‘না’।
‘কলকাতায় গেলেই সব ঠিক হয়ে যাবে।’
পুরুষের হাতটা এসে পড়ল মেয়েটির কবজিতে। চেপে ধরল।
‘বছরে একবার অন্তত বেড়াতে বেরোনো দরকার, টেনশন কাটে।’
‘কারুর কারুর তাতে বাড়েও।’
পুরুষের হাতটা সরে গেল। আঙুলে দুটো আংটি, একটা পলার অন্যটা গোমেদের। লোকটা ভাগ্যবিশ্বাসী। ব্যবসায়ী? ঘুষের চাকরি করে?
আর কোনো কথা ওদের মধ্যে হল না। সহদেব চোখ বন্ধ করল।
পাঁচ
অমর সিং গেট দিয়ে আগ্রা ফোর্টে ঢোকার সময় ভিড় দেখে শ্যামলের কথাটা তার মনে পড়ল, ‘শুক্রবার টিকিট থাকে না, ফ্রি।’ আরও চারটে লাক্সারি ট্যুরিস্ট বাস দাঁড়িয়ে। ঠেলা গাড়িতে জল বিক্রি হচ্ছে। ফিরিওলা পসরা বিছিয়ে বসে। কাঠের চালাঘরে দোকান। সহদেব বাস থেকে নেমেছে সবার শেষে।
দুপাশে খাড়া উঁচু দেওয়াল। চারটে হাতি পাশাপাশি যেতে পারে, পাথর বাঁধানো এমন একটা প্রায় তিনশো মিটার রাস্তা চড়াই-এর মতো উঠেছে। সহদেব ধীরে হাঁটছে, তার কিছুটা আগে চলেছে সামনের সিটের দম্পতি। রাস্তার শেষে পৌঁছে সে ঠিক করে উঠতে পারছিল না, ডানদিকের বাড়িটায় ঢুকবে না সামনের বাড়িটায়। বাড়ি না বলে প্রাসাদ বলাই উচিত। চারশো বছর আগে আগ্রাকে রাজধানী করে যমুনার দক্ষিণ তীরে দেড় মাইল বেড়ের এই দুর্গেই তো আকবর বসবাস করেছেন। তারপর রাজধানী হয় আরও পশ্চিমে ফতেপুর সিক্রি-তে।
দম্পতি ডানদিকের বাড়ির দিকে যাচ্ছে। পুরুষটি মন্থর, পদক্ষেপ সামান্য এলোমেলো, মেয়েটিকে মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়তে হচ্ছে পাশাপাশি হবার জন্য।
বিরাট ফটক দিয়ে ঢুকে বেলে পাথরের বড়ো একটা চত্বর। ডানদিকে সার দেওয়া ঘর। ঘরগুলোর তিনদিকে দেওয়াল, সামনেটাই শুধু খোলা। সবই বেলে পাথরের। সহদেবের মনে পড়ল, ইউনিভার্সিটি লাইব্রেরিতে পড়া সাহেবের লেখা বইটার একজায়গায় সে পেয়েছিল, বলিষ্ঠ পৌরুষের ছাপ মুঘল আমলের প্রথম দিকের স্থাপত্যে ধরা পড়ে। সাম্রাজ্য বাড়াবার ও রক্ষার জন্য ব্যস্ত কঠিন নির্মম রুক্ষ চরিত্রটা এই দুর্গের মেঝেয়, দেওয়ালে, গড়নে ছড়িয়ে আছে। প্রায় ষাট-সত্তর বছর পর আকবরের নাতি শাজাহানের সময় বেলেপাথরের জায়গায় এল শ্বেত মর্মরের যুগ। রুচি সৌন্দর্য, সামঞ্জস্য আর কমনীয় সুষমায় ভরা স্থাপত্য উপচে পড়ল। রাজনৈতিক নিশ্চয়তা পাওয়ায় আর সম্পদের বিশাল ভাণ্ডারের মালিক হওয়ায় শাজাহানের পক্ষে তাই সম্ভব হয়েছিল শিল্প নির্মাণে উৎসাহী হতে। বহু জায়গায় তিনি বেলেপাথর সরিয়ে সেখানে শ্বেতপাথর বসিয়েছেন দেখতে সুন্দর লাগবে বলে।
সহদেব উঁচু প্রাকারে দাঁড়িয়ে যমুনার ওপারে তাজমহল প্রথমবার দেখল। যমুনার মাঝখানে চড়া, একটা চওড়া খালের মতো তার জলধারা। চড়ায় চাষবাস হচ্ছে বোধহয়! প্রাকারের নীচে ঘন ঝোপজঙ্গল, সে অনেকক্ষণ তাকিয়ে থেকে অবশেষে হেসে ফেলল। এতদূর থেকে তাজমহলটার বিশালত্ব কিছুই প্রায় ধরা যাচ্ছে না। প্রায় অন্ধ শাহজাহান যেখান থেকে তাজমহল দেখতেন, সেই শ্বেতপাথরের একটা আটকোনা মণ্ডপ, আকারে শোবার ঘরের মতো, তারই দেওয়ালের একটা জায়গায় ভিড়। সেখানেই সহদেব দেখতে পেল দম্পতিটিকে।
পায়ে পায়ে সে ভিড়টার কাছে এল। গাইড বক্তৃতা দিচ্ছে। দেওয়ালে চিঠির খামের আকারের একটা অংশে পাথর নেই। ওখানে না স্ফটিক বসানো ছিল। শাজাহান এই স্ফটিকে প্রতিবিম্বিত তাজমহল দেখতেন। গেরুয়া চাদর গায়ে তিব্বতী বৌদ্ধ ভিক্ষুক ভিডিও ক্যামেরায় ছবি তুলছে।
‘উর্মি ওদিকে দ্যাখো।’
পুরুষটি স্ত্রীর কনুইয়ে টান দিল। মেয়েটি মুখ ঘুরিয়ে দেখল। খোলা কার্নিসের ধারে মাঝবয়সি স্বামী-স্ত্রী বসে। স্ত্রীর কাঁধে বেড় দিয়ে স্বামীর বাহু ঘোমটা দেওয়া স্ত্রীর মাথা স্বামীর কাঁধের দিকে ঝোঁকানো। দুজনের মুখ তাজমহলের দিকে। চোখ আধবোজা। এতলোক যে তাদের দিকে তাকাচ্ছে সেটা অগ্রাহ্য করেই ওরা বসে, মনে হচ্ছে যেন মানত করেছিল শাজাহানের ভূমিকা নিয়ে দুজনে এই জায়গাটিতেই একদিন বসবে।
সহদেবও ওদের দেখল এবং হেসে ফেলল। তারপরই মেয়েটির দিকে তাকিয়ে দেখতে পেল এক ফালি হাসি ওর মুখেও। এই প্রথম সে ওর চোখে ঔজ্জ্বল্য দেখতে পেল। ঠোঁটে কৌতুকের ভাঁজ। হঠাৎই তার সঙ্গে মেয়েটির চোখাচোখি হয়ে গেল। একই হাসি তাদের মুখে, দুজনেই অপ্রতিভ হয়ে চোখ সরিয়ে নিল। তাহলে ওর নাম ঊর্মি, নিশ্চয়ই ঊর্মিলা।
‘এই বয়সেও কত রোমান্টিক!’ স্বামী বলল।
ঊর্মি আঙুল তুলে বাইরের দেওয়াল দেখাল। রোমান্টিক দম্পতির হাত কুড়ি দূরে কার্নিস থেকে ঝুলছে তিনটি ছোটো-বড়ো মৌচাক। ভনভনিয়ে উড়ছে মৌমাছি।
‘কামড়াবে না, ওরাও প্রেমিক। চলো ওদিকে মোতি মসজিদ, দিওয়ান ই আম, দিওয়ান ই খাস, শীশমহল আরও কী কী যেন রয়েছে।’ স্বামী যাবার জন্য পা বাড়াল।
‘আর একটু।’ তাজমহলের দিকে মুখ ফেরাল ঊর্মি। সহদেব কয়েক মুহূর্তের জন্য ওর চোখে বিষণ্ণতা দেখতে পেল বৃষ্টিভেজা বিকেলের আলোর মতো। একবার চোখের পাতা মুদল। হয়তো কিছু একটা মনে পড়েছে। বিয়ের আগেকার দিনগুলোকে কিংবা প্রাক্তন প্রেমিককে।
‘কী হল? আরে ড্রাইভার বলে দিয়েছে একঘণ্টা, খেয়াল আছে সেটা?’
সহদেব তাকিয়ে রয়েছে তাজমহলের দিকে। চোখের কোণ দিয়ে দেখল ঊর্মি চলে যাচ্ছে স্বামীর সঙ্গে। তার মনে হল ওদের সঙ্গ নেওয়ার কোনো মানে হয় না। ওরা নিশ্চয়ই লক্ষ করবে পিছনের সিটের লোকটা তাদের পিছনে লেগে রয়েছে, কিন্তু কেন? এটা নিয়ে হয়তো নিজেদের মধ্যে কথা বলবে, হাসাহাসিও হতে পারে। সে ঘড়ি দেখল, সানগ্লাসটা চোখে পরল এবং আবার পকেটে রেখে বাসের উদ্দেশে দ্রুত ফিরে চলল। তার খিদে পেয়েছে।
