‘বসুন।’ দরজাটা আর একটু খুলে ধরে মেয়েটি সরে দাঁড়াল।
তৃতীয় ব্র্যাকেটের মতো সাজান তিনটি বৃহদাকার সোফা। সহদেব ইতস্তত করল, কোন দিকের সোফায় বসবে ঠিক করার জন্য। ভিতর থেকে কেউ এলে প্রথমেই তার মুখটা যাতে দেখতে না পায়, এই রকম একটা সোফা সে বেছে নিল।
এখন তার সামনে কাচের পাল্লা দেওয়া বাঁ দিকে দুটি জানলা। জানলাগুলোর মাথায় পেলমেট। সোনালি জমিতে হাকলা হলুদ নকশা আঁকা সবকটা ভারী পর্দাই সরিয়ে রাখা। খোলা জানলা দিয়ে বহুদূর পর্যন্ত আকাশ দেখা যাচ্ছে। ঘরটা অলোয় ভরপুর। মাঝখানে নীচু একটা কাচ বসানো টেবল। পিতলের ফুলদানিতে রজনিগন্ধার গোছা। দুটো পিতলের অ্যাশট্রে, কয়েকটা রাবার ম্যাট। টেবলের নীচে একটা তাক। ম্যাগাজিনের মতো কয়েকটা বই, খবরের কাগজ। একটা পুরু গালিচা তিন দিকের সোফাকে স্পর্শ করে বিছানো।
সোফায় বসা মাত্রই সহদেব প্রায় এক ফুট ডুবে গেল। হাঁটু থেকে গলা পর্যন্ত শরীরটা সেজন্য এমন এক ভঙ্গি ধারণ করল যেটা তাকে অস্বাচ্ছন্দ্যে ফেলে রাখল। একবার তার মনে হল, উঠে গিয়ে অন্য সোফায় বসবে কিনা! কিন্তু আসন বদলাল না। তবে ঘরের একধারে দেয়াল ঘেঁষে একটা টেবল, সেখানে হাতলহীন একটা কাঠের চেয়ার আছে। ওটায় গিয়ে বসলে নিজেকে বোধ হয় লঘু করে ফেলা হবে। টেবলটায় রয়েছে টেলিফোন আর ডিরেক্টরি বইটা। প্যাড আর পেনসিল, টেবল ল্যাম্প, আর হাতির দাঁতের তৈরি বীণা কোলে নিয়ে ছোট্ট একটা সরস্বতী মূর্তি। দেয়ালে প্রায় দু-ফুট একটা সাদা-কালো ছবি, শীর্ণ মুখের এক বৃদ্ধ লাজুক হাসছেন। সহদেবের চেনা লাগল। কেয়া ক্ল্যাসিকাল শিখত এঁর কাছেই।
মসৃণ দেয়াল পাতি লেবু রঙের, ইলেকট্রিক তার দেখা যাচ্ছে না। ফ্লুরোসেন্ট টিউবও ঢাকা, চারদিকের দেয়ালেই ঝুলছে জাপানি ফানুসের আদলে চারটে ল্যাম্পশেড। সিলিংয়ে দুটো পাখা। এতবড়ো ঘরে দুটো ছাড়া চলে না। তার মাথায় উপরেরটা চালিয়ে দিয়ে মেয়েটি ভিতরে যাবার আগে প্রশ্ন করল, ‘আপনার নাম?’
‘সহদেব মিত্র।’
দেখার জন্য প্রথম চমকটা আর রইল না। বাথরুমের দরজার বাইরে থেকে মেয়েটি চেঁচিয়ে নামটা বলবে। শাওয়ারের দিকে মুখ তুলে জলের ধারার নীচে দাঁড়িয়ে, নিশ্চয় এখন শরীরে বসন নেই, কেয়ার কানে নামটা পৌঁছানো মাত্র বুকের মধ্যে একটা ধড়াস কি হবে না? চোখ বন্ধ করে নিশ্চল হয়ে থাকবে কিছুক্ষণ। ঝাঁ ঝাঁ করে রক্ত ছুটবে সারা শরীরে। এখন অনেক কথা ওর মনে পড়বে। ফিল্মের ফ্ল্যাশব্যাকের মতো মনের মধ্যে অনেক ছবি আসবে, অনেক কথা শুনতে পাবে, অনেক চিঠির লেখা…ওহহ ওর চিঠিগুলো যে একদিন ছিঁড়ে ফেলে দিয়েছি সেটা ও জানে না, কিন্তু আমার দেওয়াগুলো …এতদিনে নিশ্চয় ফেলে দিয়েছে। দিক, কিন্তু সশরীরে হাজির হওয়াটা, বলা কওয়া নেই…এর ধাক্কাটা মাথা ঠান্ডা রেখে নিতে পারবে তো!
সহদেবের ভাবনা চঞ্চল হয়ে পড়ল। এই কুঁজো হয়ে বসা তার উপর সামনের খোলা জানলা দিয়ে আকাশে এত রোদ যে চোখ তোলা যাচ্ছে না। পর্দাটা টেনে দেবার জন্য সে উঠল।
‘আপনি কি সিউড়ি থেকে আসছেন?’
সহদেব চমকে ঘুরে দাঁড়াল। ধুতিটা লুঙ্গির মতো করে পরা, সাদা পাঞ্জাবি গায়ে এক মাঝবয়সি লোক। একটু স্থূলকায়, মুখ গোলাকৃতি, উচ্চচতা যা তাতে বেঁটেই বলা যায়। মাথায় প্রচুর চুল, শ্যামবর্ণ, চোখে মোটা কালো ফ্রেমের চশমা।
‘না, আমি আসছি কালিমোহন বোস স্ট্রিট থেকে, কেয়াদের পাশের পাড়া।’
রাস্তার নামটা শুনেছে কিংবা হয়তো শোনেনি, সেটা লোকটির মুখভাব থেকে স্পষ্ট হল না। সহদেব সেটা স্পষ্ট করে তোলার জন্য বলল এবং সেটা এখানে আসার কৈফিয়তের মতোই তার নিজের কানে ঠেকল, ‘কেয়াকে আমি ছোটোবেলা থেকেই চিনি।’
‘আপনি বসুন। ওঁকে পাঠিয়ে দিচ্ছি।’ লোকটি ভিতরে চলে গেল। মুখে কোনো ভাবান্তর ঘটেনি।
কোমল, ধীর কণ্ঠস্বর। প্রেমিকের মতো গলা। ‘পাঠিয়ে দিচ্ছি’ বলল মানে কেয়াকে ইনি পাঠাতে পারেন কিংবা নাও পারেন। কেয়ার স্বামী!
‘পর্দাটা অর্ধেক টেনে দিয়ে এল সহদেব। আর তখনই কেয়া ঢুকল। ভিজে চুলের গোড়ায় তোয়ালে ঘষতে ঘষতে, মাথাটা একদিকে কাত করে।’
‘তাই বলি, সহদেব মিত্র আবার কে!… এতদিন পর যে, পথ ভুলে নাকি?’
সহদেব বুঝে উঠতে পারছে না, কেয়ার স্বরে ঘরোয়া স্বাগত না বিদ্রূপ? প্রাথমিক কাজটা সারতে সে অবশ্য সময় খরচ করল না। কেয়া যথেষ্ট চর্বি ঝরিয়েছে, গায়ের রং উজ্জ্বল কাঁসার মতো হয়েছে, চশমা মুখটাকে বদলে দিয়ে ব্যক্তিত্ব এনেছে, ঝরঝরে স্বরক্ষেপে সাবলীল জীবনের ঘোষণা।
‘পথ ভুলে আর যেখানেই যাই, এখানে এসে পৌঁছব না, একেবারে পথ চিনেই এসেছি। ঠিকানাটা রঞ্জনের দেওয়া।’
‘তাহলে দাঁড়িয়ে কেন, বোসো।’ কেয়া চুলের ডগা তোয়ালে চেপে রগড়াবার জন্য চুল আয়ত্তে আনার চেষ্টার মধ্যেই নির্দেশ দিল।
সহদেব প্রীত। কেয়া বদলে গেছে। বুদ্ধিমতী হয়েছে, না হলে এতক্ষণে প্রাক্তন প্রণয়ীকে দেখার প্রাথমিক প্রতিক্রিয়াটা জানিয়ে ফেলত। থতমত, জড়তা, দ্বিধা, কুপিত বা কোমল চাহনি, এর কিছু একটা অন্তত ফুটে উঠত। যেন কিছুই হয়নি, সিউড়ি কি খড়দা থেকে ফাংশানে গান গাইবার প্রস্তাব নিয়ে আসা একটা লোকের সঙ্গে কথা বলার মতো এই ভাবটা, না বদলালে দেখাতে পারত না।
