চিনি সহযোগে পাউরুটি, মাখন এবং কলা যে এত ভালো খাবার সহদেব সেটা তার তৃপ্তির বহর থেকে বুঝে নিল। কাগজে হাত মুছে সেটা বাসের জানলা দিয়ে ছুঁড়ে ফেলার সময় দেখল অনেকেই ফিরে আসছে তার মধ্যে ঊর্মি এবং তার স্বামীও। জল খেয়ে ওয়াটার বটলটা ঝোলায় ভরে সেটা পায়ের কাছে রেখে মুখ তুলতেই ঊর্মির চোখে চোখ পড়ল। ওর ভ্রূ দুটো একটু শুধু নড়ে উঠল।
মিনিট কুড়ি পর বাস যেখানে পৌঁছল, সেখান থেকে তাজমহলের প্রধান ফটক পর্যন্ত হেঁটে প্রায় আধ কিলোমিটার যেতে হল। প্রেমের ভুবন খ্যাত সৌধ দেখতে যাবার পথের দুধারের অপরিচ্ছন্নতা আর দীন পরিবেশে সহদেবকে একটু দমিয়ে দিল। এখানেও নোংরা চায়ের দোকান, ফুটপাতে অল্প পয়সার খাবার। তার মনে হল , যেহেতু আজ দু টাকার টিকিট কেটে ঢুকতে হবে না তাই আগ্রার কাছাকাছি অঞ্চলের গরিবরা এর সুযোগ নিতে এসেছে। বাইরের ফটক দিয়ে ঢুকেই দুধারে বিভিন্ন রাজ্যের কাপড়, জুতো আর কারুশিল্পের দোকান। ঊর্মির স্বামী রাজস্থান সরকারের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে চপ্পল দেখছে। নিস্পৃহ ভঙ্গিতে অপেক্ষারত ঊর্মির পাশ দিয়ে এগিয়ে যাবার সময় আবার তাদের চোখাচোখি হল। ক্ষীণ একটা স্বতঃস্ফূর্ত হাসি সহদেবের মুখে ফুটল। ভদ্রতা দেখিয়ে ঊর্মিও তাই করল।
বাক্যকাল থেকে দেখে আসা তাজমহলের সবথেকে পরিচিত ছবিটাই সহদেবের চোখে ধরা দিল যখন সে বিশাল ফটকটার সামনে দাঁড়াল। লম্বা হয়ে চলে গেছে সিমেন্ট বাঁধান অগভীর সরু খাল, যার জলে তাজের ছায়া। তার দুপাশে পাথর বাঁধানো সরু পথ, তার ধারে সারি দিয়ে সমান মাপে কেয়ারি করা গাছ, তার পাশে সবুজ তৃণভূমি। সবার শেষে জমি থেকে হাত পনেরো উঁচু, আধখানা ফুটবল মাঠের থেকেও বড়ো সরল সাদামাটা চৌকো গড়নের মর্মর বেদি যার ঠিক মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে-সহদেব বিড়বিড় করে বলল, ‘শুভ্র মেঘের দল।’
ফটকের সিঁড়ি থেকে নেমে হাঁটতে হাঁটতে সে এগোল বাঁধানো পথ ধরে। এবার সে দেখতে পেল সরু খালে নোংরা জল, তাতে তাজের ছায়া প্রতিবিম্বিত হচ্ছে না। ফুল গাছগুলোয় যত্নের ছাপ নেই, পথের পাথরগুলো ভাঙা, দুধারের ঘাসের জমিতে হাঁটাচলা বা সেখানে নেমে ফোটোতোলা নিষেধ করে ফলক পোঁতা। বহু লোক তা মানছে না। গোটা পরিবেশটাই হইচই-এ ভরা।
সহদেব এগুলো নিয়ে নিজেকে বিরক্তিতে ভরিয়ে দিল না। আসুক, সবাই দেখুক, তাজমহল তো প্রেমের প্রতি আনুগত্য আর সৌন্দর্য সম্পর্কে একটা ধারণা। কিন্তু তার বাইরেও তো আবাক হয়ে যাওয়ার মতো একটা স্থাপত্য কর্ম। সেটা দেখলেও তো সূক্ষ্ম অনুভবগুলো সজাগ হয়ে উঠতে পারে।
পনেরো হাত উঁচু শ্বেত পাথরের বিশাল চত্বরে ওঠার আগেই সহদেব অপ্রত্যাশিত একটা মুশকিলে পড়ল। জুতো পড়ে ওঠা নিষিদ্ধ, তাজের ভিতরে যাওয়াও। এটা তো সে জানত না। সেমিনারে গণ্যমান্য বিদগ্ধজনেরা উপস্থিত থাকবে ভেবে সে দিল্লি আসার চারদিন আগে একশো সত্তর টাকা খরচ করেছে চটি কেনার জন্য। সেটা খুলে রেখে যাওয়া কোনোমতেই সম্ভব নয়। আশপাশের লোকেদের মধ্যে অনেকেরই স্বভাব সম্পর্কে সে নিশ্চিন্ত হতে পারছে না। যারা খুলে রেখে যাচ্ছে তাদের সঙ্গের কেউ না কেউ পাহারায় থাকছে।
পয়সার বিনিময়ে জুতো জমা রাখে এমন কাউকেও সে দেখতে পেল না। বিদেশি টুরিস্টদের কেউ কেউ অবশ্য জুতো অরক্ষিত রেখেই ভিতরে যাচ্ছে। সে লক্ষ করল ওদের জুতোগুলো নোংরা বটে কিন্তু দামি! জুতো চুরি গেলে ওদের গায়ে লাগবে না, অনেক টাকা হাতে নিয়ে ওরা আসে, দু-ঘণ্টার মধ্যেই আবার কিনে নেবে। কিন্তু আমার পক্ষে তো সেটা সম্ভব নয়।
সহদেব ইতিউতি তাকিয়ে যখন ভাগ্যের হাতে নতুন চটিজোড়াকে ছেড়ে দেবে মনস্থ করেছে তখনই দেখল ঊর্মির স্বামী নীচু পাঁচিলের উপর বসে তার দিকেই তাকিয়ে। ওর পায়ের কাছে বউয়ের চটিজোড়া। কপাল ঠুকে সহদেব এগিয়ে গেল।
‘আপনি ভেতরে যাননি?’
লোকটি প্রখর রোদের জন্য চোখ কুঁচকে মুখ তুলল, মাথা নাড়ল। ‘চটি পাহারা দিচ্ছি। …তাছাড়া আমার দেখা আছে। তাজমহল বাইরে থেকেই দেখতে ভালো। আপনার কি এই প্রথমবার?’
‘হ্যাঁ।’
‘ভেতরে যাবেন?’
‘হ্যাঁ।’
‘চটি রেখে যেতে পারেন। তবে ও এসে গেলে আমরা কিন্তু চলে যাব।’
নেই মামার চেয়ে কানামামা, এই মুহূর্তে সহদেবের কাছে প্রার্থিত বলেই ঠেকল। চটি খুলেই সে সময় অপচয় করল না। সিঁড়ি দিয়ে তরতরিয়ে উঠে গেল।
বিশাল খিলেন। সেটা দিয়ে ঢুকেই নীচে যাবর জন্য মেঝেটা চৌকো ভাবে কাটা, কোনো রেলিং নেই। সেই কাটা মেঝে দিয়ে সিঁড়ি নেমে গেছে। সহদেব জানে শাজাহান আর মমতাজের দুটো সমাধি। একটা উপরে, সেটা নকল। আর আসলটা নীচে, সিঁড়ি দিয়ে নেমে দেখতে হবে। সে ঠিক করল আগে উপরেরটাই দেখবে।
কাটা মেঝের পাশ দিয়ে গিয়ে জালকাটা নকশাদার শ্বেত পাথরের পার্টিশনের মুখোমুখি হল। মেঝে থেকে ছ-সাত ফুট উঁচু, তিন-চার ইঞ্চি পুরু আসাধারণ মর্মর। বাইরে থেকে সমাধি দুটো যাতে না দেখা যায় সেজন্য পর্দার কাজ করছে। কী ধৈর্যে আর দক্ষতায় পাথরে নকশা তুলে ফাঁকগুলো তৈরি করা হয়েছে! সহদেব হাত বুলোতে বুলোতে ফাঁক দিয়ে ঊর্মিকে দেখতে পেল। মুখটা তুলে প্রায়ান্ধকার এই আটকোণা বিরাট ঘরটার ছাদের দিকে তাকিয়ে।
