‘শিঙাড়া ঠান্ডা করবেন না মেজদা, আগে খেয়ে নিন।’
‘তোমাদের ব্রহ্মময়ীর শিঙাড়া? দারুণ করে।’
সহদেব একটা তুলে নিয়ে কাবলির দিকে তাকিয়ে বলল, ‘খাবি তো তুলে নে, চারটে খেতে পারব না।’
কাবলি হাত বাড়াতেই প্রতিভা ধমকে উঠল, ‘এ কী হচ্ছে? মাত্র চারটে তাই থেকে তুই ভাগ বসাচ্ছিস। খাস তো ভেতরে আরও আছে, গিয়ে নিয়ায়।’
‘চারটে খাবে কি, দুটোই যথেষ্ট, তাই না?’ কাবলি অনুমোদনের জন্য সহদেবের দিকে তাকাল।
‘প্রতিভাদি, এই সাইজের চারটে সত্যিই খাওয়া যায় না। টাবলি কোথায়, টিভি দেখছে নাকি?’
‘উত্তমকুমারের ফিল্ম হচ্ছে, শেষ না হলে ও টিভি-র সামনে থেকে নড়বে না।’
‘এখনকার মেয়েরাও উত্তম পাগল! তোর মা-ও উত্তম ফ্যান ছিল।’
‘এখনও রয়েছে। জন্মে থেকে যেমনটি দেখেছি মা এখনও তাইই রয়েছে। … এক ধরনের মানুষ আছে যারা কিছুতেই বদলায় না।’
‘ঠিক।’ সহদেব আধখানা শিঙাড়া মুখে ঢুকিয়ে মাথা হেলিয়ে ভাগনিকে সমর্থন জানাল। ‘বদলায় না। বদলাবার জন্য সাহায্যগুলো জীবন থেকে তারা পায় না। বাড়ির বাইরে যাওয়া, বইপত্তর খবরের কাগজ পড়া, বুদ্ধিমান লোকেদের সঙ্গে মেলামেশা, কথা-বার্তা বলা। সেসব ব্যাপারে মন কৌতূহলী হয়ে ওঠে সেই সব ব্যাপার যদি না পায়, পৃথিবীটা বদলাচ্ছে সেই খবর যদি না পায় তাহলে সে নিজের ধ্যানধারণা বদলাবে কী করে?’
‘মা খবরের কাগজ পড়লে বাবা বিরক্ত হয়, তাই পড়ে না, আড়ালেও পড়ে না। এর কী ব্যাখ্যা দেবে?’
ভিতর থেকে একজন ঝি এসে প্রতিভাকে নীচু স্বরে কী বলল। ‘যাচ্ছি, চল।’ প্রতিভা যাবার আগে সহদেবকে বলল, ‘মেজদা সব কিন্তু খাবেন, ওই হ্যাংলাটাকে একটা সন্দেশও দেবেন না।’
‘পিসি জানোই তো মিষ্টি আমি খাই না।’ কাবলি দ্বিতীয় শিঙাড়া তুলে নিল।
‘মিষ্টি খাস না কেন, মোটা হয়ে যাবি বলে?’ সহদেব হালকা স্বরে, হালকা নজরে ভাগনিকে মৃদু চিমটি কাটল।
‘চিনি শরীরের পক্ষে ক্ষতিকর।’ কাবলি একটি বাক্যে উত্তর দিয়েই প্রশ্ন করল, ‘ফিগার কনসাস হওয়াটা কি অপরাধের?’
‘এই দ্যাখো, অপরাধ-টপরাধ আবার এল কোত্থেকে? ভালো ফিগার, ছেলেই হোক আর মেয়েই হোক, দেখতে কত ভালো লাগে। … তোর কীরকম একটা অ্যাগ্রেসিভ স্বভাব তৈরি হয়েছে দেখছি। আগে তো এরকম ছিলিস না। নিশ্চয় ছেলেদের সঙ্গে মেলামেশা করছিস।’ সহদেব শেষের বাক্যটি বলে হাঁফ ছাড়ল। এতক্ষণে আসল প্রসঙ্গটার খুব কাছাকাছি এবার সে আসতে পেরেছে। অনিতা বলেছিল কাবলি আজেবাজে ছেলের সঙ্গে মিশছে। যদি ড্রাগট্রাগ ধরে। ‘দাদা ওকে একটু বুঝিয়ে বল।’
কাবলি চোখ বড়ো করে সহদেবের দিকে তাকিয়ে বোঝার চেষ্টা করছে, হঠাৎ এমন একটা কথা মামা বলল কেন? চোখটা ধীরে ধীরে ছোটো স্বাভাবিক হয়ে এল। কৌতুক ঝিলিক দিয়ে উঠল।
‘মার সঙ্গে বোধহয় রিসেন্টলি তোমার দেখা হয়েছে?’
‘হয়েছিল, দিল্লি যাবার আগে।’
‘নিশ্চয় বলেছে একটা ছেলে আমার কাছে আসে।’
‘না, অত কিছু বলেনি। শুধু বলেছে তুই ড্রাগ ধরতে পারিস এই ভয় করছে।’
‘কী বলেছে? … ড্রাগ?’
তারপরই হো হো হেসে উঠল কাবলি। ‘আমি … আমি … ড্রাগ … ওরে বাবা।’ পেট চেপে ধরে হাঁফাতে লাগল। চোখ দিয়ে জল বেরিয়ে এসেছে।
‘বিশ্বাস করে বসলে? এম এম এম তুমিও দেখছি মায়ের যথার্থ একটি দাদাই। ড্রাগ খেতে যাব কী দুখ্যে! য়্যাঁ, আমি কি বেকার না ফ্রাস্ট্রেটেড, অশিক্ষিত না হাঘরে?’
কাবলির দমফাটা হাসি দেখে সহদেবও হাসছিল তবে একটু অপ্রতিভ হয়ে। সে বলল, ‘বিশ্বাস করেছি, এমন ধারণা করলি কী করে? হেরোইন টেরোইন এখন তো স্কুলের ছেলেমেয়েরাও খাচ্ছে। তোর কাছে কে আসে?’
‘তরুণ। লেক টাউনে থাকে, সেন্ট জেভিয়ার্সে ইকনমিকস নিয়ে পড়ছে। খুব রোগা, কালো, চটি ট্যাঙস ট্যাঙস করে আসে, চুল আলুথালু। মা বোধহয় চেহারা দেখে ওকে ড্রাগ অ্যাডিক্ট…’
কাবলি আবার হেসে উঠে সোফা থেকে প্রায় গড়িয়ে পড়ার উপক্রম হল। ‘ও হো হো … বাবারে … আমি যে কী করব … ।’ বুকে হাত রেখে হাঁফাতে থাকল।
‘আস্তে হাস।’
‘আস্তে হাসব কি গো! এই জন্যই বোধহয় মা আমার বর খুঁজতে বেরিয়েছে। ভুনু পিসির সঙ্গে আজই সকালে ফোনে ফিসফিস হচ্ছিল। টাবু আমাকে বলেছে এই লাইনেই নাকি কথাবার্তা চলছিল। তুমি মাকে বলে দিও, কাবলি বলেছে বিয়ের নামগন্ধ একবার যদি পায় তাহলেই হেরোইন খেতে শুরু করবে। … বলবে তো?’
‘বলব।’
সহদেব এতক্ষণে টের পেল কথার মধ্যেই সে চারটে বৃহদাকার কড়াপাক সন্দেশ শেষ করে ফেলেছে এবং চা-ও। আর এক কাপ চা পানের ইচ্ছাও ইতিমধ্যে জন্ম নিয়েছে।
‘এক কাপ চা বল তো। আর যদি একস্ট্রা কড়াপাক থাকে তো দিতে বলিস।’
‘তুমি একটা টিপিক্যাল নর্থ ক্যালকাটান … স্যামবাজারের সসি বাবু।’
কাবলি উঠে যাবার আধ মিনিটের মধ্যে এসে পড়ল টাবলি। বাবার মতো চৌকো মুখ আর মাজা গায়ের রং। দিদির মতো লম্বা দেহ ও ছোটো চুল। মাধ্যমিক পরীক্ষায় বসবে একমাস পর।
‘তুমি যে এসেছ যে খবর আমি পেয়েছি। কিন্তু এত ভালো দেখাচ্ছিল উত্তমকুমারকে যে-‘
‘তাই টিভি ছেড়ে আর ওঠা গেল না। কী বই হচ্ছিল?’
‘বিকেলে ভোরের ফুল।’
‘কথাটার কোনো মানে হয় না।’
‘কেন হয় না?’
‘গপ্পোটা কী?’
‘একজন অবিবাহিত মাঝবয়সি জনপ্রিয় লেখক, এই তোমার বয়সিই দিঘায় গেল। সেখানে অল্পবয়সি একটা মেয়ে যে তার মা, ভাই বোনের থেকে অন্য রকমের, সিরিয়াস ধরনের। তার ওই লেখককে ভালো লাগল আর সেই মাঝবয়সি লেখকেরও ওর সম্পর্কে, কী বলব, প্রেম, উঁহু বয়সের অনেক তফাত… দুর্বলতা জন্মাল।’
