সহদেব ক্লান্ত রোধ করতে লাগল। সারাক্ষণ সে কিছু লোক আর তাদের সঙ্গে নিজের জড়িয়ে থাকা নিয়ে ভেবে চলেছে যার মধ্যে ইতিমূলক কোনো ভবিষ্যৎ নেই। শুধুই বিরক্তি, দুর্ভাবনা, পারিবারিক গোলমালে জড়িয়ে পড়ার ভয়। যে প্রবন্ধটা পড়ে এল সেটা এখন সে একদমই ভুলে গেছে। দু-তিনজন যে মন্তব্য করেছিল তাও মনে নেই। তার মনে হয়েছে এই সব সেমিনারে শুধুই ছায়ার সঙ্গে যুদ্ধ করা হয়। যে সব পেপার পড়া হল তার বিষয়গুলোর সঙ্গে দৈনন্দিন কালচারাল জীবনের কোনো সম্পর্ক নেই, বা থাকলেও তাতে কোনো কাজ হয় না।
ঝিমুনি এল তারপর চোখ বুজল এবং হালকা তন্দ্রায় সহদেব ডুবে গেল। রাত নটায় বাস থামল নেহরু প্লেসের পেট্রল পাম্পে। পাশের সিটের দক্ষিণ ভারতীয়টি নেমে যাবার আগে তাকে মৃদু ঠেলা দিয়ে উৎকণ্ঠিত ভাবেই ইংরেজিতে বলল, ‘আপনি তো এখানেই নামবেন?’
বাস অর্ধেক খালি করে যাত্রী নামল, তাদের সঙ্গে সহদেবও। একটা অটো রিকশা থামাবার জন্য হাতটা তুলে ক্ষণিকের জন্য বাসের দিকে তাকাল। জানলায় ঊর্মির মুখ। মনে হল যেন তার দিকেই ফেরানো। স্বামীর ব্যবহারে মরমে মরে থাকার মতো চাহনি। সহদেব তোলা হাতটা একটু ঘুরিয়ে জানলার উদ্দেশে পাঞ্জাটা নাড়ল। ঊর্মি দেখতে পেল কি না বুঝল না। ওর বোঝা না বোঝায় তার আর কিছু এসে যায় না। আর তো ওর সঙ্গে জীবনে দেখা হবে না!
ছয়
নির্ধারিত সময় থেকে পনেরো মিনিট দেরিতে রাজধানী এক্সপ্রেস হাওড়ায় প্ল্যাটফর্মে যাত্রা শেষ করল। হাওড়া ব্রিজ পর্যন্ত হেঁটে গিয়ে একটা ট্যাক্সি ধরে সহদেব দুপুর সাড়ে বারোটায় বাড়ি পৌঁছল। সদরের কড়া নাড়তে দরজা খুলল বিদ্যুৎ।
‘ট্রেন কি লেট করেছিল?’ বিদ্যুৎ সামাজিক ও প্রাথমিক সম্ভাষণ জানাল।
‘মিনিট পনেরো।’ সহদেব গা ছাড়া উত্তর দিয়ে সিঁড়ির দিকে এগোল।
‘আপনার ভাত করা আছে। চানটা করে নিন।’
সহদেব না থেমে বলল, ‘ভালোই করেছ, খুব খিদে পেয়েছে।’
‘জানি তো ট্রেন কখন পৌঁছবে, শমিকে তাই বলে রেখেছিলুম, দাদা এসেই ভাত চাইবে।’
সহদেব ‘ভাত চাইবে’টা শুনল দোতলায় বারান্দায় পৌঁছে। বাঁ দিকে তালা দেওয়া বাসুর ঘর। ডানদিকে বারান্দার শেষ প্রান্তে মায়ের ঘর, যেটায় এখন সে থাকে। তালা খুলে ঘরে ঢুকেই সে ভ্যাপসা গন্ধ পেল। তাজমহলের নীচের সমাধি ঘরের মতো ঠিক নয়। এটা স্যাঁতসেঁতে পুরোনো কাপড়চোপড়, বিছানা আর কাঠ থেকে তৈরি হওয়া গন্ধ। জানলা দুটো খুলে পাখার সুইচ টিপল। পাখা ঘুরল না। তা হলে পাওয়ার কাট!
বিরক্ত, অবসন্ন সহদেব খাটে শুয়ে চোখ বুজল। মিনিট দশেক পর ঘরের দরজায় শমিতার গলা শুনতে পেল। ‘মেজদা শুয়ে পড়লে নাকি। আগে চান খাওয়া করে নাও। এখন ঘুমিয়ে পড়লে আর উঠতে পারবে না। আমি ভাত নিয়াসছি।’
সহদেব উঠে বসল। খোলা জানলা দিয়ে সামনের বাড়ির ঘর দেখা যায়। শমিতা তার দৃষ্টি অনুসরণ করে জানলা দিয়ে তাকিয়ে বলল, ‘ওদের খুব বিপদ হয়েছে। অরুণকাকা মিনিবাস থেকে পড়ে গেছল মঙ্গলবার, বাসের চাকা ডান পায়ের ওপর দিয়ে চলে গেছে। পাটা কেটে বাদ দিতে হয়েছে। …আর দেরি কোরো না, দেড়টা বাজে।’
শমিতা চলে যাবার সঙ্গে সঙ্গে সহদেবও খাট থেকে নামল। অরুণকাকা ইউনিভার্সিটিতে চাকরি করেন, অত্যন্ত ডিসিপ্লিনড জীবন, সাতটি ছেলেমেয়ে। তিরিশ থেকে ষোলোর মধ্যে তাদের বয়স। প্রত্যেকে পড়াশুনোয় ভালো। বড়ো ছেলে ডবলু বি সি এস, বাঁকুড়ার কোথায় যেন বিডিও। খবরটা শুনে তার মনে হল একবার ও বাড়িতে গিয়ে কাকিমার সঙ্গে দেখা করা উচিত। ক্লাস ফাইভে পড়ার সময় অরুণকাকার বিয়েতে সে কদমতলায় বরযাত্রী হয়ে গেছল।
স্নান সেরে শোবার ঘরে এসে দেখল দেয়াল ঘেঁষা ছোটো টেবলটায় শমি ভাতের থালা এবং দুটো বাটি রেখে খাটে বসে। হাতে একটা লম্বা সাদা খাম। কোনোদিনই তো এই রকমটা হয় না অর্থাৎ কাছে বসে যত্ন আত্তি দেখানো! হঠাৎ আজ… ব্যাপার কী? বিদ্যুৎকেও যথেষ্ট বিগলিত দেখাল! খামটা খুলে দেখল আমেরিকান সেন্টারে ফিল্ম দেখার জন্য আমন্ত্রণ চিঠি। সাতদিন পর টিকিট বিলি হবে। খামে চিঠি ভরে রেখে সে শমিতার দিকে তাকাল।
‘মাংসের কী দাম, আটান্ন টাকা!’
‘আজ হয়েছে বুঝি? সহদেব চুল আঁচড়ে ফোল্ডিং স্টিলের চেয়ারটা পেতে বসল।
‘আধ কেজি এনেছে। ও বেলার জন্য আর রাখলুম না।’
কাল দুপুরে শ্যামল মাংস রেঁধেছিল। চমৎকার ওর রান্নার হাত। শমিও ভালো রাঁধে। কিন্তু পরপর দুদিন চড়া মশলা আর তেল, আর মাঝখানে ট্রেনে রাতের জঘন্য খাদ্য, এত ধকল পাকস্থলী নিতে পারবে না। সে বলল, ‘আমি কম খাব, তুই মাংসের অর্ধেক তুলে নে, পেটটা ভালো নেই।’
‘ওই কটা তো টুকরো, ওর থেকে আবার তুলব কী! খেয়ে নাও।’
সহদেব অবাক হয়ে যাচ্ছে। হল কি শমির! ডাল শেষ করে মাংসের বাটিটায় হাত দিয়েছে তখন শমি বলল, ‘বড়দা এসেছিল, তুমি যে দিন গেলে তার পরের দিন, মঙ্গলবারে।’
‘তাই নাকি! উঠেছে কোথায়, শ্বশুরবাড়িতে?’
‘নিউ আলিপুরে এক বন্ধুর বাড়িতে। আধঘণ্টার মতো ছিল।’
‘কী বলল?’ সহদেব মামুলি গলায় জানতে চাইল। তার কোনো মাথাব্যাথা নেই সচ্ছল, প্রবাসী বড়ো ভাই সম্পর্কে। তিনবছর আগে বড়দা কলকাতায় এসেও এই বাড়িতে আসেনি।
