কাবলি সন্দেশের প্লেট হাতে ঢুকল।
‘চা আসছে ততক্ষণ এই কটা ধ্বংস করা। ছ-টা রয়েছে। দরকার হলে পিসি আরও আনাবে। টাবু শেষ পর্যন্ত কী হল রে?’
‘হবে আবার কী, উত্তম গাড়ি চালিয়ে কলকাতায় চলে গেল, সুমিত্রাও ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করে কেঁদে, বাংলা বইয়ে যা আর কি হয়ে থাকে … চুল পাকলেই প্রেম করা, বিয়ে করা এদেশে অচল, মানে ফিল্ম ফ্লপ করবে, উত্তম থাকলেও!’
‘সেই জন্যই বলেছি এম এম এম তোমার চুল এখনও থ্রি-ফোর্থ কালো রয়েছে, দেরি না করে বিয়েটা করে ফেল, আমি কি পাত্রী দেখে দেব?’
‘আমি তো তখনই তোকে বললুম, তাড়াতাড়ি দ্যাখ।’ সহদেব ভীষণ উপভোগ করছে এই দুটি মেয়ের সঙ্গে মজা করে কথা বলার সুযোগ পেয়ে। ‘আমি একটা ইউ ডি ক্লার্ক এটা মনে রেখে কিন্তু পাত্রী খুঁজিস। ঝরঝরে বাড়ি, ছাদ থেকে ঘরে জল পড়ে, একখানাই ঘর, নীচে মারাত্মক এক বোন আর তার পতি বাস করে। খবর প্রথমেই কিন্তু জানিয়ে দিবি।’
‘দোব।’ কাবলি এই বলেই মাথাটা সহদেবের মুখের কাছে এনে চাপা গলায় বলল, ‘তুমি একজনের সঙ্গে সিরিয়াস ধরনের প্রেম নাকি করেছিলে, সেটা কি সত্যি?’
‘সত্যি মানে! তোর ধারণা আমি কি পারি না? আমাকে এতই অপদার্থ ভাবিস? কিন্তু খবরটা তোকে দিল কে?’
‘বাবা আর মায়ের একটা ছোট্ট ঝগড়ার মধ্যে দিয়ে এটা যখন বেরিয়ে এল তখন হঠাৎ হাজির ছিলাম। সেই মহিলা এখন নাকি একজন বিখ্যাত গায়িকা, তোমার সঙ্গে খুব ঘনিষ্ঠতা ছিল, সত্যি?’ কাবলি সরল অল্পবয়সি কৌতূহল নিয়ে তাকিয়ে রইল।
সহদেব যে ধরনের কথা প্রকাশ্যে বলার চিন্তা কখনো করতে পারে না, অন্তত কিশোরী ভাগনিদের কাছে তো নয়ই, সেই রকম কথাই বলে ফেলল, ঈষৎ তাচ্ছিল্যভরে। এজন্য সে পরে আপশোস করে ভেবেছে, অল্পবয়সি দুটো মেয়ের কাছে বেপরোয়া আধুনিক ছোকরা সাজার ইচ্ছেটা হল কেন?
‘খুবই ঘনিষ্ঠতা! মানে সেকসুয়াল সম্পর্ক?’ সহদেব নিরাসক্ত স্বরে বলেই আড়চোখে দুজনের মুখের ভাব লক্ষ করে বলল, ‘হ্যাঁ তাও ছিল … তাতে হয়েছেটা কী?’
মেয়ে দুটির মুখে থতমত অপ্রতিভতা দেখে তার হুঁশ হল, এতটা না বললেও তো চলত।
‘না, হবে আবার কী।’ কাবলি গম্ভীর মুখে ছোটো বোনের দিকে এক পলক তাকিয়ে নিয়ে বলল, ‘বিয়ে না করার নিশ্চয় কোনো কারণ ছিল। কিন্তু তোমাকে রিফিউজ করল কেন?’
সহদেব প্রায় চমকে উঠে উত্তেজিত স্বরে বলল, ‘আমাকে রিফিউজ! কে বলল? আমিই তো ওকে বলেছি বিয়ে করা সম্ভব নয়, তোমাকে টানা তিনমাসের বেশি সহ্য করতে পারব না, মানে একসঙ্গে বসবাস করতে পারব না। ওর সঙ্গে তোর মা-র নানান দিক থেকে খুব মিল আছে।’
সহদেবের মনে হল, সে আবার ভুল করল এই শেষ বাক্যটিতে। অনিতাকে নিয়ে মেয়েরা যতই হাসুক না কেন, তাদের মা সম্পর্কে কেউ নীচু ধারণা প্রকাশ করলে তাকে ওরা সুনজরে দেখবে না।
‘সে তোমাকে এনজয় করতে দিয়েছিল নিশ্চয় এই ভেবে যে তাকে তুমি ভালোবাসো … তাকে চিট করবে না।’ কাবলির স্থির চোখে সহদেব সুনজর দেখতে পেল না। মা-কে তাচ্ছিল্য হেয়জ্ঞান করাটায় মেয়ে রেগে গেছে। পালটা ঝাপটা দিল ‘চিট’ শব্দটা জুড়ে দিয়ে।
‘এই যে একটু আগেই তুই কোন সব দেশের কথা বললি, যারা নাকি জীবনকে মুক্তি দিয়েছে। পুরোনো সংস্কার, সামাজিক প্রথা রীতি ভেঙে অবাধ, স্বাধীন, স্বচ্ছ মনের মালিক হয়েছে, ওগুলো কি তাহলে বাজে কথা?’ সহদেব ব্যঙ্গের মোচড় দিয়ে তার কথা শেষ করল।
‘না, বাজে কথা নয়।’ কাবলি একগুঁয়ের মতো মাথাটা কাত করে চোখ ছোটো করল। ‘আলাদা দেশ, আলাদা সোশিও-ইকনমিক সিস্টেম থেকে ভ্যালুজ তৈরি হয়েছে। আমাদের পুরোনো গরিব দেশে এখনও ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট ঘটেনি, এখানে সাবেকি ভ্যালুজ নিয়েই আমরা চলি, আরও বহুকাল চলতে হবে। তোমার কাজটা … কি বলব, বিশ্বাসঘাতকতারই সামিল।’
দপ করে আগুন জ্বলে উঠল সহদেবের মাথার মধ্যে। এইটুকু পুঁচকে মেয়ে হায়ার সেকেন্ডারি পরীক্ষায় বসতে যাচ্ছে, কোথা থেকে শোনা চটকদার বুলি তোতাপাখির মতো আউড়ে তার চরিত্রকে চ্যালেঞ্জ জানাবার স্পর্ধা দেখাল! চোখ বন্ধ করে রাগটা নিবিয়ে আনার জন্য সময় নিল।
‘জীবনটা আমার আর সেই মেয়েটির, সমাজের নয়। সমাজের নিয়মনীতি সেখানে খাটে না। তোর ঠাকুরদার ক্ষেত্রে কি কেউ খাটাতে পেরেছে? বিয়ে না করে আমরা দুজনেই বেঁচে গেছি। নইলে-।’ সহদেব এবার যথাসময়ে নিজেকে থামিয়ে দিল। সে বলতে যাচ্ছিল, ‘নইলে তোর বাবা-মায়ের মতো দুঃখজনক সম্পর্ক নিয়ে জীবন টানতে হত।’
দুই বোন অসমাপ্ত কথাটা শোনার জন্য তার মুখের দিকে তাকিয়ে। সহদেব ঝুলিটা কাঁধে তুলে ওঠার উদ্যোগ করল। এরা চমৎকার মেয়ে, তার স্নেহের পাত্রী, আবেগপ্রবণ, ছেলেমানুষ। তার খুব ভালো লাগে এদের সঙ্গে কথা বলতে। মিষ্টি সম্পর্কটাকে তেতো করতে সে চায় না। বয়সের গণ্ডি ভেঙে কিছু কথা সে বলে ফেলেছে, আর এই ভুলটা সে করবে না।
‘অনি তো এখনও এল না। চলি এখন, গিয়ে ঘুমোতে হবে। ট্রেনে চেয়ারে বসে আসার যা ধকল! … শাড়িটা মাকে দিয়ে বলিস বড়োমামা কলকাতায় এসেছে। আমাদের বাড়িতে এসে বোনের জন্য শাড়িটা রেখে গেছে। বন্ধুর বাড়িতে উঠেছে, কদিন থাকবে তা জানি না। চলি।’ বন্ধুর বাড়িতে উঠেছে, কদিন থাকবে তা জানি না। চলি।’ সহদেব টাবলির চুল নেড়ে দিয়ে, কাবলির গালে আলতো করে চড় মেরে সিঁড়ির দিকে এগোল।
