আর রইল অনি। ওর কাছে বরং আশা করা যায়। অত্যন্ত কোমল, স্নেহে ভরা, দরদি…অভিধানে যত ভালো ভালো বিশেষণ আছে সব ওর মন-এর আগে জুড়ে দেওয়া যায়। আর এইটারই সুযোগ নিয়ে অসিত গত কুড়ি-একুশ বছর ধরে বউকে ঠকিয়ে চলেছে। হারামজাদার বউ ভাগ্যটা ভালো। টাকার পাহাড়ের উপর অসিত বসে আছে, চাইলে কয়েকটা নুড়ি কি একটা চাঙড় ফেলে দেবে হয়তো। কিন্তু তার বদলে কিছু একটা আদায় করে নেবে। অসিত দুপুরে শমির কাছে আসে বলে বিদ্যুৎ চেঁচিয়ে ছিল। কিন্তু চেঁচানোই সার, বউ আর শালাকে গালাগাল দিয়ে ঝিমিয়ে চুপ করে গেছে। কারণ, পাঞ্জাবি বন্ধুর ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে বিদ্যুতের চাকরিটা অসিতেরই দান। এটা অসিত ফিরিয়ে নিতে পারে যদি সে বিরক্ত বোধ করে।
বেচারা বিদ্যুৎ! এখন, এই বয়সে অন্য কোথাও চাকরি জোগাড় করে যথার্থ স্বামী হয়ে ওঠা ওর পক্ষে আর সম্ভব নয়। সে কোনোভাবেই অসিতের বিরক্তির কারণ হতে সাহস দেখাবে না। শমি নিশ্চয় এটা জানে। দাদার সামনে বিদ্যুৎ যেসব কথা চিৎকার করে তার সম্পর্কে বলেছে শমি তা শুনেছে। সহদেব ভেবেছিল বোন এরপর লজ্জায় কিছুদিন তার সামনে আসবে না।
কিন্তু শমি আধঘণ্টা পরই একটা নেমন্তন্নর কার্ড হাতে নিয়ে এসে বলেছিল, পাড়ার সুবল চাটুজ্জের মেয়ের বিয়ে। কাল রাতে সুবলবাবু কার্ডটা দিয়ে সবাইকে যেতে বলে গেছে।
এই সব চিন্তার মধ্যেই সহদেব ভিড়ের মধ্যেই নিজেকে গুছিয়ে নিয়ে জানলার দিকে মুখ করে দাঁড়াতে পেরেছে। কন্ডাক্টরকে ভাড়া দিয়েছে, গোড়ালিতে জুতোর ধাক্কা খেয়ে ‘একটু দেখে যান ভাই,’ বলেছে, বসে থাকাদের মধ্যে কেউ উঠবে কিনা তা বোঝার জন্য মুখগুলোয় নজর রেখেছে। তার মধ্যে একজনকে বলেও দিয়েছে দত্তবাগান মোড় থেকে কোনদিকে গেলে মিল্ক কলোনি পাবে।
বাস থেকে নেমে তিন মিনিটেই সহদেব পৌঁছে গেল। প্রতিভাদি তাকে জানাল, অনিতা কাছেই তার সম্পর্কিত এক ননদের বাড়ি গেছে। দুই মেয়েই, কাবলি আর টাবলি টিভিতে সিনেমা দেখছে। দোতলায় চওড়া মার্বেল মেঝের দালানে কয়েকটা সোফা। এটাই বন্ধু ও নিকটজনদের সঙ্গে বসার জায়গা। সহদেব সেখানেই বসেছে। ধবধবে থান পরা, মধ্যবয়সি, সুশ্রী প্রতিভা পঁচিশ বছর এই বাড়িতে। অনির কাছেই সে শুনেছে মৃত শাশুড়ির শূন্যস্থান পূরণের জন্য তাঁর শ্বশুর সদ্য বিধবা, প্রতিভাকে দেশ থেকে আনিয়েছিল। মিষ্টভাষী এবং শিষ্টাচারে পারদর্শিনী প্রতিভা এই বাড়ির বেসরকারী কর্ত্রী। সহদেবের থেকে বয়সে বছর দুয়েকের বড়ো কিন্তু তাকে ‘মেজদা’ বলে। আসলে সে এই বাড়ির কাজের লোক কিন্তু সবার মতো সহদেবও তাকে ‘প্রতিভাদি’ বলে।
‘মেজদা কেমন আছেন? বাড়ির সব খবর ভালো? দিল্লি যাবেন শুনেছিলাম।’
কপাল পর্যন্ত ঘোমটা নামানো। ফিনফনে দামি কাপড়ের থান, আদ্দির ব্লাউজ। আঁচল দিয়ে ঊর্ধ্বাঙ্গ সযত্নে ঢাকা। সহদেব অস্বস্তি বোধ করে সরাসরি তাকিয়ে কথা বলতে। ওর মুখ থেকে দৃষ্টিটা সরিয়ে নিয়ে গোটা শরীরটা দেখার ইচ্ছা যেন না হয়, সেই চেষ্টাই সে করে।
তার ধারণা প্রতিভা খুবই বুদ্ধিমতী এবং পুরুষ চরিত্রটা ভালো বোঝে। ওর সঙ্গে যতবারই সে কথা বলেছে, লক্ষ করেছে প্রতিভা তার চোখের দিকে গোয়েন্দার নজরে তাকিয়ে থাকে। মনে হয় যেন অপেক্ষা করে কখন এই পুরুষটার চোখ তার মুখ থেকে নীচে শরীর বেয়ে বেয়ে নামবে। বদ ইচ্ছায় ভরে যাওয়া পাজি ধরনের পুরুষদের ধরে ফেলায় হয়তো ও আমোদ পায়। সহদেব সিঁটিয়ে থাকে, কোনোমতেই এই বাড়িতে অনিতার মেজদা পাজি চরিত্রের লোক বলে যেন গণ্য না হয়।
‘আজই দিল্লি থেকে ফিরলুম… বাড়ির সবাই ভালো আছে।’ কথা বলতে বলতে শাড়ির বাক্সটা বার করে সে নীচু টেবলটায় রাখল। ‘অনির জন্য একটা শাড়ি।’
‘দিল্লি থেকে আনলেন?’ প্রতিভা এগিয়ে এল না বাক্স খুলে শাড়িটা দেখার জন্য।
‘আমি না, বিলেত থেকে বড়দা এসেছে। সেই দুবোনের জন্য দুটো শাড়ি কিনেছে। আমি এখানে আসছি, তাই সঙ্গে নিয়ে এলুম।’ সহদেব বাক্সের ঢাকনাটা খুলে বাড়িয়ে ধরল। ‘দেখুন…. দাম আছে শাড়িটার।’
প্রতিভা হাত বাড়িয়ে বাক্সটা নিল। সহদেবের চোখে পড়ল ওর বাঁ-হাতের আঙুলে তামার আংটি যেটা চামড়ার সঙ্গে মিশে রয়েছে। মাথা নীচু করে মনোযোগ দিয়ে প্রতিভা শাড়িটায় আঙুল বোলাচ্ছে। সহদেব সুযোগটাকে কাজে লাগাতে প্রতিভার গলা থেকে কাঁধের উপর দিয়ে দৃষ্টিটা সবেমাত্র কাপড় সরে যাওয়া বগলে…. ঠিক তখনই হাজির হল কাবলি, তার বড়ো ভাগনি।
‘হ্যাললো, এম এম এম! কখন এলে গো…. শাড়ি! পিসি কার শাড়ি, দেখি দেখি।’ কাবলি বাক্সটা ছোঁ মেরে প্রতিভার হাত থেকে তুলে নিল।
‘কার শাড়ি গো পিসি?’
‘আমার।’
‘কে দিল তোমায়?’
‘মেজদা।’
‘এম এম এম, তুমি দেবার আর লোক পেলে না!’
সহদেব হাসছে। এম এম এম হল মিডল মাদার মাদার অর্থাৎ মেজো মামার সংক্ষেপিত চেহারা। ছটফটে, প্রাণবন্ত এবং মায়ের মতোই দেখতে। একে নিয়েই অনির জ্বালা। ওকে বুঝিয়ে বলতে হবে ড্রাগ যেন না ধরে।
‘হ্যাঁ, আমিই তো প্রতিভাদির হাতে দিলুম।’
‘আমি তাহলে এটা নেব।… পিসি নেব?’
কাবলি তারপরই এগিয়ে এসে ঝুঁকে, ‘কার জন্য এনেছ বলতো?’ বলেই পাশের সোফাটায় ধপাস করে বসে পড়ল। শাড়িটা খুলে ফেলে নিজের গায়ের উপর বিছিয়ে বলল, ‘কেমন দেখাচ্ছে?’
