বাড়িতে থাকতে ইচ্ছে করে না বলেই সে যতটা পারে বাইরে থাকে। এজন্য পড়ার বা লেখার সময়টা অনেক কমে যায়। এজন্য তার খেদ আছে। সেই খেদ জমে জমে হয়তো এখন মুখের কোথায় একটা ভাঁজ তৈরি করার কাজে ব্যস্ত।
‘বুঝলেন সহদেবদা,’ গ্লাস হাতে শ্যামল ঘরে এল, সহদেবের হাতে সেটা ধরিয়ে বলল, ‘অ্যাকসিডেন্ট হবে না কেন, বাইশ হাজার কোটি টাকা দরকার সারা ভারতবর্ষের রেলের ট্র্যাক বদলাতে। এরকম অবস্থা হল কেন?’
সহদেব ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে বুঝিয়ে দিল উত্তর সে জানে না।
‘খুব সোজা…কবেকার সেই পুরোনো লাইন, পুরোনো সিগন্যালিং, কিছুই মেইনটেন্ড হয়নি, বদলানোও হয়নি। চলছে, চলুক, কাজ তো চলে যাচ্ছে! এই মেন্টালিটির ফল এখন ফলছে।…দেখুন না, বৃষ্টি হলেই কলকাতার রাস্তা খালবিল হয়ে যাচ্ছে। আদ্যিকালের ড্রেনেজ ব্যবস্থা, যুগ যুগ ধরে পরিষ্কার করা হয়নি। ওই, চলে তো যাচ্ছে মেন্টালিটি! ভবিষ্যতে জনসংখ্যা বাড়বে তার ফলে চাপও বাড়বে আর সেই মত বদলাতে হবে বাড়াতে হবে, সেটা আর আমাদের মাথায় আসে না। যা চলে আসছে সেটাই চলুক, বদল করতে গেলে একবার থমকে দাঁড়াতেই হবে, আমরা ওটাকেই ভারি সর্বনাশ হয়ে গেল বুঝি।….এই গ্লাসটা শেষ হলেই কিন্তু খেতে বসব।’
সহদেব, ‘হ্যাঁ, খেতে বসব’ বলে বিছানায় এসে বসল। ‘এই মেন্টালিটিটা এল কোথা থেকে?’
শ্যামলকে একটু বিব্রত দেখাল। এই রকম বিষয়ের প্রশ্নে একশো উত্তর হয়। কিন্তু প্রশ্নকারীর নিজস্ব একটা উত্তর থাকবে যেটা অবশ্যই উদ্ভট ধরনের হবে। সহদেব অবশ্য দশ সেকেন্ডের বেশি শ্যামলকে অস্বস্তির মধ্যে রাখল না।
‘আমি যখন পারিবারিক জীবনকে দেখি তখন বুঝতে পারি অনেক কিছু সামাজিক বোধ, চেতনা বা এখনকার দিনে অচল, হাস্যকর, ক্ষতিকরও, সেগুলো বদলানো দরকার। কিন্তু বুঝেও আমি বদলাবার জন্য চেষ্টা করি না। চলছে চলুক, আমার আর কী? এই মেন্টালিটি আমার মধ্যেও রয়েছে।’
‘রাম খেয়ে দেখছি আপনি আত্মসমালোচক হয়ে পড়ছেন।’
‘মাঝে মাঝে যারা খায় তাদের এইরকমই হয়। মেয়ের পোলিও সারাবার জন্য শমি মানত, পুজো, কোথায় গিয়ে যেন গাছে ইটও বেঁধে এল। মেয়ের কোমরে একদিন একটা মাদুলি দেখে রেগে গিয়ে আমি সুতোটা কেটে দিলুম। অবৈজ্ঞানিক জিনিস সহ্য করা মানে নিজের শিক্ষাদীক্ষাকে অপমান করা। কিন্তু শমি এসে চেঁচিয়ে যাচ্ছেতাই করে আমাকে বলল, তার মেয়ের ভালোমন্দ সে বুঝবে। মেয়ের কল্যাণ কীসে হয় ভালো করেই সে তা জানে। বিদ্যুৎও আমাকে দুকথা শোনাল।’
‘আর আপনি টাকা দিয়ে এদের কাছে দুবেলা খান!’
‘ওইটের জন্যই ওদের সব চিৎকার, অপমান আমি মেনে নিলুম। তাহলে বাইরে হোটেলে খেতে হয়, তা আমি পারব না। অথচ এই শমির মুখ বন্ধ করার ওষুধ আমার কাছে আছে।’ সহদেব গলা নামাল, ঠোঁটদুটো চওড়া হল নিঃশব্দ হাসিতে। ‘কিন্তু সে ওষুধ আমি প্রয়োগ করতে পারব না। হাজার হোক বোন তো, বংশেরই মেয়ে।’
ওষুধটা কী, শ্যামল তা জানার জন্য আগ্রহ দেখাল না। দেখাবে না, সহদেব তা জানে। কিন্তু রক্ত চলাচলের এবং হৃৎপিণ্ডের বেগ বেড়ে গেছে। সে এখন অনেক কথা বলতে চায়। কাচের দরজার এধারে দাঁড়িয়ে থেকে থেকে সে বিরক্ত। একটা স্থায়ী ছায়া কাচে লেগে রয়েছে, সেটাকেই সে মুছে দিতে চায়।
‘জানো শ্যামল, বিদ্যুৎ ওর বউকে রাতে পেটাচ্ছিল, গালাগাল দিচ্ছিল, ‘খানকি মাগি’ বলে। আমারই বোন, তাই সহ্য করতে না পেরে নীচে নেমে গেলুম। এবাড়ি ওবাড়ি থেকে মুখ উঁকি দিচ্ছে। বাইরে আমার একটা মানসম্মান আছে। গিয়ে বিদ্যুৎকে একটা চড় মারলুম। ও কী বলল জান?…বলল, ‘আপনারা সব করাপ্ট। এই করাপ্টেড মেয়েটার সঙ্গে আমার বিয়ে দিয়েছেন অথচ বড়ো ভগ্নিপতির সঙ্গে ওর ইল্লিসিট রিলেশন ছিল, এখনও আছে। লোকটা মাঝে মাঝে দুপুরে আসে তা কী আপনি জানেন?’ দুপুরে বাড়ি থাকি না তাই এ সব কিছু জানিও না। কিন্তু আমায় কী বলল জানো? একটা কুমারী মেয়েকে বিয়ে করব প্রমিস করে তাকে আমি ভোগ করেছি তারপর ভাগিয়ে দিয়েছি। আশপাশের বাড়ির লোকেরা কথাগুলো শুনল!’
সহদেব পরপর দুটো চুমুক দিল। শ্যামল তাকে বাহু ধরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে বলল, ‘বসুন। আস্তে খান। অ্যাতো এক্সাইটেড হচ্ছেন কেন? বলেছে তো বলেছে। এ কান দিয়ে শুনে ও কান দিয়ে বার করে দেবেন।’
‘আমার বিদ্যেবুদ্ধি রুচির সঙ্গে মেলাতে পারি না। এদের মনে হয় সিক্সটিন্থ সেঞ্চুরির লোক। ইচ্ছে করে-‘সহদেব কথা খোঁজার জন্য থেমে গেল। কয়েক সেকেন্ড পর মন্থর স্বরে বলল, ‘ওই ইন্টারন্যাশনাল সেন্টারে ঘর থেকে বারান্দায় বেরোবার দরজাটা ঠেলাঠেলি করেও খুলতে পারিনি। খুব ইচ্ছে করেছিল একবার বারান্দাটায় গিয়ে দাঁড়াতে। …ইচ্ছেই শুধু হয়। খুব ইচ্ছে করেছিল আমার পাশে বসা সেই মহিলাটির নিতম্ব দেখতে, যিনি তার অজান্তেই সেক্সুয়ালি আমাকে খুঁচিয়েছিলেন।’ সহদেব হাসিতে মুখ ভরিয়ে তুলল।
‘খোঁচা খাওয়ার কথা জানিয়ে, আমি যে অ্যাডাল্ট, এটা আপনি স্বীকার করলেন।’
‘কেন, অস্বীকার করব কেন? চল্লিশের কাছাকাছি হয়েছ তো?’
‘বেশিই। তবে সহদেবদা, বাড়িটা আপনি ছাড়ুন। আর বিয়েও করুন। ভালো থাকবেন।’
‘কথাটা আগেও ভেবেছি তবে এবার সিরিয়াসলি ভাবব।’
