দ্বিতীয় ইনিংস আর খেলা হয়নি। তবে মরিয়া হয়ে ফিল্ড করেছিল তারক। একটি রান আউট ও দুটি ক্যাচ ধরে সে স্থান পেল দ্বাদশ ব্যক্তি রূপে।
‘বলটা শ্যুট না করলে, মনে হয় তুই টিমে চলে আসতিস।’ প্রণব এত বছর পর সান্ত্বনা দিচ্ছে, এতে তারক মনে মনে কুঁকড়ে গেলেও, ভেবে বিস্মিত হল, ব্যর্থতার এই দৃশ্যটি প্রণব মনে রেখেছে ঠিকই।
‘বলা শক্ত, অরুণ মিত্তিরের ক্যান্ডিডেট ছিল অরুণাভ। ট্রায়ালে ও ফিফটিএইট করে সিলেকশান পায়।’
‘যা বোলিং ছিল, তুই সেঞ্চুরি করতে পারতিস।’
‘বরাত। নয়তো ইডেনের পিচে কাঁকর থাকবে কেন।’
‘অরুণ মিত্তির তো তোকেও ব্যাক করেছিল।’
‘কিন্তু অরুণাভ ওকে মদ খাওয়াত, বাড়িতে চাকরের মতো পড়ে থাকত, শুনেছি অরুণাভ যাকে বিয়ে করেছে সে নাকি অরুণ মিত্তিরের কেপ্টের মেয়ে।’
তারক হতাশ চোখে তাকিয়ে থাকল। প্রণব শুনতে শুনতে আবার জানলার বাইরে উদাসীন ভঙ্গিতে চোখ ফেরাল।
‘ভেবেছিলুম আমাদের মধ্যে তুই-ই সবথেকে বেশি নাম করবি।’
তারক নিজের জন্য দুঃখে এবং অনুতাপে পীড়িত হয়ে নিরুপায়ের মতো চোখ নামিয়ে দেখল প্রণবের চেয়ারের তলায় একটা আলপিন পড়ে রয়েছে। সে ভাবল, ওটা খুঁটে তুলে নেবে কিনা। তুলে না নিলে কারোর, বিশেষত প্রণবের, কোনো সর্বনাশ ঘটতে পারে এমন কথা তার মনে হল না। তবে ওটা যেমন আছে থাক, এই সিদ্ধান্তে এসে তারক বলল, ‘পরিমল তো নাম করেছে।’
‘হ্যাঁ। তবে যাদের মধ্যে ও পরিচিত তারা পাবলিক নয়। খুবই সীমিত গণ্ডিতে পরিমলের খ্যাতি। ভাবছি একটা কিছু করা দরকার।’
‘কার জন্য?’
প্রণব গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেছে ইতিমধ্যে। তারকের আফশোস হল আবার নিজের জন্য। পাবলিকের মধ্যে পরিচিতি থাকলে প্রণব এখন তার জন্য এই থেকেও বেশি চিন্তায় ডুব দিত। মৃত পরিমলকে হঠাৎ তার একটা কাঁকর মনে হতে লাগল। প্রণবের মন থেকে খুঁটে ফেলে দিতে না পারলে, ওর ভাবনা তারকের সমস্যাকে কিছুতেই স্পর্শ করবে না। ছিটকে ছিটকে সরে যাবে।
‘ইলার জন্য সত্যিই দুঃখ হচ্ছে। বেচারা, মাত্র কুড়ি বছর বয়স।’ তারক গভীর দুঃখ কণ্ঠে প্রকাশ করার চেষ্টায় নাটকীয় ভঙ্গিতে মুঠো করে চুল টেনে ধরল। ‘মেয়েটা মারা যাবে ভাবতে পারছি না!’
‘পরিমলের বউ আর ছেলে যে কী করে বাঁচবে এবার… কিছু একটা করা দরকার।’
‘তুই একা আর কী করে বাঁচাবি। তাহলে মাসে মাসে তোকে সাহায্য করতে হবে যতদিন না ছেলেটা মানুষ হয়ে রোজগার করছে। তা কি সম্ভব?’
প্রণব সচকিত হয়ে বলল, ‘সেরকম কিছু করার কথা ভাবছি না। তাহলেও, এইরকম একটা পরিস্থিতির কথা ভাবলে কিছু একটা করতে ইচ্ছে করত।’
‘নিশ্চয়, খুবই স্বাভাবিক। তা না হলে আমরা মানুষ কেন! ইলার জন্য আমার তাহলে মাথাব্যথা হবে কেন, তুই-ই বা ডাক্তারের কাছে যেতে রাজি হলি কেন? মানুষ বলেই তো?’
প্রণবের মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। তারকের মনে হল, ওর ভালো লাগছে কথাগুলো। মানুষকে মানুষ বললে মানুষ খুশি হয়, এটা সে জানত। এতক্ষণ শব্দটা কাজে না লাগানোর জন্য আফশোস হল তার। দ্বিগুণ উৎসাহে যে বলল, ‘তুই ভালো করেই জানিস, ইলাকে আত্মহত্যা থেকে বাঁচাবার একটা পথই খোলা আছে। তুই পারসি সেই পথে সাহায্য করতে। তুই মানুষ, কিছুতেই পারবি না একটা মেয়ের মৃত্যু ঘটাতে।’
‘আমি মৃত্যু ঘটাব?’
প্রণব সিধে হয়ে বসল। তারক অপ্রতিভ বোধ করল।
‘এক্ষেত্রে, সাহায্য না করা মানেই তো মৃত্যু ঘটতে দেওয়া। তোকে বললুম না, ইলা আত্মহত্যা করতে চাইছে।’
‘কিন্তু ও আত্মহত্যা করলে কেউ কি ক্ষতিগ্রস্ত হবে?’
তারক চট করে জবাব দিতে পারল না। কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘কিন্তু ও বেঁচে থাকলে, হয়তো পরে কেউ লাভবান হতে পারে।’
‘এটা অনুমান।’
‘তাই থেকেই সিদ্ধান্তে আসতে হয়।’
‘কীসের ভিত্তিতে এই অনুমান? যে আত্মহত্যা করতে চায় তার তো কলকবজা সব ঢিলে হয়ে গেছে। তা ছাড়া এই ব্যাপারটা অর্থাৎ কুমারী অবস্থায় প্রেগন্যান্ট হওয়া, এটা তো কোনোদিনই তোর মাসতুতো বোন ভুলতে পারবে না। ব্যাপারটা ওকে তাড়া করবে সবসময়। সুতরাং কলকবজা ওর ঢিলেই থেকে যাবে। তার থেকে বরং-‘
তারক টান হয়ে বসল। প্রণব আর কথা না বলে উদাস হয়ে গেল। যদি প্রণব ভয়ংকর ধরনের কিছু একটা বলে বসে, এই ভয়ে তারক উঠে দাঁড়াল।
‘অফিস যেতে হবে, আজ চলিরে। কাল মিটিংয়ে দেখা হচ্ছে। তুই ইতিমধ্যে তাহলে ডাক্তার ফিরেছে কিনা খোঁজ নিয়ে রাখিস।’
বিদায় নিয়ে রাস্তায় নেমে তারক দেখল প্রায় সাড়ে আটটা। এখুনি ইঞ্জেকশন নিতে হবে। দ্রুত হেঁটে সে গাল তোবড়ানো লোকটার ওষুধের দোকানে ঢুকে বলল, ‘পেনিসিলিন ইঞ্জেকশন দিতে পারবেন, পাঁচ লাখ?’
‘বসুন।’
গাল তোবড়ানো আর একটিও কথা বলেনি। তারক ভেবেছিল বেঞ্চে শুতে বলবে। কিন্তু বেঞ্চটা রাস্তা থেকে দেখা যায়। চেনা কেউ দেখতে পেলে হয়তো কৌতূহলে দাঁড়িয়ে যাবে। তাই কোনো কথা বলবার আগেই সে বাঁ হাতের জামার হাতা গুটিয়ে বলল, ‘বসে বসেই নিচ্ছি, পাঁচ লাখতো মোটে, কিসসু হবে না।’
গাল তোবড়ানো শুধু ঘাড় নাড়ল। ইঞ্জেকশন নেওয়া সারা হতে মিনিট দশেক লাগল। তারমধ্যে তারক ভেবে নিল,-দুপুরে গুহ ফোন করবে আর বিকেলে ময়দানে মিছিলের সঙ্গে যেতে হবে। না গেলে হিরণ্ময় জানতে পারবেই। সব ডিপার্টমেন্টে ওর চর আছে। তারপর কোনমুখে ওকে নারায়ণের জন্য অনুরোধ করা সম্ভব। প্রণব ব্যবস্থা করে দেবে কিনা বোঝা গেল না। মনটা সত্যিই ওর খারাপ হয়ে গেছে পরিমলের মৃত্যুসংবাদে। তবে এই মন-খারাপ কালও যেন না থাকে! মন খারাপ হয়ে অবশ্য ভালোই হয়েছে। তাজা মন খুব কৌতূহলী হয়। যদি বলত, চল তোর মেসোর সঙ্গে আগে দেখা করি, তাহলে আবার ব্যাপারটা ম্যানেজ করার জন্য কিছু একটা বলতে হত। হল না, এইটাই আপাতত স্বস্তিকর।
