‘বাড়ি করবে সল্ট লেকে। আরও বছর পাঁচেক থাকবে ওখানে। মেয়ে কেমব্রিজে পড়ছে, ছেলে পড়ছে ডাক্তারি। দাদা এখানে নাকি চোখের ডায়গোনেস্টিক সেন্টার না কি যেন করবে।’
‘কোথায় করবে, সল্ট লেকে?’
‘কোথায় করবে বলেনি। বড়দা কিন্তু স্বাস্থ্যটা খুব ভালো রেখেছে। বিরাট দু বাক্স সন্দেশ, একশো টাকার তো হবেই, দুটো সিল্ক শাড়ি আমার আর দিদির জন্য, দুটো অন্তত দু হাজার টাকার, হাতে করে এনেছে। সেবাকে দুশো টাকা দিয়ে গেছে ফ্রক কেনার জন্য।’
সহদেব মুখ নীচু করে খেয়ে যাচ্ছে। শমির চাপা উচ্ছ্বাসের মধ্যে কাঙালেপনার বুড়বুড়িটা তাকে বিরক্ত করল। একটুকরো মাংস পাতে তুলে বাটিটা সরিয়ে রাখল।
‘তোমার কথা জিজ্ঞাসা করল। দিল্লিতে পেপার পড়তে গেছ শুনে বলল, ভাইদের মধ্যে ওরই মাথাটা সব থেকে ভালো ছিল। বিয়ে করল না কেন? দিদির, ছোড়দারও খোঁজ খবর নিল।’
‘আর কী বলল?’
‘এই বাড়ির কথা বলল। কেউ সারাচ্ছে না, মেরামত করছে না, দুদিন পর তো ভেঙে পড়বে। সবাই টাকা দিয়ে সারাক।’
‘সবাইটা কারা?’
শমিতা থমকে গেল। সহদেব এটাই আশা করেছিল। বাড়ির যা অবস্থা তাতে নমো নমো করে সারালেও অন্তত আট থেকে দশ হাজার টাকার দরকার। ফাটা ছাদ থেকে এই ঘরে জল পড়ে। প্রতি বছর বর্ষায় ছাদে সিমেন্ট-বালি লাগাতে হয়। যেহেতু শমিরা একতলায় থাকে তাই ছাদ নিয়ে ওরা ভাবে না। কিন্তু দোতলা বারান্দা যার উপর ভর রেখেছে সেই লোহার থামগুলো উঠেছে একতলা থেকে জরাজীর্ণ তাদের অবস্থা। লোহার দুটো বর্গা গত বছর খসে পড়েছে। বারান্দাটা যে এখনও ধসে পড়েড়ি কেন, সহদেব সেটা ভেবে প্রায়ই অবাক হয়। ভেঙে পড়লে শমিদের কারুর মাথার উপর পড়তে পারে। ওরা ভয়ের মধ্যেই থাকে। সদর দরজার পাল্লা দুটোর বাতান বহুদিন আগে খসে গেছে। পাল্লার তক্তার জোড়গুলো এত আলগা যে ধাক্কা দিতে ভয় হয়। পাইখানার প্যানটা ফাটা। ইলেকট্রিক তার জয়েন্ট বক্সগুলো খোলা এবং জট পাকানো। সারা বাড়ির তার অবিলম্বে বদলাতে হবে।
‘কি রে চুপ করে রইলি কেন? দাদা তো বলেই খালাস… সবাই টাকা দিয়ে সারাক!’
‘আমিও তাই বললুম, সারাবার মতো টাকা আমার নেই, মেজদারও নেই। ছোড়দা থাকে না তাই বলে দিয়েছে দেবে না। তারপর আমি বড়দাকে বললুম, তুমিই মেরামত করে দাও না। এটা তো তোমার পৈতৃক ভিটেই, এই বাড়িতেই তো তুমি জন্মেছ, বাবা-মা মারা গেছেন এই বাড়িতে, তোমার বিয়েও হয়েছে এই বাড়িতে, আট-দশ হাজার টাকা তোমার কাছে তো হাতের ময়লা।’
সহদেব তাকাল শমিতার দিকে। কত সহজে ভিক্ষার মতো টাকা চাইল প্রায় অপরিচিত হয়ে যাওয়া একটা লোকের কাছে। মেজদার টাকা নেই, এই কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গে সে মেজদাকেও দরিদ্র পর্যায়ে নামিয়ে দিল। ভাবতেই সহদেবের মেজাজ তপ্ত হতে শুরু করল।
‘কী বলল?’
‘বলল, আমি তো বলে দিয়েছি এই বাড়িতে আমার অংশটা ছেড়ে দোব। তিনজন অংশীদারকে না দিয়ে একজনকেই দোব। এইটুকু অংশ ভাগাভাগি হলে, এক একজনের ভাগে সামান্যই পড়বে তাতে কারুর কোনো লাভ হবে না, তার থেকে একজনই বেশি পাক, ভালোভাবে থাকুক। কাকে দোব সেটা অবস্থা বুঝে সহদেবই ঠিক করে দেবে।’
শমির কথায় আর আচরণে আকস্মিক বদল কেন ঘটেছে এতক্ষণে সহদেবের কাছে সেটা স্বচ্ছ হয়ে গেল। মুখভাবে পরিবর্তন না ঘটিয়ে সে বলল, ‘আমি! আমি ঠিক করে দেব বড়দার অংশ কে পাবে? কেন?’
‘তুমি এত বয়সেও বিয়ে করলে না যখন আর তখন করবেও না, তাই বড়দা ধরে নিয়েছে বিষয় সম্পত্তিতে তোমার লোভ নেই, যেহেতু দরকার নেই। বললও তাই, সহদেবই হচ্ছে একমাত্র লোক নিরপেক্ষ ভাবে বিচার করার মতো বোধ যার মধ্যে পাওয়া যাবে।’
‘আমি কি এখনও বিয়ে করতে পারি না? কত বয়স আমার জানিস?’
শমিতা থতমত হয়ে তাকিয়ে বলল, ‘তুমি বিয়ে করবে! এই বয়সে!’
‘তেতাল্লিশ-চুয়াল্লিশ কি বিয়ে করার বয়স নয়? পুরুষমানুষ এখনই তো ম্যাচুওরড হয়!’
শমিতার অপ্রতিভ মুখ এবার গম্ভীর হয়ে উঠল। দুশ্চিন্তায় সে ডুবে যাচ্ছে বুঝতে পেরে সহদেব অদ্ভুত একটা সুখ সংগ্রহ করে ভাবল, এদের এই ভাবেই জব্দ করতে হয়। ‘কেয়ার খোঁজ খবর কিছু রাখিস?’
‘না, কেন?’ শমিতা উৎকণ্ঠিত হয়ে তাকাল।
‘কে যেন বলছিল স্বামীর সঙ্গে ওর নাকি বনিবনা হচ্ছে না। অনেকদিনই তো ওর সঙ্গে দেখা হয়নি, ভাবছি এবার দেখা করব… যাকগে ওসব কথা। অনির শাড়িটা দিয়ে অসিস মনে করে। …মাংসটা খুব ভালো হয়েছে।’ সহদেব উঠে পড়ল হাত ধোবার জন্য। বারান্দায় বালতিতে জল তোলা থাকে। হাত ধুয়ে ফিরে এসে দেখল শমিতা খাটে পা ঝুলিয়ে একইভাবে বসে রয়েছে, চাহনি জানলার বাইরে। অপলক।
‘ভাবছিস কী, থালাবাটি নিয়ে নীচে যা, এখন আমি একটু ঘুমোব।’
‘যাচ্ছি।’ শমিতা উঠে দাঁড়াল। থালার উপর বাটি দুটো রেখে টেবলে পড়া ভাতগুলো খুঁটে তুলতে তুলতে বলল, ‘কেয়া কি আবার বিয়ে করবে। এখন যথেষ্ট রোজগার করে, এই ভাঙা বাড়ির একখানা ঘরে থাকতে আসবে না।’
সহদেব নখ দিয়ে দাঁতের ফাঁক থেকে মাংসের কুচি বার করায় ব্যস্ত। শমিতার কথা না শোনার ভান করল। স্বামীর সঙ্গে কেয়ার বনিবনা হচ্ছে না বা হচ্ছে জানার জন্য শমি যে এবার উঠে পড়ে লাগবে, তাতে কোনো সন্দেহ তার নেই। মেজদা যদি বিয়ে করে ফেলে, এই ভয়ের মধ্যে ওরা এবার থাকুক। খোশমেজাজেই সহদেব বিছানায় গড়িয়ে পড়ল।
