শমিতা জবাব না দিয়ে কী যেন ভাবতে লাগল। সহদেব কিছু বই স্তূপ করে দুহাতে তুলে একধারে সরিয়ে রাখল। উইয়ের বাসাটা এখনই ভেঙে দেবে কি না সেটা ঠিক করার জন্য সে দেয়ালের দিকে তাকিয়ে ভাবছে।
‘বাচ্চচা না হওয়ার জন্য কোনো মেয়ে ডিভোর্স করে না।’ আচমকা শমিতা বলল।
‘হঠাৎ একথা?’
‘তুমি বিয়ে করবে বললে না?’
‘কাকে করব!’
‘কেয়াকেই তো। নয়তো স্বামীর সঙ্গে বনিবনা হচ্ছে না বললে কেন? ও ডিভোর্স করলে তুমি ওকে বিয়ে করবে, তাই তো?’
সহদেবের মনে হল তার উচিত এখন একটা অট্টহাস্য করে শমিকে চুরমার করে দেওয়া। তার বদলে সে গলার স্বর ঘন করে বলল, ‘আমার মনে হচ্ছে এবার বিয়ে করা দরকার। কত রকমের আপদ বিপদ মানুষের জীবনে আসতে পারে। সাহায্যের জন্য তখন খুব কাছের মানুষ দরকার হয়।’
‘কেন আমি কি কাছের মানুষ নই?’ শমিতা অভিমানীর মতো ঠোঁট ফোলাবার চেষ্টা করল।
‘একটা বউ যতটা কাছের হবে, বোন কি তা হতে পারবে? … কেয়ার মতো মেয়েই এখন আমার দরকার। ধর একটা কিডনি নষ্ট হয়ে গেল, না বদলালে তো মৃত্যু অবধারিত! কিডনি বদলাতে গেলে লাখখানেক টাকার ধাক্কা। তুই কি দিতে পারবি?’
শমিতা ফ্যালফ্যাল চোখে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে মাথা নাড়ল। ‘আমার সে সামর্থ্য কোথায়?’
‘যদি ক্যানসার হয়, বহু তাগড়াই লোকেরই হচ্ছে, তাহলে কত খরচ হবে বল তো? শুনেছি কেমোথেরাপির জন্য যে ইঞ্জেকশন, স্যালাইনের সঙ্গে নাকি হয়, তার একটার দামই নাকি আড়াই হাজার টাকা! দু-তিনটে নাকি দরকার হয়। এত টাকা আমার তো নেই।’
‘এসব অলুক্ষণে কথা বলছ কেন মেজদা?’
‘যদি একটা চাকুরে বউ থাকে, যদি শ্বশুরবাড়ির অবস্থা ভালো হয় তাহলে বাঁচার একটা চান্স তো নিতে পারব!’
‘কেয়ার এখন অনেক টাকা।’
‘আহা কেয়ার কথা আসছে কেন, কেয়া কি আমার বউ? এখন যদি ওর কাছে গিয়ে বলি পঞ্চাশ হাজার টাকা দাও প্রাণ বাঁচাবার জন্য চিকিৎসা করব, কেয়া কি আমায় দেবে? স্বামী হলে দিত।’
সহদেব বইগুলো দু-হাতে তুলে বুকের সঙ্গে চেপে ধরে শমিতার পাশ দিয়ে ঘর থেকে বেরোল। সে ছাদে যাবে।
‘একবার চেয়েই দ্যাখো না, বোধহয় দেবে।’
থমকে দাঁড়াল সহদেব। তীক্ষ্ন স্বরে বলল, ‘কেন দেবে।’
অগোছালভাবে হেসে শমিতা বলল, ‘মেয়েরা অনেক জিনিস ভোলে না, চিরকাল মনে রাখে।’
কথাটা সহদেবের মাথায় গেঁথে গেল। তার মনে হল, ভোলে কি ভোলে না সেটা একবার যাচাই করলে কেমন হয়!
সকালে আমেরিকান সেন্টার থেকে সিনেমার টিকিট আনতে যাবার আগে সে কেয়ার দাদা, তার স্কুলের সহপাঠী রঞ্জনের সঙ্গে দেখা করল।
তাকে দেখে রঞ্জন সংগত কারণেই অবাক হল। পাশের পাড়া হলেও দুজনের মধ্যে বহু বছর সাক্ষাৎ ঘটেনি। কেয়ার সঙ্গে সহদেবের যে একটা সম্পর্ক ছিল এটা রঞ্জন জানে। বাড়ির সদরে দাঁড়িয়ে যখন সে আন্তরিকভাবে ‘আরে কী মব্যাপার, এসো এসো ভেতরে এসে বসো’ বলল, সহদেব তখন অযথাই স্বস্তি বোধ করল। সে ধরে রেখেছিল নৈর্ব্যক্তিক ধরনের ব্যবহার পাবে।
‘না ভাই বসার একটুও সময় নেই। এসেছি একটা দরকারে, ঠিক বললে আমাদের অফিসের একটি ছেলের দরকারে। ওদের ক্লাবের ফাংশান,ওরা কেয়াকে নিয়ে যেতে চায় কিন্তু ঠিকানাটা জানে না।’
‘ও তো এই সবে বাড়ি বদলেছে। নতুন ফ্ল্যাটের ঠিকানাটা তো,… দাঁড়াও আমার বউয়ের কাছে লেখা আছে, এনে দিচ্ছি।’
রঞ্জন মিনিট তিনেক পর ফিরে এল একটুকরো কাগজ হাতে। ‘ওর ফ্ল্যাটের ঠিকানা আর স্কুলের ঠিকানাটাও এতে আছে। নিউ আলিপুরে শনি-রবি, বিকেল চারটেয় গেলেই ওকে স্কুলে পাবে।’
‘কেয়া এখন তো খুবই ব্যস্ত আর্টিস্ট।’
‘হ্যাঁ, খুবই বিজি। একবার নাম হয়ে গেলে… ‘ রঞ্জনের মুখ তৃপ্ত হাসিতে ভরে গেল।
নাম হওয়ার এই এক জ্বালা, অবিরত কল আসবে, কোথায় কোথায় না যেতে হয়!’
‘হ্যাঁ নানান জায়গায়। তার ওপর আবার ওকে শুরুতেই তো বসায় না, মাঝরাত পার করে স্টেজে আনে। বাড়ি ফিরতে ফিরতে শেষ রাত হয়ে যায়। সঙ্গে অবশ্য ওর হাজব্যান্ড থাকে। তাহলেও খুব রিসকি জব। রাস্তায় গুন্ডা-বদমায়েশদের কীর্তিকলাপের খবর রোজই তো কাগজে পড়ছি। আমি তো ওকে বলি, রাতের এই সব ফাংশানে প্রোগ্রাম করার কী দরকার? টাকাটা বেশি পাওয়া যায়, এই তো? না হয় কয়েক হাজার কমই রোজগার হল, প্রাণটা আগে না টাকাটা আগে?’
‘নিশ্চয়, প্রাণটাই তো আগে। আচ্ছা রঞ্জন, আমার ভাই খুব তাড়া আছে, দেখা হয়ে বেশ ভালো লাগল।’
এরপর সহদেব বাসে এসপ্ল্যানেডে এল। এক মিনিট হেঁটেই আমেরিকান সেন্টারের ফটক। ভিতরে পা দিয়েই সে বারো-চোদ্দো জনের একটা সারি দেখে শেষ লোকটির পিছনে দাঁড়াল।
ঘণ্টাখানেক আগে যে ভাবে সে রঞ্জনকে অবাক করে দিয়েছিল সেইভাবেই সহদেব অবাক হল পঙ্কজকে দেখে। টিকিট দুটো নিয়ে পাঞ্জাবির বুক পকেটে রাখতে রাখতে ফটকের দিকে যাচ্ছিল তখনই সারিতে দাঁড়ানো সহদেবকে দেখে সে থমকে দাঁড়ায়।
‘সহদেবদা না!’
‘পঙ্কজ, তুমি! কতদিন পর!’
‘কত দিন কী, কত বছর বলুন। পাঁচ, ছয়, সাত…’
‘সাত বছরই হবে। লাস্ট দেখা কেশবের বাড়িতে। প্যারিস যাওয়ার চার দিন আগে। তোমাকে হুইস্কি দেওয়া হয়েছিল, তুমি ‘খাই না’ বলেছিলে…এখন খাও?’
পঙ্কজ জবাব না দিয়ে যেভাবে হাসল তাতেই সে বুঝে নিল, খায়। তার খুবই ভালো লাগছে, এতদিন পর একজন চেনা লোকের সঙ্গে হঠাৎ দেখা হয়ে সে উত্তেজনা অনুভব করল। পঙ্কজ মাইতিকে এক সময় ভারতের তরুণ উদীয়মান চিত্রশিল্পী হিসাবে গণ্য করা হত। সহদেবের সঙ্গে কে যেন আলাপ করিয়ে দিয়েছিল অ্যাকাডেমিতে একটা প্রদর্শনীতে। প্রদর্শনীটা ছিল অন্য আর এক শিল্পীর। কথায় কথায় পঙ্কজকে সে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘কেমন লাগছে ছবিগুলো’, সেদিনও পঙ্কজ এই রকম ভাবে হেসেছিল। শুধু মন্তব্য করেছিল, ‘ভালো নকল।’
