মেয়েটির টিনের দরজা বন্ধ করা পর্যন্ত সে ওকে লক্ষ করল। পরিচয় করে নেওয়াটা খুব শক্ত কাজ নয়। কিন্তু নিছক সৌজন্যতার স্তর থেকে যদি কথাবার্তা স্বচ্ছন্দভাবে না নামে অর্থাৎ গায়েপড়া হয়ে তাকে যদি কথা বলে যেতে হয় তাহলে আলাপ না করাই ভালো। এরপরও একটা খিঁচ আছে, মেয়েটির স্বামী। লোকটা তাকে অপছন্দ করে উপেক্ষা দেখাতে পারে। এই সকালবেলাতেই মদ খাওয়াটা যে বউ পছন্দ করেনি তা তো কথা থেকেই বোঝা গেছে। বউকে ভালোবাসলে নিশ্চয় এটা করত না। মেয়েটি বাস থেকে নেমে এল, লোকটা সঙ্গ দিতেও নামেনি। উচিত ছিল। বউ-এর আলাপীর সঙ্গে ভালোভাবে নাও কথা বলতে পারে।
সহদেব বাসের দিকে তাকিয়ে দেখল লোকটি এখন জানালার ধারের সিটে উঠে এসেছে। হাতে প্লাস্টিকের গ্লাস। আবার খাচ্ছে! যেন সকালবেলা মদ খাবার জন্যই বাস-এ চড়ে আজ তাজ দেখার প্রোগ্রামটা নিয়েছে। বউকে অফার করেছিল, তার মানে মেয়েটিও খায় কিন্তু শোভনতা বজায় রেখে। লোকটা আজ অন্তত না খেলেও পারত। সকাল থেকে রাত, মদ না খেয়ে কী থাকা যায় না, নিজের সম্মানের কথা ভেবেও?
সহদেবের মনে হল, এই একটা ব্যাপারের মধ্যে দিয়েই ওই লোকটার হালকা, বেপরোয়া, মোটা অনুভূতির চরিত্রটা ধরা পড়েছে। এক লোকের মধ্যে এতগুলো ঘণ্টা এই ছোট্ট জায়গার মধ্যে ঘেঁষাঘেঁষি করে থাকলে কেউ না কেউ জেনে যাবেই, ফ্লাস্ক থেকে বিশুদ্ধ জল খাওয়ার ভান যতই হোক না কেন। গা টেপাটেপি, হাসাহাসি অথবা গজগজ আপত্তি হতে থাকলে বউ যে একটা অসম্মানকর অবস্থায় পড়বে, সেই বোধটাই কী নেই? অথবা আছে কিন্তু গ্রাহ্য করে না।
এটার মধ্য দিয়েই ওদের সম্পর্কটা এখন কোথায় অবস্থান করছে সেটা আন্দাজ করা যায়। বেশিরভাগ স্বামী-স্ত্রী বিয়ের বছর পাঁচেকের মধ্যেই তো এইরকম জায়গায় পৌঁছে যায়। তারপর দুজনেই আবিষ্কার করে তারা ভুল করেছে। এটাও কী সেইরকম ভুল আবিষ্কার করার মতো ব্যাপার?
মেয়েটি বেরিয়ে এল। মুখে জল দিয়েছে, অর্থাৎ মেক-আপ করেনি। ব্যাগ থেকে একটা রুমাল বার করে মুখ মুছতে মুছতে এগোল কফি কাউন্টারের দিকে। সহদেব মুখ ফিরিয়ে রাস্তার দিকে তাকাল। তিনতলা উঁচু আখ বোঝাই দুটো ট্রাক যাচ্ছে। পিছনেও একটা ট্র্যাক্টর তার ট্রেলারেও বোঝাই আখ। কিছু লোক বাসে ফিরে গেছে। লোকটা সিটে মাথা রেখে মুখটা ছাদের দিকে তুলে। হয়তো ঘুমিয়ে পড়েছে।
মেয়েটি কাপ হাতে সামনের ফাঁকা টেবলটায় বসল। পায়ের উপর পা তুলে। দুটো স্ট্র্যাপের পাতালা বাদামি রঙের চটি। পায়ের নখে রং এবং দুই আঙুলে লাল-সবুজ মিনে করা রুপোর আঙট। সহদেব সোজা তাকালেই ওকে দেখতে পাবে পাঁচ-ছয় ফুট দূরে। সানগ্লাসটা সে চোখ থেকে খুলে ফেলল। এত কাছে চোখে এটা পরে বসে থাকলে মেয়েটি বদস্বভাবের লোক বলে মনে করতে পারে।
এধার ওধার তাকাতে তাকাতে ও একবার সহদেবের মুখের দিকেও তাকাল। তারপর ঘাড়টা নীচু করে কাপে চুমুক দিয়েই মুখ কোঁচকাল। কাপটা টেবলে রেখে দিল। সহদেব হাসল।
বাঁ হাতটা টেবলে রেখে একদৃষ্টে ও কাপটার দিকে তাকিয়ে রয়েছে। দুটো টাকা জলে যাওয়ার দুঃখে নিশ্চয় কাতর হয়ে পড়েনি। কিছু একটা ভাবছে। সহদেব অনুমান করার চেষ্টা করল। কিছু একটা খচখচ করছে মনের মধ্যে, নয়তো সামান্যক্ষণের জন্য একা হয়েই চিন্তায় ডুবে যাবে কেন? খুব নিকট অতীত বা নিকট ভবিষ্যৎ নিয়ে মানুষ এভাবে অন্যমনস্ক হয়, বর্তমান নিয়ে নয়। নিজেকে নিয়ে বা অন্যের জন্য দুর্ভাবনা? কোনো বিপদ হতে পারে বা ঘটে গেছে? ওর চোখে সুখ বোধ করার আভা নেই।
একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও কাপটা মুখের কাছে তুলল আর সেই সময়ই বাসের হর্ন বেজে উঠল। দুবার। মেয়েটি প্রায় চমকে উঠে কাপটা টেবলে রেখে উঠে দাঁড়াল। ভালোভাবে একটা চুমুকও দেয়নি। দ্রুত বাসের দিকে ও এগোতেই সহদেব উঠে দাঁড়াল। সে তার কাপ শেষ করেছে।
মেয়েটির পিছনেই ও বাসে উঠল। কোনো সেন্টের গন্ধ পেল না। জানালায় সিটে লোকটি চোখ বন্ধ করে ছিল, মেয়েটি তাকে সিট বদল করতে না বলে খালিটায় বসে পড়ল। সহদেবের প্রতিবেশী অনুরোধ করার আগেই উঠে পড়ল। একগাল হেসে। অস্ফুটে ‘থ্যাঙ্কস’ বলে সে নিজের জায়গা নিল।
বাসের গতি এবার আরও বেড়েছে এবং সেটা রক্ষিতও হচ্ছে। রাস্তা ফাঁকা, ঝাঁকুনি নেই, এঞ্জিনের একটানা একঘেয়ে শব্দে যাত্রীদের তন্দ্রা লাগছে। বিশেষ করে জানালার ধারে বসার জন্য চোখে বাতাসের চাপ পড়ায় প্রায়ই চোখ বুজিয়ে ফেলার দায় এড়াতে সহদেব ছোট্ট একটা ঘুম আদায়ের চেষ্টা করল। ঘুম এলো না। মাঝে মাঝে চোখ খুলে সে বাইরে তাকাচ্ছে।
একসময় দেখল আকাশে ধোঁয়ার কুণ্ডলি পাকিয়ে উঠছে। মনে হল কোনো দাহ্য পদার্থের গুদামে আগুন লেগেছে। সে অবাক হয়ে জানলা দিয়ে মুখ বার করে দেখল লম্বা একটা সরু চিমনি দিয়ে আগুন উঠছে। দিনের বেলাতেও আকাশটা গোলাপি আর পাক দিয়ে দিয়ে ধোঁয়া উঠে ছড়িয়ে যাচ্ছে।
‘মথুরা অয়েল রিফাইনারিজ, দেখবে তো উঠে জানালা দিয়ে মুখ বাড়াও।’ সামনের পুরুষটি বলল।
‘এ আর দেখার কী আছে।’ নিস্পৃহ স্বরে প্রত্যাখ্যান।
সিটের ফাঁক দিয়ে সহদেব দেখল মেয়েটি মুখ নামিয়ে একটা কী যেন পড়ছে।
‘রেগে আছ?’
