শেষ বিকেলে সে বাড়ি থেকে বেরোল অনিতার সঙ্গে দেখা করার জন্য। তার আগে শমিতাকে ডেকে জিজ্ঞাসা করেছিল, ‘অনির কাছে যাচ্ছি, দাদার দেওয়া ওর শাড়িটা যদি দিস তো দিয়ে আসব।’
শমিতা ইতস্তত করে বলল, ‘ভেবেছিলুম আমিই দিয়ে আসব…আচ্ছা, যখন যাচ্ছই তো নিয়ে যাও।’
ঝোলার মধ্যে শাড়ির বাক্সটা নিয়ে সহদেব একটু দোনামনা করে সামনের বাড়ির কড়া নাড়ল। দরজা খুলে দাঁড়াল অরুণকাকার ছোটো ছেলে অনির্বাণ। ইলেভেন ক্লাসে পড়ে।
‘বাবা কেমন আছেন? …মা কোথায়?’
‘মা তো এইমাত্র হাসপাতালে গেল, বাবা এখন বিপদ কাটিয়ে উঠেছে।’
‘আমি আজ দুপুরে দিল্লি থেকে ফিরে শুনলুম। কি যে হল শুনে… মাথাটা ঘুরে গেল। কত ছোটো থেকে ওকে দেখছি, কত হুঁশিয়ার, সজাগ, সাবধানী আর তারই কি না এমন অ্যাকসিডেন্ট!…ডান পা?’
‘হ্যাঁ, ডান পা। বাসটা ছেড়ে দিয়েছে আর বাবা হ্যান্ডেলটা ধরে চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে ছুটছে, ভীষণ ভিড় ছিল… ‘পা-টা রাখার একটু জায়গা দিন, একটু পা সরান’, কেউ কি আর পা সরায়! তারপর লাফিয়ে পা রাখতেই পা-টা পিছলে যায়। …মাথার ওপর দিয়ে চাকাটা চলে যেত, বাবা রাস্তায় পড়া মাত্রই বুদ্ধি করে গড়িয়ে গেছল, নইলে…।’
সহদেব শিউরে উঠল। অনির্বাণ তা লক্ষ করে বলল, ‘বাবা যদি আর বিঘতখানেক গড়াতে পারত পাটা বেঁচে যেত। …হাঁটুর নীচেটা একদমই গুঁড়িয়ে গেছে।’
‘যাক তবু রক্ষে, একটা পায়ের ওপর দিয়েই গেল। …অপারেশন ঠিকঠাক হয়েছে তো? গ্যাংগ্রিন ধরলে আবার আরও বাদ দিতে হতে পারে!’
‘সেরকম সম্ভাবনা তো থাকতেই পারে। তবে ডাক্তার মৈত্র নিজে অপারেশন করেছেন, মনে তো হয় না ও সব হবে।’
‘অরুণকাকা ফিরে আসুন, তারপর দেখা করব। মাকে বোলো আমি এসেছিলুম।’
সহদেব সন্ত্রস্ত হয়ে বাস স্টপে এল। তাকেও রোজ ভিড় বাসে উঠে অফিস যেতে হয়। পা রাখার জায়গা অবশ্য পায় এমনকী মিনিট পাঁচেকের মধ্যে বাসের মাঝমাঝি জায়গায় পৌঁছেও যায়। কিন্তু যদি কোনোদিন ওঠার সময় পা পিছলোয়!
প্রথম বাসটা সে ছেড়ে দিল। কেন জানি তার মনে হল, এটার পাদানিটা খুবই সরু, সে ভালোভাবে পা রেখে উঠতে পারবে না। পরক্ষণেই সে ভাবল, সব প্রাইভেট বাসের পাদানি তো এই রকমই আর সে রোজই দু বেলা তা ব্যবহার করে বাসে ওঠে এবং তাই থেকে নামে। দ্বিতীয় বাসটা আসামাত্র সে উঠে পড়ল এবং ওঠার সময় অসুবিধে বোধ করল না। একটা কারণেই-‘যদি আর বিঘতখানেক’, এই কথাটা তার মাথায় খেলে গেছল।
মরে যাব, মরে যাচ্ছি, ক্যানসার হতে পারে, এইডস হতে পারে এই সব চিন্তার একঝলক তাকে নাড়িয়ে দিল বাসের ভিড়ের মধ্যে। যে-কোনো মুহূর্তে সে মরে যতে পারে! আর একটা বাসের সঙ্গে মুখোমুখি ধাক্কা বা স্টিয়ারিং-এর টাই রড ভেঙে ফুটপাথে উঠে একটা দেয়ালে ধাক্কা, তিনজন বা চারজন নিহতের মধ্যে আমিও একজন হতে পারি! কিংবা বুকে ব্যথা, ডাক্তার নানান পরীক্ষা করে বলল বাইপাস সার্জারি করতে হবে বা কিডনিটা বদল না করলেই নয়, মৃত্যু অবধারিত-এ জন্য কম করে লাখ খানেক টাকা তো চাইই। পাব কোথায়?
টাকা বলতে তো প্রভিডেন্ট ফান্ড। পেনশন তো পরের কথা। ব্যাঙ্কে অ্যাকাউন্ট খুলতে হয়েছে। লেখাবাবদ পাওয়া চেকগুলো ভাঙাবার জন্য। মাসে মাসে কিছু টাকা জমাবে ভাবে, মাঝে মাঝে জমা দিয়েছেও, এখন এগারো-বারো হাজার বোধহয় জমেছে। তার বড়ো খরচ বই কেনা। বছরে গড়ে তিন-চার হাজার টাকা বেরিয়ে যায়। শমি খাইখরচের টাকা বাড়াতে বলেছে। অন্তত দিনে পঁচিশ টাকা করে ধরে মাসে সাড়ে সাতশো দিতে হবে। এ ছাড়া বাড়ির ট্যাক্সের তিনভাগের এক ভাগ আর যেহেতু বাসু থাকে না তাই ইলেকট্রিক বিলের অর্ধেক ধাঙড়, ঠিকে ঝি, এদের মাইনেরও অর্ধেক সে দেয়। তাছাড়া লেপ তোশক, বালিশ, পর্দা, বেড কভার, দামি বইয়ের জন্য কাচের আলমারি, সিলিং ফ্যান, দেয়াল জানলা রং করা-কিছু না কিছুতে খরচ লেগেই আছে। …ক্যানসার হলে বা হরেক নামের বদখত একটা রোগ চিকিৎসা করার জন্য টাকা কোথায়?
বড়দা কি টাকা দেবে? ‘মাথাটা সব থেকে ভালো ছিল’ যে ভাইয়ের তার শরীরের কোনো যন্ত্রাপাতি মেরামত বা বদলের জন্য দিলেও দিতে পারে। বহু লক্ষ টাকা না কামালে কি আর বাড়ি করার, ডায়গোনেস্টিক সেন্টার খোলার প্ল্যান করে? কিন্তু নিজের জন্য, ছেলেমেয়ের ভবিষ্যৎ দাঁড় করাবার জন্য করা আর ভাইয়ের ভালো মাথাটাকে অ্যাপ্রিশিয়েট করার জন্য কিছু খসানো, এক জিনিস নয়।
যদি বড়দা না দেয় তা হলে বাসু? অকল্পনীয়, অবাস্তব! প্রথমেই বলবে, ‘এই দ্যাখো না ছেলে দুটোকে ইংরেজি মিডিয়াম স্কুলে পড়ানো, তাদের জন্য টিউটর রাখা, স্কুলবাস ভাড়া এতেই ছ-সাতশো মাসে মাসে বেরিয়ে যায়, তার ওপর সুলেখার মাথায় একটা যন্ত্রণা রোজ রাতে হচ্ছে, ডাক্তার বলেছে থরো চেক আপ করাতে, …গুচ্ছের টাকা বেরিয়ে যাবে। আমি এখন এমন টাইট অবস্থায় …মাইনে কত আর পাই।’ এ সব শুনলেই মনে হবে, বরং এইডসেই মরা ভালো তবু টাকা নিয়ে বাঁচার চেষ্টা কিছুতেই নয়।
বিদ্যুৎ আর শমির কাছ থেকে টাকা আশা করলে সেটা নিজেকে নির্বোধ বা পাগল প্রমাণ করা হবে। হয়তো বা বিদুৎ বলবে, আপনার পোর্সানটা বাঁধা রাখেন যদি তা হলে ধারধোর করে টাকা জোগাড়ের চেষ্টা করতে পারি।’
