বাস ছাড়ার সময় সে হাত নাড়ল শ্যামলের উদ্দেশ্যে। একমাত্র তাকেই বিদায় জানাতে একজন হাজির। সহদেবের মনে হল তাজমহল দর্শনার্থীদের সবাই দিল্লির বাইরের লোক। এদের মধ্যে বাংলায় কথা বলে কজন? পাশের জন্য বাঙালি নয়। চোখের সামনে দেওয়ালের মতো দুটো চেয়ারের পিছন, যার উচ্চচতা উপবিষ্টদের মাথা ছাড়িয়ে উঠে আছে। তার অবস্থানটা একটু কোণঠাসাই। একমাত্র বাঁদিকের জানলাটা ছাড়া আর কোনোদিকে চোখ রাখা যাচ্ছে না। ইংরেজি খবরের কাগজটা সে মুখের সামনে খুলে ধরল।
কিছুক্ষণ পরেই সে দেখতে পেল চোখ রাখার আরও একটা জায়গা আছে!
কাগজটা সে নামিয়ে নিল সামনের সিটে দুজনের কথা কানে আসায়।
‘দশটাতেই শুরু করে দিলে?’
‘হ্যাঙ্গওভার কাটাতে…কাল বড্ড খাওয়া হয়ে গেছে। …তুমি একটু?’
‘না।’
একটু কঠিনই শোনাল মেয়েটির ‘না’। স্বরটি গভীর ও চাপা। তাহলে বাঙালি। দুটো সিটের মাঝে ইঞ্চি তিনেক ফাঁক। দুজনের কাঁধ, গলা এবং মুখের পাশ সহদেব দেখতে পাচ্ছে। পুরুষটির এক হাতে ফ্লাস্ক অন্য হাতে প্লাস্টিকের সাদা গ্লাস। মুখ উপরদিকে তুলে চোখ বন্ধ করে। মেয়েটি জানালার দিকে মাথা হেলিয়ে। সম্ভবত জিন খাচ্ছে। স্বামী-স্ত্রী। বিয়ে সদ্য নয়, হনিমুন নয়, প্রেম করেই বোধহয়।
সে কাগজটা আবার তুলে ধরার আগে দেখল স্বামী অর্থাৎ পুরুষটি এক ঢোকে গ্লাসটা শেষ করে চোখ খুলল।
‘বাইরে কিছু কি দেখার আছে?’
‘আছে।’ আবার কঠিন স্বর।
সহদেব বাইরে তাকাল। একতলা বাড়িই বেশি। কংক্রিট আর ইটের কিন্তু এত নোংরা আর কদাকার। প্রায় বস্তির মতোই। দোকান আর দোকান, ট্রাক আর লরি। সাইনবোর্ড থেকে জানল এখন তারা ফরিদাবাদে।
বোধহয় মান-অভিমানের মতো কিছু একটা চলছে। মেয়েটি যথেষ্টই রেগে রয়েছে। কাল বেশি খেয়ে হয়তো কিছু একটা কেলেঙ্কারি করেছে…..বমি! বউকেই পরিষ্কার করতে হয়েছে। কিংবা একঘর লোকের মাঝে দড়াম করে পড়ে, বেহুঁশ হয়ে থাকে। বউকেই ধরাধরি করে বাড়িতে নিয়ে যেতে হয়েছে।
‘কাল ফ্লাইট কটায়?’ মেয়েটির গলা।
‘কেন, বাড়ির জন্য মন কেমন করছে?…ভোরে উঠতে হবে তো? ঠিক উঠে পড়ব।’
একটু পরে।
‘কী খাবার এনেছ? আমি কিন্তু কিছু খাব না।’
‘কিছু আনিনি।’
‘সারাদিন উপোস!’
উত্তর হল না। সহদেবের পাশের যাত্রীটির মাথা বুকের দিকে ঈষৎ ঝোঁকানো। এরও বোধহয় রাতে ঘুম হয়নি। সহদেব কাগজ মুড়ে চোখ বন্ধ করল। অত ভোরে ওঠা তার অভ্যাস নেই। চোখ ভারভার লাগছে। বাস ঘণ্টা আড়াই মাত্র চলেছে, এর মধ্যেই ঝিমুনি আসছে।
চটকা ভাঙল বাস দাঁড়িয়ে পড়ায়। একটা ধাবা। বাইরে সাইনবোর্ড। একটা প্রাঙ্গণ তাতে গোটা দশেক ছোটো টেবল আর প্রতি টেবলে চারটে করে চেয়ার, একটি প্লাস্টিক জলপাত্র, কয়েকটি প্লাস্টিক গ্লাস। বাস থেকে সব যাত্রীই প্রায় নামল। সুশ্রী এক যুবক তাদের হাত নেড়ে নেড়ে ভিতরের একটা ঘরে যাবার পথ দেখিয়ে দিচ্ছে যেখানে তারা বসতে পারে। অবশ্যই সেটা খাবার ঘর।
সহদেব জানালা দিয়ে দেখতে পেয়েছে যা সে খুঁজছিল। ‘জেন্টস’ আর ‘লেডিজ’ লেখা দেওয়ালটা ধাবা থেকে দশ-বারো মিটার পাশে। দেওয়াল ঘেরা, চালবিহীন একটা জায়গা। বাইরের দেওয়ালে একটা বেসিন আর কল।
সহদেবের পাশের যাত্রী বাস থেকে নেমে গেছে। একমাত্র তার সামনের দুজন ছাড়া বাসটা ফাঁকা। সহদেব ওদের পাশ দিয়ে দরজার দিকে যেতে গিয়ে চকিতে আড়চোখে তাকল। মেয়েটি উৎসুক চোখে ধাবার দিকে তাকিয়ে, পুরুষটির চোখও বাইরে তবে ব্যাজার দৃষ্টিতে।
‘জেন্টস’ লেখা জায়গাটা থেকে বেরিয়ে আসার পর সে খাদ্যদ্রব্যের তালিকায় দামগুলো পড়ল।
টেবলগুলোর দিকে তাকিয়ে দেখল অনেকেই শুধু চা বা কফি খাচ্ছে। ওমলেট এবং পনির মটর নিয়ে একটা টেবলে পাঁচজনের একটা দল। দশ-এর মধ্যে বয়স তিনটে ছেলেমেয়ে, এক বৃদ্ধা আর স্কার্ট পরা, ঘোর কৃষ্ণবর্ণ, মুখে নানান রঙের প্রসাধনীমাখা এক স্ত্রীলোক। যার কাঠির মতো হাত-পা।
সহদেব দু টাকা দিয়ে ছোটো একটা নোংরা চিনেমাটির কাপ নিল যাতে প্রচুর চিনি দেওয়া গরম জলের সঙ্গে কফির মতো একটা কিছু মেশানো রয়েছে। কাপটা নিয়ে একটা চেয়ারে বসে সে ওই পরিবারটায় নজর দিল। চোখে পড়ার মতো লাল কালো নীল হলুদ রঙের ঝলমলে সিন্থেটিক পোশাক। স্ত্রীলোকটির চুল ঘাড় পর্যন্ত। তাতে নাইলনের ফুল কানের উপরে। দুটি টকটকে লাল কানপাশা, কীসের তৈরি কে জানে। গলায় সরু সোনার চেন থেকে একটা ক্রস ঝুলছে। তার মনে হল পরিবারটি কেরল থেকে এসেছে। অনেক টাকা স্ত্রীলোকটির হাতে। নিশ্চয় কোনো আরব দেশে ওর স্বামী চাকর বা মজুরের কাজ করে আর দেশে টাকা পাঠায়। বাচ্চচা তিনটি ওরই, বৃদ্ধাটি বোধহয় মা অথবা শাশুড়ি। উত্তর ভারত ভ্রমণে বেরিয়েছে।
সহদেবের অনুমানচর্চায় ছেদ পড়ল। গেরুয়া সালোয়ার-কামিজে এখন বুকের উপর সবুজ দোপাট্টা। কাঁধ থেকে ঝুলছে বাস কন্ডাক্টরদের মতো একটা চামড়ার ব্যাগ। তবে আকারে একটু বড়ো। সটান হয়ে হাঁটার ধরনে নিজের উপর প্রত্যয়টাই ঘোষিত হচ্ছে। মেয়েটি সোজা ‘লেডিজ’ লেখা দেওয়ালের দিকে এগিয়ে গেল। ওখানে টিনের দরজার বাইরে দুজন অপেক্ষা করছে। শ্যামলের সানগ্লাসটা যে খুবই কাজের সহদেব এখন তা বুঝতে পারল। আড়চোখেও আর তাকাবার দরকার হচ্ছে না। দেহের সঙ্গে এঁটে থাকা কামিজটা অবশ্যই দর্জি দিয়ে বানানো। লম্বা ছিপছিপে। চওড়া কাঁধ থেকে নেমে আসা পিঠ ঈষৎ সরু হয়ে কোমরের কাছে ধাক্কা খেয়ে চমকে উঠেই হুমড়ি দিয়ে গড়িয়ে গেছে। সহদেবের দৃষ্টি শুধু একটি কোনো জায়গায় নয়, মেয়েটির দেহকে সামগ্রিকভাবে ধরল। দেখতে দেখতে তার ইচ্ছা করল মেয়েটির সঙ্গে পরিচিত হতে।
