‘মা খুব ভালো।’
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে সহদেবের কানে কথাটা পৌঁছল। টাবলির গলা।
রাস্তায় বেরিয়ে অভ্যাসমতো ঝুলিতে একবার হাত ঢোকাতেই একটা কাগজ হাতে ঠেকল। বার করে দেখল আমেরিকান সেন্টারের সেই খামটা। এটা দিলে সিনেমার দুটো টিকিট পাওয়া যাবে। অফিস থেকে তিন সপ্তাহের ছুটি নিয়েছে। ফুরোতে এখনও দু-সপ্তাহ বাকি। সহদেব ভাবল, কাকে দিয়ে টিকিট আনাই! প্রতিবার অফিসের বেয়ারা পরেশ এনে দিয়েছে। এবার নিজেই যেতে হবে।
বাসে ফেরার সময় বার বার তার মাথায় পাক দিল ‘বিশ্বাসঘাতক’ শব্দটি। ‘আমরা দুজনেই বেঁচে গেছি’ এই কথাটা কি সে যথার্থ বলেছে? কেয়া কি ভেবে নিয়েছিল, সে চিটেড হয়েছে? ‘চিট’ কথাটাই কি বিশ্রী। বিদ্যুৎ বলেছিল ‘করাপ্ট’। আরও খারাপ কথাটা, শুনলেই নিজের উপর ভরসা কমে যায়, দুর্বল লাগে। কিন্তু বিশ্বাসভঙ্গের মতো কোনো অভিযোগ কেয়া তার কাছে বা অন্য কারুর কাছে তো তোলেনি! তাহলে কাবলি কেন এটা বলল? সে তার ঠাকুরদাকে তারিফ করে মামাকে নিন্দে করছে!
এটাও সেই কাচের দরজার এধার থেকে বাইরের বাগানের দিকে তাকিয়ে থাকা। কাবলিও ঠেলাঠেলি করল দরজাটা খুলে বারান্দায় বেরিয়ে আসার জন্য। কোথায় যেন দরজাটা আটকে গিয়ে আর খুলছে না। ঠেলাঠেলিতে কাচ ভেঙে যাওয়ার ভয়। এধার থেকেই বরং বাগানটাকে দেখার জন্য কাচটাকে পরিষ্কার রাখতে মাঝে মাঝে ঝাড়পোছ আর কি!
কেয়া কি বেঁচে গেছে? এটা তাহলে জানা দরকার। ওর সঙ্গে একবার দেখা করতে হবে।
সাত
যা অনুমান করেছিল সেটাই শমি করেছে। দু-দিনের মধ্যেই সে খবর জোগাড় করে আনল কেয়ার সাংসারিক অবস্থা আর দাম্পত্য জীবন সম্পর্কে।
বহু বই, খাতা, ফাইল ইত্যাদিতে ড্যাম্প লেগে ছাতা পড়েছে। র্যাক থেকে সেগুলো নামাতেই পিছনের দেয়ালে বিঘতখানেক লম্বা উইয়ের উপনিবেশ দেখতে পেয়ে সহদেব সন্ত্রস্ত হয়ে পড়ল। একটা উইও যদি বইয়ের মধ্যে ঢোকে তাহলে সর্বনাশ করে ছাড়বে। সারা ঘরে ছড়ানো বইয়ের মধ্যে বসে সে এক একটি করে খুলে ছেঁড়া গেঞ্জি দিয়ে মুছে রাখছে। এর পর ছাদে নিয়ে গিয়ে রোদে বিছিয়ে দেবে।
শমিতা ঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল এক কাপ চা নিয়ে।
‘খাব বলে করে, ভাবলুম তোমাকেও এক কাপ দিয়ে আসি।’
‘ভালো।’
‘ইসস, কী হয়েছে বই খাতার অবস্থা! দাও দাও আমায় দাও মুছে দিচ্ছি।’
‘হাত দিসনি, সাজিয়ে রাখা আছে, ওলটপালট হয়ে যাবে।’ সহদেব বইয়ের ব্যাপারে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। কেউ হাত দিলে, বা নাড়াচাড়া করলে তার অস্বস্তি হয়। ফাইলের মধ্যে রাখা ‘তাজমহল’ গল্পটা একসময় তার অজান্তে কেয়া বার করে নিয়ে পড়েছিল। সে প্রচণ্ড চেষ্টায় রাগ চেপে বরং বলেছিল কেয়া অন্যায় করেনি। তখন এত দামি বইগুলোও ছিল না আর প্রথম প্রেমের আবেগটাও ছিল উথলে ওঠার পর্যায়ে।
‘কাল কেয়াদের বাড়িতে গেছলুম।’
মুখ তুলে সহদেব তাকাল। শমিতা চৌকাঠে উবু হয়ে বসল।
‘ওদের তিন ভাইয়ের হাঁড়ি আলাদা হয়েছে তবে ঝগড়াঝাঁটি নেই। ঠাকুরের নিত্য সেবা, ভোগ, বামুনের দক্ষিণার টাকা তিন ভাই-ই পিসিমার হাতে মাসে মাসে সমান ভাগে জমা দেয়। তিন ঘরে তিনটে সাদা-কালো টিভি। রঞ্জনদার ঘরে ফোন আছে, অন্যদের কল এলে ডেকে দেয়। ওদের ভাইয়ে-ভাইয়ে খুব মিলমিশ আছে।’
‘আমাদেরই শুধু নেই।’ সহদেব মুচকি হাসল।
‘তা সত্যি, আমাদের মধ্যে ওটা নেই। থাকলে কি আর বাড়িটার এই দশা হয়। যাক গে যা হবার তা হবে।’
‘তুই শুধু এইটুকুই দেখে এলি? আর কী দেখলি শুনলি?’
‘আর দেখাশোনার কী আছে! সব ভাইয়েরাই ভালো রোজগার করছে, ছেলেমেয়েরা পড়াশুনো করছে। আত্মীয়স্বজনরা আসে ওরাও যায়। কেয়া তো কদিন আগে এসেছিল, ঘণ্টাখানেক ছিল।’
‘মাত্র একঘণ্টা! বাপের বাড়ি এলে তো মেয়েরা কয়েকটা দিন থাকে।’
‘যা ব্যস্ত, থাকবে কী! ছোটো ভাইয়ের মেয়ের অন্নপ্রাশন ছিল বলেই এসেছিল, চার আনা সোনার বালা দিয়েছে।’
‘সে তো অনেক টাকা, এখন ভরি কত?’ সহদেব অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল শমিতার মুখের দিকে। প্রশ্নটা এড়িয়ে গেল শমিতা।
‘কেয়া এখন অনেক টাকা রোজগার করছে। ফাংশানের কল তো লেগেই আছে। শিলিগুড়ি, আসানসোল, বহরমপুর কত জায়গায় ওকে যেতে হয়। দিল্লি, বোম্বাইও গেছে। দু-হাতে রোজগার করছে। বেহালায় পর্ণশ্রীর কাছে ফ্ল্যাট কিনেছে, চোদ্দোশো স্কোয়্যার ফুট। বিয়ে না করে তুমি কিন্তু ঠকেছই।’
সহদেবের কানদুটো গরম হয়ে উঠল। একটা বই খুলে সে তন্ময় হয়ে যাওয়ার ভান করল।
‘ওর বর তো গান লেখে, সুরও দেয়। মোটামুটি নাম আছে। দেখতেও নাকি খারাপ নয়। মেজোবউদি বলল, এখনও যখন ছেলেপুলে হয়নি তখন আর বোধহয় হবে না।’ শমিতার এবার খেয়াল হল সহদেব তার কথা না শুনে বইয়ের মধ্যে ডুবে রয়েছে।
সহদেব আড়চোখে বোনের দিকে তাকাল। সে বুঝতে পেরেছে শমি আসলে কী বলার জন্য চা হাতে নিয়ে উপরে উঠে এসেছে। এতক্ষণ যা বলল সেটা ভূমিকা মাত্র।
‘তুমি যে বললে স্বামীর সঙ্গে ওর বনিবনা হচ্ছে না, কই সে রকম কিছু আভাস তো মেজোবৌদির কথায় পেলুম না?
শমিতা প্রতিক্রিয়া দেখার জন্য খুঁটিয়ে লক্ষ করবে, সহদেব তা অনুমান করেই একগাল হেসে বলল, ‘আমাকে বলেছিল অফিসের একটা ছেলে। ও কেচ্ছা কেলেঙ্কারির খবর খুব রাখে। আমি অবশ্য এই ধরনের গুজবে কান দিই না। শুনেছিলুম বলেই তোকে বলেছি। তবে বাচ্চচাটাচ্চচা না হলে কি মেয়েরা সুখী হয়?’
