সারিটা এগোচ্ছে। সহদেব অনুরোধের সুরে বলল, ‘এক মিনিট, টিকিটটা নিয়ে নিই।’
পঙ্কজ মাথা হেলিয়ে বলল, ‘দাঁড়াচ্ছি।’
সন্ধ্যা ছটার শো-এর দুটো টিকিট হাতে নিয়ে সহদেব ভাবল, বাড়তিটা কী করব? অফিসের জয়দেবকেই সে বাড়তি টিকিটগুলো দেয়। মাস দু-ই আগে ও’ নিল-এর চারটে নাটকের ফিল্মের বাড়তি টিকিটগুলো জয়দেবই চেয়ে নিয়েছিল। কিন্তু শুধু একটা টিকিট দেবার জন্য ছুটির মধ্যে অফিসে যেতে তার আর ইচ্ছে করল না।
আমেরিকান সেন্টারের বিপরীতেই একটা খাবারের দোকান। সহদেব বলল, ‘চলো চা খাই।’
‘আমার এক জায়গায় দশটার মধ্যে পৌঁছবার কথা। আজ থাক।’ পঙ্কজের স্বরে দৃঢ় অথচ বিনীত প্রত্যাখ্যান। সহদেব চা-এর জন্য চাপাচাপি করল না।
‘কবে ফিরেছ? এখন করছ কী?’
‘বাইরে এক বছর ছিলাম। ফিরে চণ্ডীগড়ে তারপর বোম্বাই-এ চাকরি, ছ-মাস আগে ছেড়ে দিয়ে এখন বেলেঘাটার সেই বাড়িতে আঁকছি। একটা কাজ করছি পারাদ্বীপে, কাল ফিরেছি আবার চলে যাব।’
‘তুমি কটার শো-এর নিয়েছ?’
‘ছটার। ফিরতে সুবিধে হয়।’
‘আমারও ছটার। …একটা টিকিট বাড়তি হচ্ছে, তুমি নেবে?’
‘কী করব নিয়ে, দুটোর বেশি তো আমার দরকার নেই।’
দুটো দরকার! পঞ্চজ কি তাহলে বিয়ে করেছে? সাত বছর আগে সেই ঘরোয়া পার্টিতে ওর সঙ্গে একটি মেয়ে এসেছিল। মিষ্টি মুখশ্রী, শান্ত চাহনি, নম্র কণ্ঠস্বর। একধারে চুপ করে বসেছিল ঘরে আর যে দু-তিনজন মেয়ে ছিল তাদের সঙ্গে সামান্য কিছু কথা বলেই মেয়েটি একা হয়ে যায়। ওকে দেখে সহদেবের মনে হয়েছিল, পাঁচ-ছটি বাচ্চচার মা হওয়ার জন্য মেয়েটি যেন প্রস্তুত। পঞ্চজ কি তাকেই বিয়ে করেছে?
‘তুমি বিয়ে করেছ?’
‘হ্যাঁ এবং আপনি এখনও করেননি। ঠিক বলেছি?’
পঙ্কজের হাসি থেকে শব্দ ছিটকে সুরেন ব্যানার্জি রোডের পেভমেন্টের কয়েকজন ব্যস্ত পথচারীকে আঘাত করল। চলতে চলতে তারা ফিরে তাকাল। পঙ্কজের সামনের দাঁত দুটো একটু উঁচু তাই দুই ঠোঁটের মধ্য থেকে বেরিয়ে আসে। চৌকো কঠিন চোয়াল। গালে ব্রণর ক্ষতগুলো বেশ গভীর। উঁচু কপালে, চুলের তটরেখা অনেক পিছিয়ে রয়েছে। পঞ্চজ সুদর্শন নয়। উৎকট রকমের সবুজ ট্রাউজার্সের সঙ্গে হাঁটু পর্যন্ত নামা ঝামারঙের খদ্দরের পাঞ্জাবিতে ওকে হাস্যকর লাগছে।
‘কেন করেননি?’ পঙ্কজ কৈফিয়ত চাওয়ার ভঙ্গিতে বলল।
‘করার মতো কাউকে পাইনি বলে।’ এবার সহদেবও হাসির সঙ্গে শব্দ মেশাল। কিন্তু নিজের কানেই সেটা কৃত্রিম ঠেকল। তার মনে হল, এটা হাসির মতো কথা নয়, অক্ষমতার একটা আড়াল।
‘কাউকে পাননি! এটা কী একটা কথা হল? আসলে আপনি খুব কুঁড়ে, উদ্যোগী নন।’
‘এজন্য উদ্যোগ করতে হবে?’
‘নিশ্চয়। চমৎকার মহিলাদের তো আবিষ্কার করতে হয়, সেজন্য অবিরাম চেষ্টা আর প্রচুর ভাগ্যও থাকা চাই। আপনার এই যে কানের উপর অল্প পাকা চুল, এই যে স্বাস্থ্য, সৌম্যদর্শন চেহারা, পাণ্ডিত্য, উইজডম, কাগজে নাম, …এসবকে কাজে লাগাবার কোনো উদ্যোগই আপনি নিলেন না?’ পঙ্কজ দু-হাত ছড়িয়ে বিস্ফারিত চোখে মাথা নাড়তে লাগল।
‘তুমি তাহলে উদ্যোগী হয়ে আবিষ্কার করেছ?’ সহদেব মুচকি হাসিটা ঢাল-এর মতো এমনভাবে ধরে রাখল যেন পঙ্কজের কথাগুলো তাতে ধাক্কা খেয়ে ঠিকরে যায়। কিন্তু শুনতে তার ভালো লাগল। পঙ্কজের কোনো প্রয়োজন নেই স্তাবক হবার। সে ভালোই জানে সহদেব আর্ট ক্রিটিক নয় যে তাতে মাতিস বা দেগ্যাঁর সঙ্গে তুলনা করে প্রবন্ধ লিখবে। কিন্তু মনের গভীরে সহদেব চাঞ্চল্য বোধ করছে। কাবলির সঙ্গে কথা বলার সময় যে ধরনের বয়স কমে যাওয়ার টান লাগে এখন তা লাগছে। পঙ্কজ অনেকগুলো ভালো বিশেষণে তাকে আরাম দিয়েছে।
‘অবশ্যই।’ পঙ্কজ দুই ঠোঁট চেপে দাঁত দুটোকে ঢেকে পিটপিটিয়ে তাকাল। ‘অবশ্যই আবিষ্কার করেছি, …ওহহ, সহদেবদা আমার দেরি হয়ে গেছে, চলি, শুক্কুরবার দেখা হচ্ছে।’
পঙ্কজ প্রায় ছুটতে শুরু করল। দুটো লোককে ধাক্কা মেরে মেট্রোপলিটান বিল্ডিংটা ঘুরে ডানদিকে তার অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার ভঙ্গিটা সহদেব দেখল। ইউরোপ ঘুরে এসে প্রভূত বদলে গেছে। চটপটে হয়েছে, মুখচোরা ভাবটা ঘুচে গেছে। নিশ্চয় নিজের উপর আস্থা বেড়েছে, দাঁড়বার মতো জমি খুঁজে পেয়েছে।
সহদেব চৌরঙ্গির মোড়ে দাঁড়িয়ে ভাবল কী করা যায় এখন। লাইট হাউসের সামনে বইয়ের দোকানগুলোয় কি চোখ বোলাবে? স্কুলে পড়ার সময় অনেক সিনেমা হলে বারোটায় একটা শো হত। কিন্তু কখনও সে স্কুল পালিয়ে সিনেমা দেখেনি। এখন যদি কোথাও নুন-শো হয়, নিশ্চয়ই হয়, তাহলে টিকিট কেটে ঢুকে পড়া যায়। টাইগার, নিউ এম্পায়ার, লাইট হাউস বা …সহদেবের চোখ আটকে গেল কালো অক্ষরে মিনি বাসের গায়ে লেখা একটি শব্দে: পর্ণশ্রী।
ঝোলার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে কাগজটা স্পর্শ করেই সহদেব ছুটে গেল রানি রাসমণি রোড থেকে বেঁকে এসে দাঁড়ালো বাসটার দিকে। পর্ণশ্রী কলেজের কাছে একটা চারতলা বাড়ির তিনতলার ফ্ল্যাটে কী রকম চমক উঠবে সেটা অনুমান করার জন্য, বাসে উঠেই তার মাথাটা তোলপাড় শুরু করল।
আট
‘দিদি এখন চান কচ্ছেন, আপনার কি এখন আসার কথা ছিল?’ এক পাল্লার দরজাটা সামান্য খুলে কাজের মেয়েটি জানতে চাইল।
ইতস্তত না করে সহদেব বলল, ‘হ্যাঁ।’
