ইতস্তত ভাবটা ঝেড়ে ফেলেই সহদেব পাথরের পার্টিশানটাকে ঘুরে গিয়ে ঊর্মির সামনে দাঁড়াল। ওর মুখে বিস্ময় ফুটল।
‘আমার চটিজোড়া আপনার কর্তার জিম্মেয় রেখে এসেছি। উনি নিজেই বললেন রেখে যান তবে আপনি ফিরে গেলেই আর অপেক্ষা করবেন না, চলে যাবেন। কাজেই আমি এখন আপনাকে কী অনুরোধ করব সেটার অনুমান নিশ্চয়ই করতে পারছেন।’
‘পারছি।’ ঊর্মি হাসল। দাঁড়াবার ধরনে স্বাচ্ছল্য আনল এবং কণ্ঠস্বরে সহযোগিতার রেশ। ‘আমাকে একটু বেশিক্ষণ থাকতে হবে।’
‘যদি বিরক্ত না হন।’
‘তাজমহলে ঢুকে বিরক্ত?’ ভ্রূ দুটো চিমটি কাটার মতো উঠে গেল।
‘না না, বিরক্ত বলতে…’ সহদেব জানে কথা অসম্পূর্ণ রাখার মানে হেরে যাওয়া, সেটা মেয়েরা পছন্দ করে।
‘আমার এখনও নীচেটা দেখা হয়নি।’ ঊর্মি তাকে আশ্বস্ত করল। ‘এই দুটো নকল। নীচেরই রেপ্লিকা।’
‘সেই রকমই শুনেছি।’ সহদেব বলল না যে এই তথ্যটা সে জানে। কথা যা বলার ওই বলুক। ওর ভারি গম্ভীর স্বর তার ভালো লাগছে। তার মনের গভীরে কোনো একটা জায়গায় কম্পন তুলছে।
ওরা সমাধি দুটি ঘুরল। দেওয়ালে ফুল লতাপাতার নকশা আরও ভালোভাবে দেখার জন্য এক সাহেব সিগারেট লাইটার জ্বালিয়ে ঝুঁকে দেখছে। ঊর্মি বলল, ‘এ রকম পিওর টেক্সচার আর ডেলিকেট গ্রেইন খুব কম মার্বেলেই দেখা যায়, সকরানা থেকে আনা।’
‘আপনি তো দেখছি অনেক জানেন!’ সহদেবের বিস্ময়ে খাদের মিশেল নেইই প্রায়।
‘বাবার কাছে শোনা। প্রচণ্ড বই পড়ার নেশা, সবরকম বই, যখন যা হাতের কাছে পান পড়ে ফেলেন। উনি তাজমহল দেখেননি কিন্তু আমাকে এই মার্বল স্ক্রিনটার কথা বলেছিলেন। …দেখার মতো, না?’
ঊর্মি সরল দৃষ্টি সহদেবের মুখে রেখেছে উত্তরের প্রত্যাশায়।
‘হ্যাঁ। এখন আর এ জিনিস তৈরি হবে না।’
‘তাজমহলের মতোই?’
‘হ্যাঁ। সেজন্য শাজহান চাই, মমতাজ মহল চাই, কোটি কোটি টাকাও চাই।’
‘এসব ছাড়াও কি তাজমহল গড়া যায় না?’
সহদেব বুঝে উঠতে পারল না, কথাবার্তা কোন দিকে সে নিয়ে যাবে! সিরিয়াস দিকে নিয়ে যেতে চাইলে সে বলবে, তাজমহল তো মানুষের মনে। গরিব চাষি মজুরও তার ভাঙা ঘরে এটা বানাতে পারে যদি গভীরভাবে কোনো নারীকে ভালোবাসতে পারে, ইত্যাদি ইত্যাদি। কিন্তু এই মুহূর্তে একজন অপরিচিতার সঙ্গে এই স্তরে আলাপ চালানো যায় না।
‘গড়া যাবে না কেন? সহদেব ব্যাপারটা লঘু করার জন্য বলল, ‘দোকানে দোকানে তাজমহল বিক্রি হচ্ছে দুশো-আড়াইশো টাকায়, মার্বেলেরই!’
‘এবার নীচেটা দেখে আসি।’ ঊর্মি ঘড়ি দেখল। ‘কুড়ি মিনিটের মধ্যে ফেরার কথা।’ সহদেব বুঝে গেল শস্তা রসিকতা ওর পছন্দ নয়।
সরু সিঁড়ি, প্রচুর লোক ওঠানামা করছে এবং সিঁড়ির খোলা দিকটায় কোনো বেড়া নেই। ওরা হুঁশিয়ার হয়েই নামছিল তবু পিছন থেকে পিঠে ছোটো একটা ধাক্কা খেয়ে সহদেব পরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে যাওয়া ঊর্মির কাঁধে হাত রাখতে বাধ্য হল।
কিছু কি মনে করল? সহদেব ও মুখ দেখার চেষ্টা করে ক্ষমাপ্রার্থীর স্বরে বলল, ‘পড়ে যাচ্ছিলুম, যা একটা ঠেলা মারল!’
‘আমিও সামনের লোকটাকে ধাক্কা দিয়েছি।’ মুখ ঘুরিয়ে চাপা গলায় ঊর্মি জানাল। শুনেই আড়ষ্টতা আলগা হয়ে সে ঝরঝরে হালকা বোধ করল।
উপরের থেকে নীচের ঘরটা খুবই ছোটো এবং আরও অন্ধকার। ঘরে টিমটিমে একটা ইলেকট্রিক বালব জ্বলছে। ভ্যাপসা গন্ধ। শ’য়ে শ’য়ে মানুষ আসছে, তাদের শ্বাসপ্রশ্বাস জমে রয়েছে, বার করে দেবার কোনো ব্যবস্থা নেই। খোলা সিঁড়ি দিয়ে যতটুকু হাওয়া চলাচল করে তাতে গুমোট গন্ধটা কমে না। উপরের নকল থেকে এখানকার সমাধি দুটো ছোটো কিন্তু হুবহু একই রকমের নকশা, লাল সবুজ নীল পাথরের লতাপাতায় যেন মিনে করা।
হাঁটু সমান উঁচু চাতালের মতো দুটো সমাধি। মমতাজেরটি আকারে ছোটো, দুটির মাঝে আধহাত ফাঁকা। বড়ো দুটি মোমবাতি আর ধূপ সমাধির একধারে জ্বলছে। মৌলবির মতো একটা লোক দর্শকদের দেওয়া প্রণামীর নোটগুলো ভালো করে বিছিয়ে রাখায় ব্যস্ত।
সহদেব ফিসফিস করে বলল ‘টাকাগুলো গুনুন। …একশো, পঞ্চাশ, কুড়ি টাকার নোটই দেখছি পড়েছে।’
মনে মনে গুনে ঊর্মি বলল, ‘শ ছয়েক হবে।’
‘ভাগে বেশিটা কার, শাজাহানের না মমতাজের?’
ঊর্মি আবার গুনে বলল, ‘শাজাহনেরই বেশি, সাড়ে চারশোর মতন। …চলুন বেরোই, দমবন্ধ হয়ে আসছে আর এখানে থাকা যাচ্ছে না।’
উপরে উঠে বেরিয়ে আসার সময় খিলেনের তলায় দাঁড়িয়ে থাকা, রংচটা নীল বুশশার্ট আর পাতলুন পরা একটা লোককে চেঁচিয়ে বলতে শুনল, ‘বি ওয়্যার অফ পিকককেট, জেব সামহালকে…।’
হাফ প্যান্ট পরা, লম্বা চুলের এক ছোকরা সাহেবকে বেল্টের মতো পেটে জড়ানো কালো গেঁজেটা হাত দিয়ে চেপে ধরতে দেখে সহদেব বলল, ‘আপনার ব্যাগটা কিন্তু খেয়ালে রাখবেন।’
‘আমার ব্যাগে! …কিচ্ছু পাবে না। দেখলেন তো, মমতাজের বরাতে কটা টাকা! মমতাজ ভালোবেসেছিল বলেই যে শাজাহান তাজমহল তৈরিতে ইন্সপায়ার্ড হয়েছিল এটা কেউ আর বোঝে না!’
‘মমতাজের রেটিং যে এত পুওর, ভাবতেই পারি না! আমার মনে হচ্ছে লোকটা নোটগুলো সাজিয়ে রেখেছে, ওগুলো দেখে যাতে ওই মাপে টাকা দান করে, সেই উসকানি দেবার জন্যই… দেখেননি ভিখিরিরা কুড়ি পয়সা, পঁচিশ পয়সা সামনে ছড়িয়ে রাখে যাতে দশ পয়সা দিতে লোকে ইতস্তত করে।’
