শ্যামল রান্নাঘরে ফিরে গেল। নীচু হয়ে আধখাওয়া গ্লাসটা খাটের নীচে মেঝেয় রেখে সহদেব টানটান হয়ে বিছানায় শুল। বেশি বকা হয়ে গেছে, অবশ্যই অ্যালকোহলের প্রভাবে। কিন্তু আর নয়। তাজমহলের মতো একটা জিনিস কাল দেখতে যেতে হবে। সে জন্য মনটাকে পরিচ্ছন্ন অন্যরকম করে রাখা দরকার।
কিছুক্ষণ পর শ্যামল তাকে ধাক্কা দিয়ে জাগিয়ে বলল, ‘খেতে চলুন।’
চার
সহদেবকে নিয়ে অটোরিকশায় মিনিট চারেকেই নেহরু প্লেসে পৌঁছে শ্যামল বলল, ‘ফেরার সময় এইখানেই নামবেন, অটোরিকশা ধরে আমার ওখানে চলে আসবেন। রাতে একসঙ্গে খাব।’ আর এই সানগ্লাসটা রাখুন। এখনকার রোদ বড়ো চড়া, বাইরে তাকালে চোখ জ্বালা করে।’ ঠিকানাসহ ‘গ্লোব ট্র্যাভেলার্স’ লেখা রয়েছে সাদা বাসের গায়ে এবং লম্বা একটা বোর্ডে ছাদেও।
বাসের নম্বরটা রসিদে লিখে দিয়েছিল, সুতরাং পেট্রল পাম্পে অপেক্ষমাণ বাসটিকে সহজেই চিহ্নিত করা গেল। লাক্সারি বলতে পুরু গদির সিট। যার পিঠটা পিছন দিকে ইচ্ছা করলে কিছুটা হেলিয়ে দেওয়া যায়। বাসটা প্রায় নতুনই।
কখন ছাড়বে জানার জন্য শ্যামল ড্রাইভারের সহকারীকে জিজ্ঞাসা করে এসে বলল, ‘দিল্লির দু-তিনটে পয়েন্ট থেকে প্যাসেঞ্জার তুলে একটা পিক-আপ বাস আসবে। তারপর ছাড়বে। আপনি কী এখুনি উঠে বসে থাকবেন নাকি একটু চা খেয়ে নেবেন?’
‘সিটটা জেনে নিলে ভালো হয়।’
শ্যামল পিছনের কাচের পাল্লাটা দেখিয়ে বলল, ‘জেনে নিয়েছি, একদম শেষে জানালার ধারে। থলেটা আর ওয়াটার বটলটা বরং রেখে দিয়ে আসি।’
জিনিস দুটো রেখে দিয়ে শ্যামল বাস থেকে নেমে বলল, ‘সব সিটই প্রায় ভরা, আপনার পাশেরটা খালি রয়েছে, বোধহয় পিক-আপে আসবে।’
সহদেব গোটা বাসটার উপর চোখ বোলাল। ত্যাবড়াতোবড়া, রং-চটা, খোঁচা বার করা কলকাতার প্রতিদিনের বাসের মতো নয়। এটা তাকে খুশি করল। সুশ্রী, নিটোল, মসৃণ এবং উজ্জ্বল এমন চেহারার বাসে চড়ে যেতে আরামই লাগবে এমন একটা ধারণা তৈরি হওয়ায় সে স্ফূর্তি পেল।
জানালার কাচের পাল্লাগুলো সরিয়ে দিয়ে যাত্রীরা অপেক্ষা করছে। মুখগুলোর দিকে তাকিয়ে অবশ্য তার স্ফূর্তিটা বাড়ল না। বয়স্ক গেরস্ত, ভারিক্কি, সংসার সামলাতে ব্যতিব্যস্ত, এইসব লোকেরাই যেন বেশি। তার ঠিক সামনের সিট দুটোয় এক তরুণ দম্পতি। মেয়েটি গম্ভীরমুখে একটা কিছু পড়ছে, পুরুষটি কলা খাচ্ছে। দুজনের মুখ ভালোভাবে দেখা না গেলেও তারুণ্যের সান্নিধ্যে থাকবে জেনে সে প্রসন্নতা ফিরে গেল।
রাস্তার ধারে চৌকিতে চায়ের দোকান। ভাঁড়ে চা খেতে খেতে সহদেব লাজুক স্বরে বলল, ‘জান শ্যামল, আমার বাইশ বছরের ইচ্ছেটা আজ পূর্ণ হতে চলেছে। এতকাল শুধু ছবিতে আর সিনেমার পর্দায় দেখেছি।’
‘এর পরের বার যখন আসবেন বাহাইদের লোটাস টেম্পলটা দেখে নেবেন। এই তো, পাশের এই রাস্তাটা দিয়ে মিনিট দশেক হেঁটে গেলেই …খুব ভালো লাগবে। দেখতে শ্বেতপদ্মের মতো, তাকে ঘিরে বিশাল ফুলের বাগান। শান্ত, নির্জন। যেকোনো ধর্মের, জাতের লোক গিয়ে চুপচাপ বসে নিজের ভগবানকে স্মরণ করতে পারে। …ওখানে গেলে ধ্যান করতে ইচ্ছেও হবে।’
‘আমি তো একেবারেই নাস্তিক, তবে তোমার কথা শুনে মনে হচ্ছে মন্দিরটা দেখা উচিত। সুন্দর আর্কিটেকচারাল ওয়ার্ক দেখতে তো ভালোই লাগবে। দেখি আবার কবে-।’
একটা বাস এসে থামল। জনা চারেক লোক নেমে অপেক্ষমাণ বাসটার দিকে এগোলর্।
‘সহদেবদা এবার আপনার বাস ছাড়বে, বাকি প্যাসেঞ্জাররা এসে গেছে।’
কী যেন তার মনে হওয়ায়, সহদেব সানগ্লাসটা পরে নিল। একটা হালকা স্নিগ্ধতা চোখে নিয়ে সে বাসে উঠল। দরজা দিয়ে উঠে বাঁ দিকে লম্বা সিট, যাতে চারজন বসতে পারে। ডানদিকে দুটো সারির মাঝ দিয়ে যাবার সময় যাত্রীদের মুখগুলো দেখে নিতে নিতে চোখটা এক সেকেন্ড বেশি রইল তার সামনের সিটে জানালার ধারে বসা মেয়েটির মুখে।
‘এক্সকিউজ মি।’
প্রৌঢ় লোকটি মুখ তুলে সহদেবের দিকে তাকিয়ে সিট থেকে উঠে বেরিয়ে এল। নিজের সিটে বসার জন্য দেহটাকে বাঁকিয়ে ঢোকার সময় সহদেব দুজনের মাথার উপর দিয়ে নজর বুলিয়ে নিল। পুরুষটি ফর্সা, টিকোলো নাক, চওড়া শক্ত চোয়াল, চওড়া কবজি, সোনালি ধাতুর ব্যান্ডে ভারী ঘড়ি, নীল টি-শার্ট, খয়েরি ট্রাউজার্স। চাঁদিতে টাকের ক্ষীণ আভাস। পেটের কাছটা ফুলে রয়েছে! এই বয়সেই ভুঁড়ি! বয়সটা পঁয়ত্রিশের কাছাকাছি। পুরুষটির তুলনায় মেয়েটির জৌলুস অনেক কম। উজ্জ্বল শ্যাম টেনেটুনে বলা যায়। সরু গলা, লম্বাটে মুখ, মোটা ভুরু। সামগ্রিক গড়নটাই রোগাটে। কবজিতে পুরুষ ঘড়িটা কালো চামড়ার ব্যান্ডে। লাল সবুজ ফুলের এমব্রয়ডারি কামিজে। কপালটা একটু উঁচু এবং সর্ষেদানার মতো হিরের নাকছবি যে নাকটিতে সেটি মাঝখানে চাপা কিন্তু ডগাটি তোলা। চুল আলগা খোঁপায় বাঁধা। সহদেবের মনে হল মেয়েটি বেশ লম্বা, সাড়ে পাঁচ ফুটেরও বেশি হতে পারে। বয়স পঁচিশ-ত্রিশের মধ্যে।
‘থ্যাঙ্ক-ইউ।’ নিজের সিটে বসে সহদেব পাশের প্রৌঢ়কে বলল।
লোকটি দুদিকে মাথা নেড়ে, ‘অলরাইট, অলরাইট, নিড নট মেনশন।’ বলে হাসল। ভালো দাঁত, একদিনের কাঁচাপাকা দাড়ি, মোটা কালো ফ্রেমের চশমা, সাদা হাফ শার্ট, ধুতির লুঙ্গি। অবশ্যই দক্ষিণ ভারতীয়। তবে কেরলের না তামিলনাড়ুর কথা বললেও সে বুঝতে অক্ষম। দেখে মনে হচ্ছে শিক্ষক বা হোমিওপ্যাথ। একাই।
