‘খুব ভালো দেখাচ্ছে। এবার পাট করে রাখ, ওটা তোর মায়ের জন্য বড়োমামা দিয়েছে।’ প্রতিভা শাড়িটা কাবলির দেহ থেকে তুলে নিয়ে ভাঁজ করতে লাগল।
‘দ্যাট বিলিতি মামা! আমি কিন্তু একবারও ওকে দেখিনি।’
‘তিন বছর আমিও দেখিনি। এবারও দেখা হল না। আমি যখন দিল্লিতে তখন এসেছিল।’
‘তুমি দিল্লি থেকে কী আনলে?’
‘একটা ঘোড়ার ডিম।’
‘কিছু আননি? তা হলে তো তোমাকে পানিশমেন্ট পেতে হবে,… তোমাকে বিয়ে করতে হবে। এই রকম একটা হ্যান্ডসাম ইন্টেলেকচুয়াল, এলিজিবল ব্যাচিলার কিনা আজীবন আইবুড়ো থেকে যাবে, হয় কখনো? দেশে কি মেয়ে নেই?’
‘তাহলে মেয়ে দ্যাখ।’
‘ঠিক?’
‘হ্যাঁ, ঠিক। তবে খুব তাড়াতাড়ি, নয়তো আমার মত বদলে যেতে পারে।’
সঙ্গে সঙ্গে কাবলি গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। সহদেব এখন ফুরফুরে একটা মেজাজ পাচ্ছে যা বহুদিন সে পায়নি। ছেলেমানুষদের সঙ্গে ছেলেমানুষি, অর্থহীন কথাবার্তা, এরও যে দরকার আছে এটা সে জানত। একমাত্র উনিশ বছরের এই ভাগনিটি ছাড়া আর কেউ এই দরকারটা মেটাতে পারে না। ওর কথাবার্তায় পাগলামির লক্ষণ আছে, রসিকতা বোঝে ও করতে পারে, হাতের কাছে যা পায় গোগ্রাসে পড়ে, যা যা বললে বা করলে বয়স্কদের ভ্রূ কুঁচকে যায় স্বচ্ছন্দে তা বলে বা করে। সব থেকে বড়ো কথা, সহদেব ওকে হৃদয় আর বুদ্ধির মিশেলে গড়া চমৎকার একজন বন্ধু রূপে ভাবতে পারে।
‘মেজদা চা খাবেন তো?’
‘খাব।’
প্রতিভা চলে যাবার পর কাবলি বলল, ‘দাদুর পছন্দটা খারাপ ছিল না, কি বলো?’
‘নো কমেন্ট। … তোর ফাইনাল পরীক্ষা কবে?’
‘আর তিনমাস। … খবরদার এখন মায়ের রোল নিও না। দিনরাত বই মুখে দিয়ে বসে থাকলেই মা খুশি। তোমার বোন যে-।’ কাবলি দুহাত বাড়িয়ে শিউরে ওঠার ভান করল।
‘আমার বোন আবার কী দোষ করল!’ সহদেব আতঙ্কিত চোখে তাকাল। ‘গুরুজনদের সম্পর্কে তুই বড্ড আজেবাজে কথা বলিস।’
‘যেমন?’ কাবলি জিনসটা একটু টেনে তুলে সোফায় বাবু হয়ে বসে আবার বলল, ‘যেমন?’
‘যেমন, এই মাত্র নিজের দাদু সম্পর্কে যে ইঙ্গিতটা দিলি। ভদ্রলোকের চরিত্রদোষ ছিল কিন্তু-‘
‘ওয়েট, এম এম এম, ওয়েট। চরিত্রদোষ বললে না? আমি একে কোনো দোষ তো নয়ই বরং গুণ বলেই মনে করি। হোয়াট আ জেস্ট ফর লাইফ! কি কি ভিগারাসলি বেঁচে থাকার ইচ্ছে! নিংড়ে রস বার করে জীবনকে চুমুক দিয়ে দিয়ে খাওয়া, ঢাক ঢাক গুড়গুড় নেই, যেটা বজ্জাতদের থাকে… এই লোকটাকে অ্যাপ্রিশিয়েট না করে উপায় আছে!’ কাবলিকে রীতিমতো উত্তেজিত দেখাচ্ছে। আর মনে মনে অবাক হয়ে যাচ্ছে সহদেব। জীবনকে এই ভাবে দেখার দৃষ্টি এইটুকু মেয়ে পেল কোত্থেকে? এই রক্ষণশীল, আধুনিক চিন্তার ছোঁয়া থেকে সযত্নে দূরে থাকা পরিবারে তো মেয়েটা একটা প্রহ্লাদ!
‘যেসব দেশ শিক্ষা, রুচি, কালচার, সায়েন্স আর ইকনমিতে এগিয়ে, সেইসব দেশের মানুষদের মধ্যে একটা জিনিস কি লক্ষ করেছ?… জীবনকে তারা ভীষণ ভালোবাসে আর বাসে বলেই খুব যত্ন নেয়, তাকে কষ্ট দেয় না, তাকে অতৃপ্ত রাখে না। জীবনের চারদিকে ওরা কুশিক্ষা, কুসংস্কার, অচল ঐতিহ্য, লোকনিন্দা, অপবাদ, সামাজিক প্রথা, রীতি…এই যেসব বেড়া, এই যেসব আবর্জনা, জীবনকে যা কোণঠাসা করে রাখে, …আমাদের এদেশের জীবনকে তো রেখেছেই, সেগুলো কিন্তু ওরা সাফসোফ করে, পুড়িয়ে ছাই করে দিয়েছে তার ফলে। ওদের জীবন মুক্তি পেয়েছে, ওদের চিন্তা করার ক্ষমতা বেড়েছে, অবাধ, স্বাধীন স্বচ্ছ মনের মালিক হয়েছে। দ্যাখো এম এম এম, যা কিছু ক্রিয়েটিভ এক্সপেরিমেন্ট সব কিছু ওদের দ্বারাই হচেছ… আর্ট, মিউজিক, ডান্স, লিটারেচার, ফিল্ম, এমনকী মানুষমারার মিসাইল আবার মানুষ বাঁচাবার মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টস সব কিন্তু ওরাই করছে। আমরা স্রেফ চুরি নয়তো নকল করি আর তারপর ওদের ভোগবাদী, জড়বাদী বলে গালাগাল দিই।… কি শুনতে বিরক্ত লাগছে?’
‘লাগছে। বাচ্চচাদের মুখ থেকে বক্তৃতা আমার ভালো লাগে না, বিশেষ করে ধমকানিটা। মনে হচ্ছে তুই কারুর উপর রেগে তাকে হাতের কাছে না পেয়ে ঝালটা আমার ওপর ঝাড়ছিস।’
সহদেবের রীতিমতো ভালো লাগছে লাল হয়ে ওঠা কাবলির মুখটা দেখতে। আরও ভালো লাগছে চাঁচাছোলা কথাগুলো। এদের জেনারেশনে ন্যাকামি আর দুমুখো ব্যাপারটা অনেক কমে যাবে বলে তার মনে হচ্ছে।
‘আমি রেগেছি দাদুকে তুমি নোংরা চরিত্র বলতে চাওয়ায়। নো, সার্টেনলি হি ওয়াজ নট আ লউলি ক্যারেক্টার।’
‘নোংরা আবার কখন বললুম! শুধু বলেছি চরিত্রদোষ ছিল, তাতেই-‘
‘চরিত্র বলতে তুমি কী বোঝ?’ কাবলি চ্যালেঞ্জের মতো তালু ঠুকে ঊরুতে চড় মারল। ‘চারিদিকে যত লোক দেখছ সবাই বুঝি খুব চরিত্রবান? এই আমার বাবা, এই আমার মা, এই আমিই-‘
‘এর মধ্যে আবার বাবা-মাকে টানছিস কেন?’ সহদেব আপত্তি এবং বিরক্তি জানানোর সঙ্গে-সঙ্গেই দু-হাতে ট্রে ধরে চায়ের কাপ, জলের গ্লাস আর প্লেটে শিঙাড়া-সন্দেশ নিয়ে প্রতিভা হাজির হল।
‘হাতটা ধোব।’ সহদেব উঠে পড়ল। বৈঠকখানার লাগোয়াই একটা স্নানের ঘর, বাইরের লোকেদের জন্য। সাবান মাখিয়ে হাত কচলাবার সময় তার মনে পড়ল ঊর্মিকে। কথা বলার সময় কাবলির চোখে একটা রাগ ঝেঁঝে উঠছিল। ভুরুর, ঠোঁটের দ্রুত নড়ার, বেঁকে ওঠার, মাথাটা হেলানোর মধ্যেও দুজনের মিল রয়েছে। ঊর্মিকে ভাবতে ভাবতে সে হাত ধুয়ে ফিরে এল।
