কথা বলতে বলতে তারা ডানদিকে ঘুরে চলতে শুরু করল। চত্বরে লোক কম, বোধহয় ঝাঁ ঝাঁ রোদের জন্য। তাজমহলের পিছন দিকে গেলে যমুনা দেখা যাবে। তারা আবার ডানদিকে ঘুরল।
কী রকম একটা পুজো-পুজো, ধর্ম-ধর্ম ভাব যেটা তাজমহলের সঙ্গে মোটেই মেলে না। এখানে টাকাপয়সা দান কেন করবে, এটা তো গভর্নমেন্টের টাকায়, তাদেরই অধীনে চলে!’ ঊর্মি বলল।
‘কেউ হয়তো ব্যবসা করছে। গরিব দেশে অত বড়ো নোট কজন দিতে পারে? তাছাড়া শাজাহান-মমতাজকে বা কেন দেবে? এটা রামমন্দির কি বাবরি মসজিদ তো নয়! আমার মনে হয় বিদেশি টুরিস্টরাই এদের টার্গেট।’
‘হতে পারে।’ ঊর্মি নীচু পাঁচিলে হাত রেখে যমুনার দিকে তাকাল। নদীটা বাঁ দিকে এগিয়ে। হাঁসুলির মতো যেখানে বাঁক নিয়েছে আগ্রা ফোর্ট অনেকটা উঁচুতে সেখানেই। ঝোপ আর গাছপালায় পরিখা প্রাচীরের তলাটা ঢাকা। ফোর্টের অনেকটাই দেখা যাচ্ছে না। শাজাহান যেখান থেকে তাজমহল দেখত সহদেব সেই খোলা মণ্ডপটা খুঁজে বার করার চেষ্টায় পাঁচিলে ঝুঁকল। আগ্রা ফোর্ট এখান থেকে এক মাইলেই মতো মনে হল। এই পাঁচিল থেকে যমুনার জল অন্তত আড়াইশো-তিনশো মিটার দূরে। আর তার গল্পের নায়ক কিনা তাজ থেকে ঝাঁপ দিয়ে ডুবে মরেছিল!
‘বাঁ দিকের ওটা দেখুন’ ঊর্মি আঙুল তুলে নদীর ধারে একটা মসজিদ দেখাল। সহদেব মুখ ফিরিয়ে তাকাল। ‘এবার ডানদিকে দেখুন, ওদিকে ঠিক একইরকম দেখতে একটু ছোটো আর একটা সমজিদ রয়েছে ওটা মিহমানখানা, গেস্ট হাউস। বাবার কাছে শুনেছি, বাঁ দিকের মসজিদটার সঙ্গে আর্কিটেকচারাল ব্যালান্স বজায় রাখতেই ওই ডানদিকেরটা তৈরি করা হয়েছে।’
‘এত সব তখন ভাবা হয়েছিল!’ সহদেব তার গলায় বিস্ময়টা রেখেই এবার প্রশ্ন করল, ‘আপনার বাবা কি আর্কিটেক্ট?’
‘একদম নন। খুবই সাধারণ একজন কেরানি। রাইটার্সে হেড অ্যাসিস্টেন্ট ছিলেন রিটায়ার করার সময়।’ ঊর্মির মুখে বড়ো একটা হাসি। বোধহয় বাবাকে আর্কিটেক্ট ভেবে নেওয়ায় খুশি হয়েছে। সহদেব স্বস্তি বোধ করল একটি কারণে, সেও কেরানি এবং ঊর্মির কাছে হীনমন্যতা বোধ করার দরকার নেই। কেরানির মেয়ে, আশা করা যায় কেরানিকে নীচু শ্রেণিতে ফেলবে না।
‘কুড়ি মিনিট অনেকক্ষণ হয়ে গেছে।’ ঊর্মি ঘড়ি না দেখেই বলল।
‘চলুন।’
ওরা সিঁড়ি দিয়ে নেমে আসতেই ঊর্মির স্বামী তেতো গেলার মতো মুখ করে বিরক্ত গলায় বলল, ‘এই তোমার কুড়ি মিনিট?’
‘কুড়ি মিনিটে কি তাজমহল ঘুরে দেখা যায়?’
সহদেব অপ্রতিভ বোধ করলেও, সায় দিয়ে বলল, ‘সত্যিই, কুড়ি মিনিটে দেখা হয় না। অনুভব করার ব্যাপার তো, সেজন্য একটু সময় তো দিতেই হবে।’
‘অনুভব! সেটা আবার কি জিনিস? …পেয়েছেন তো, নাকি পাবার জন্য আপনি আরও কিছুক্ষণ এখানে থাকবেন?’ স্বামীর চোখে ব্যঙ্গের মতো একটা চাহনি সহদেবকে বুঝিয়ে দিল আর বেশি কথা বলা ঠিক হবে না।
মুখ নীচু করে চটি পরতে পরতে ঊর্মির মুখ গম্ভীর হয়ে উঠল। চাপা স্বরে বলল, ‘চলো।’
সহদেব অপেক্ষা করল ওদের চলে যাওয়ার জন্য সময় দিতে। ড্রাইভার একঘণ্টা সময় দিয়েছে। এখান থেকে বাস পর্যন্ত হেঁটে যেতেই তো পনেরো মিনিট লাগবে। সে মন্থর গতিতে বাগানের মধ্য দিয়ে হেঁটে বিশাল খিলানওয়ালা দরওয়াজার বাইরে এল। ঘুরে দাঁড়িয়ে তাজমহলকে দেখল। আর হয়তো তার আসা হবে না।
বাসে উঠে আড়ষ্টভাবে ওদের পাশ দিয়ে গিয়ে সে পিছনের সিটে বসল। ওরা কেউ তার দিকে তাকাল না। সিটের ফাঁক দিয়ে সে একবার মাত্র তাকিয়ে, স্বামীটির হাতে আবার ফ্লাস্ক দেখতে পায়। বাস ছাড়ার সময় লোকটির কী যে কথার জবাবে, ঊর্মি শুধু ‘হ্যাঁ’ বলল। একটা জিনিস সহদেবের মনে পড়ল, তারা কেউ কারোর নাম বলেনি। ঊর্মি বা ঊর্মিলা নামটা সে হঠাৎই জেনে গেছে কিন্তু স্বামীর নাম বা কোথায় নিবাস এসব সে জিজ্ঞাসা করেনি, ওরাও নয়। ভালোই হয়েছে। পথের সামান্য আলাপ পথেই শেষ হোক। একটা অসুখী দম্পতি।
ঊর্মি যে শিক্ষিত সেটা ওর বলার ভঙ্গি আর উচ্চচারণেই বোঝা যায়। ব্যক্তিত্ব আছে। হয়তো চাকরিও করে। এই রকম একটা মেয়ে এমন একটা স্বামীকে কতদিন সহ্য করবে? যদি বছর চার-পাঁচ বিয়ে হয়ে থাকে তাহলে অন্তত বাড়তি তিনটি বছর একসঙ্গে বসবাস করছে। ডিভোর্স করে আবার বিয়ে করার সময় ঊর্মির এসে গেছে।
সহদেবের কান সজাগ হল সামনের সিটের কথাবার্তায়।
‘আজই শেষ রাত। ব্যস …আমি কথা রাখব। বিশ্বাস করো, আর ঝামেলা…।’
‘হাত ছাড়ো।’
‘না।’
‘অসভ্যতা কোরো না, ছাড়ো।’
‘হাত ধরলে অসভ্যতা হয়? আমি তো তোমার অন্য কিছু-।’
‘চুপ করবে কি না?’
কিছুক্ষণ পর আবার শুরু হল।
‘অ্যাতো মেজাজ কীসের? য়্যাঁ, আমার সঙ্গে এই রকম ব্যবহার করার সাহস আসে কোত্থেকে?’
‘সাহস আমার বরাবরই ছিল এখনও আছে। নেহাত…।’
‘নেহাত কী?’
‘তুমি সেটা ভালো করেই জান। সাহস না থাকলে কি এইভাবে আসি?’
‘অ …গ্লাসটা কোথায়? …দ্যাখ তো তোমার সিটের পাশেটাসে… একি, এর ওপর বসেছিলে, এতো ফেটে গেছে!’
‘ফ্লাস্কে চুমুক দিয়েই তো খেতে পার।’
‘তাই খাব।’
সহদেব বাইরে তাকিয়ে রইল। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যা, তারপর রাতও নেমে এল। বাসটা মথুরা, বৃন্দাবনে থেমে ছিল। যাত্রীরা প্রায় সবাই নেমেছিল। সামনের দম্পতি এবং সহদেব নামেনি। জানলা দিয়ে সে মফস্সল শহরের দোকানগুলোর দিকে তাকিয়ে বসে থেকেছে। সবাই যখন ফিরে এসে সিটে বসে সে তখন জানলার দিকে মুখ ফিরিয়ে, তার ভাবনা এখন কলকাতায় চলে গেছে।
