ভাই, বোন, ভগ্নিপতি এবং ঝরঝরে পুরোনো বাড়ি প্রত্যেকেই এক একটা সমস্যা আর দুর্ভাবনা। অবিরত তৈরি হয় একটা না একটা ঝামেলা আর কুরে কুরে তার শান্তি, একাগ্রতা, উদ্যম ঝাঁঝরা করে দেয়। মাথাটাকে ক্লান্ত করে। পড়া আর চিন্তায় মন বসাতে পারে না। তবু রক্ষে সে বিয়ে করেনি, ছেলেপুলে নেই।
কেয়া। বিয়ে করলে তো ওকেই করার কথা। বিদ্যুৎ বলেছে একটা কুমারী মেয়েকে বিয়ে করব প্রমিস করে তাকে ভোগ করেছি তারপর ভাগিয়ে দিয়েছি। একদম বাজে কথা, প্রমিস টমিস কখনোই করিনি। কেয়া ওটা ধরে নিয়েছিল। আর নিয়েছিল বলেই সে কুমারীত্ব সমর্পণে রাজি হয়েছিল। কিন্তু কেন সে ধরে নেবে? শুরু শরীর দিয়েই কি একটা বিরাট গাছের মতো ভালোবাসার শিকড় নামিয়ে দেওয়া যায়? আজীবনের ভালোবাসা নানান জিনিসে ছড়িয়ে যায়। শরীরটাকে মেয়েরা যে কেন এত বড়ো করে দেখে! শুধু মুগ্ধতা আর আনুগত্য জীবনের একটা পর্যায় পর্যন্ত ভালো লাগে, বোধ বুদ্ধিকে টানে। কেয়ার অবশ্য গলাটা ভালো। পরিশ্রম করেছে গানের জন্য। কিন্তু তাই দিয়েই তো আর দিনের পর দিন বছরের পর বছর পাশাপাশি বাস করা যায় না! কেয়া এত উন্মুক্ত এত বৈচিত্র্যহীন।
এখন বিবাহিত জীবনযাপনে ওর কোনো অসুবিধে হচ্ছে কি? অবশ্য বছরপাঁচেক দেখাসাক্ষাৎ নেই কিন্তু কেয়ার নাম কাগজে সে দেখেছে। ভালো গাইছে, ক্যাসেট বেরিয়েছে। বাংলা সাপ্তাহিকে ছবিও ছাপা হয়। ওর স্বামী লোকটি কেমন? একসময় ইচ্ছে করেছিল লোকটিকে দেখতে, দু-চারটে কথা বলে বুঝে নিতে। কিন্তু সে আর এগোয়নি। কেয়ার পক্ষে মর্মান্তিক হবে স্বামীর সঙ্গে প্রাক্তন প্রণয়ীকে আলাপ করিয়ে দিতে। নার্ভাস বোধ তো করবেই তাছাড়া ভয়ও পাবে। স্বামীটি হয়তো খুবই সৎ, ভালোমানুষ, ঠান্ডা প্রকৃতির। গুণী স্ত্রী পেয়ে মনে মনে নিজেকে ধন্য বোধ করে। স্ত্রীর আঁচল ধরে থাকতে চায়।
কিন্তু যদি উলটোটি হয়, এই সামনের সিটের স্বামীটির মতো! ঊর্মি, মনে হয়, এর সঙ্গে বেশিদিন থাকবে না। নির্ঘাৎ এদের ছাড়াছাড়ি হবে। কিন্তু কেয়া এমন কাজ পারবে না। ওর মনের মধ্যে আদর্শ নারীর একটা ফরমুলা ঝোলানো আছে, তাতে ডিভোর্স বিষয়ে কোনো উল্লেখ নেই।
অনিতাকে সে বলেছিল অসিতকে ডিভোর্স করতে। তাইতে অনিতা বলে, ‘কী কারণ দেখাব? বলব আমার স্বামী লম্পট, সে তার শালিকে প্রেগনান্ট করেছে? এ কথা জানাজানি হয়ে যাবেই, মেয়ে দুটো এখন নয় শিশু কিন্তু একদিন বড়ো তো হবে, জানতেও পারবে। দাদা তুই শমির কথাটাও ভাব। …ওর জীবন তো একদমই নষ্ট হয়ে যাবে, যাবে না?’
এই ‘যাবে না?’-অনিতা সেভাবে চোখ বিস্ফারিত করে আন্তরিক স্বরে বলেছিল তাতে তখন তার হাসি পেয়ে যায়, এখন আবার পেল। বেচারা অনিতা! সহজ সরল এবং রূপসী।
একদা মেদিনীপুরে প্রভূত জমিজমার এবং এখনও কলকাতায় সাত-আটটি বাড়ির, দুটি বস্তির ও একটি কোল্ড স্টোরেজের মালিক, অমৃত বসুমল্লিক শুধুমাত্র রূপ দেখেই মধ্যবিত্ত বাড়ির প্রি. ইউ. পাশ মেয়ে অনিতাকে পুত্রবধূ করেন। অনিতাকে কখনো কেউ অসুখী দেখেনি। দুঃখ বেদনা যন্ত্রণা শুষে নেওয়ার অদ্ভুত একটা ক্ষমতা জন্ম থেকেই ও পেয়েছে। ছোটো বোনের জীবন নষ্ট হয়ে কি ‘যাবে না?’ এই ‘যাবে না’ই ওর জীবনের মূলমন্ত্র। কেয়ার সঙ্গে বহু ব্যাপারে ওর মিল আছে। অনিতা দিন দশেক আগে এসেছিল, ওর বড়ো মেয়ে উনিশ বছরের কাবলি নাকি একটা বাছে ছেলের সঙ্গে মেলামেশা করছে। ‘দাদা তুই ওকে একটু বুঝিয়ে বল। যদি ড্রাগট্রাগ ধরে তা হলে তো মরে যাবে, যাবে না?’ কলকাতায় ফিরলেই অনিতা আবার আসবে বলেছে।
ম্যাঞ্চেস্টার থেকে বড়দারও এসে যাওয়ার কথা। সল্ট লেকে জমি কেনা আছে, সেখানে বাড়ি তোলার ব্যবস্থা পাকা করার জন্য আসছে। উঠবে শ্বশুরবাড়িতে। একবার নিশ্চয় এ বানিতে আসবে। দুর্গাপুর থেকে বাসু চিঠি লিখেছে, বড়দা এলেই বাড়ির ভবিষ্যৎ নিয়ে মেজদা ওর সঙ্গে কথাটা যেন বলে নেয়। বাড়িতে তার যে অংশ, বলদেব ইঙ্গিত দিয়েছিল, ছেড়ে দেবে। সেটা যেন এবার লেখাপড়া করে পাকা করে দেয় এই অনুরোধ সহদেবকে করতে হবে। একটা বিশ্রী কাজ!
বিদ্যুৎ বলেছে শমির সঙ্গে অসিতের সম্পর্ক এখনও রয়েছে। অসিত দুপুরে মাঝে মাঝে আসে। কিন্তু ওর একটা অভিযোগ: ‘এই করাপ্টেড মেয়েটার সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়েছেন’, এটাই তাকে বিছুটির চাবুক মেরেছে। বরং সে আপত্তিই করেছিল। বলেছিল শমিকে কয়েকবছর সময় দাও, নিজেই কাউকে পছন্দ করে বিয়ে করুক। কিন্তু ব্যস্ত হয়ে অনিতা কোথায় কাকে দিয়ে খোঁজ খবর করিয়ে, তারকেশ্বরের কাছে একটা গ্রাম থেকে বিদ্যুৎকে আবিষ্কার করে। অসিতই খেসারত হিসেবে দিয়েছিল বিয়ের সব খরচ, আট ভরি সোনা, পোস্তায় এক ট্রান্সপোর্ট কোম্পানিতে চাকরি। কলকাতায় বসবাসের জন্য বিনা খরচে দুটো ঘর এবং বউয়ের দৌলতে বাড়ির কিছু অংশে মালিক হওয়া, এটাও নিশ্চয় বিদ্যুৎকে টোপ গিলিয়েছে। এত সব যখন সে পাচ্ছে তখন কি একবারও ওর মনে খটকা লাগেনি, তার মতো দরিদ্র, গ্রাম্য, মফসসল কলেজের গ্র্যাজুয়েটকে কেন এত সব দেওয়া হচ্ছে। বজ্জাত, ধড়িবাজ টাইপের তো বটেই, ওকে দেখলেই কেমন একটা অস্বস্তি সে বোধ করে। লোকের ক্ষতি করার জন্য সবসবয়ই যেন ছোঁকছোঁক করছে।
