুড়ো মানুষ, অল্পদিনই আর চাকরিতে আছেন। তারক খুবই লজ্জা পেয়ে ঝুঁকে বলল, ‘লাগল আপনার?’
বৃদ্ধ ঘাড় ফিরিয়ে দেখে নিল কথাটা কে বলল। তারপর মাথা নাড়ল। তারক সকলের পা ফেলার তালটা ধরার চেষ্টা শুরু করল। আর মাঝে মাঝে মিছিলের মাথার দিকে তাকিয়ে হিরণ্ময়কে লক্ষ করে চলল। নানান অফিসের মিছিল, একটির পিছনে আর একটি জুড়ে জুড়ে কতবড়ো যে হয়ে গেল তারক আর ঠাওর করতে পারছে না। লাল সালুর ফেস্টুনগুলো আড়াল করে আছে সামনেটা। তারকের ইচ্ছে হল, চট করে লাইন থেকে বেরিয়ে একবার দেখে নেয়, পাশ থেকে মিছিলটাকে কেমন দেখাচ্ছে। কিন্তু সেটা নিয়মবিরুদ্ধ কাজ হতে পারে ভেবে নিরস্ত রইল।
‘আপনি কি আজই প্রথম মিছিলে যোগ দিলেন?’ নিখিল চাটুজ্যে মুখটা পাশে ফিরিয়ে কিন্তু সামনে চোখ রেখে বলল।
