‘না না আমার নিজের বোন কোথায়, মাসতুতো বোন।’
তারক ব্যস্ত হয়ে প্রণবকে শুধরে দিল। মেজোমাসির ছোটোমেয়ে ইলাকে ভেবে রেখেছে সে। বছর তিন বোধ হয় দেখেনি, তখন শুনেছিল ক্লাস নাইনে পড়ে। অতএব এখন সে প্রেগনান্ট হবার মতো যুগ্যিমন্ত হয়েছে নিশ্চয়।
প্রণবকে আনমনা হয়ে জানালার বাইরে তাকিয়ে থাকতে দেখে তারক কণ্ঠস্বর ধীর ব্যথিত করে বলল, ‘ব্যাপারটা এমনই, ওরা যে কী করবে ভেবেই পাচ্ছে না। মিশতে দিয়েছিল খোলা মনে। ভেবেছিল বিয়ে তো হবেই, ঠিকও হয়ে গেছল এই ফাল্গুনে, দুম করে ছেলেটা অ্যাক্সিডেন্টে মারা গেল। তারপরই জানা গেল মেয়ে ইতিমধ্যে প্রেগনান্ট হয়ে গেছে। এখন অ্যাবোরশন ছাড়া আর কী উপায় আছে, তুই-ই বল?’
তারক ঝুঁকে রইল উত্তরের আশায়। প্রণব হয়তো বলতে পারে মিশতে দেওয়াটা অন্যায় হয়েছে। সেটা মেনে নেওয়া যাবে। বলতে পারে মেয়েটার দিক থেকে নিশ্চয় আশকারা ছিল বা সংযত হওয়া উচিত ছিল, বাপ-মা ঠিকমতো শিক্ষা দিতে পারেনি, তাও স্বীকার করে নেব। তারক ঠিক করেই রেখেছে কোনো তর্কের মধ্যে যাবে না।
জানালার বাইরে থেকে চোখ সরিয়ে প্রণব বলল, ‘পরিমল মারা গেছে জানিস?’
তারক প্রস্তুত ছিল না কথাটা শোনার জন্য। অবাক হয়ে বলল, ‘কে পরিমল?’
‘কলেজে আমাদের সঙ্গেই তো পড়ত। কবিতা লিখত, পরিমল ভটচায।’
তারককে তবু জিজ্ঞাসু চোখে তাকিয়ে থাকতে দেখে প্রণব বলল, ‘খুব নাম করেছিল, তিনখানা বইও আছে ওর। আমাদের ব্যাচে ওই একমাত্র যার নাম হয়েছে। কলেজে অবশ্য সবাই তোকেই চিনত।’
‘কী করে মারা গেল?’
এতক্ষণ ধরে বলা মাসতুতো বোনের সর্বনাশের কথা প্রণব যে কিছুই শোনেনি এতে তারক ক্ষুণ্ণ হল। তবু আগ্রহ না দেখালে প্রণব যদি ক্ষুণ্ণ হয় এই ভেবে আর একটু যোগ করল ‘ওঁর আছে কে?’
‘ক্যানসারে মারা গেল। বউ আর সাত বছরের একটা ছেলে ছাড়া আর কেউ নেই। কলেজের লেকচারার ছিল, কত আর মাইনে পেত। কাল একটা মিটিং আছে মহাবোধি হলে, যাবি?’
‘কীসের মিটিং?’
বলেই তারকের মনে হল জিজ্ঞাসা করাটা ঠিক হল না। কেউ মরে গেলে শোকসভা ছাড়া আর কী হতে পারে।
‘কালকে তো? যাবখন?’
মনে হচ্ছে প্রণব খুশি হল। তাইতে তারক মাসতুতো বোনের প্রসঙ্গ আবার তুলল, ‘তোর সেই ডাক্তারের কাছে একবার চল। মেয়েটা দুবার গলায় দড়ি দেবার চেষ্টা করেছিল। এখন সবসময় চোখে চোখে রাখতে হচ্ছে। কখন যে কী করে ফেলে। আত্মহত্যার এত জিনিস আজকাল হাতের কাছেই পাওয়া যায়।’
‘ডাক্তার শুনেছিলাম পুরী গেছে, ফিরেছে কি না খোঁজ নিতে হবে। পরিমলের মৃত্যুর খবরটা পাওয়ার পর থেকেই মনটা এত খারাপ হয়ে আছে!’
তারক বুঝতে পারছে না, ডাক্তারের পুরী থেকে ফেরার খবরটা নিতে বলার জন্য প্রণবকে এখন অনুরোধ করা চলে কি না। একটা মেয়ে মরতে চেষ্টা করেছে আর একটা লোক মরে গেছে, এই দুটি ঘটনার মধ্যে কোনটিতে মন বেশি খারাপ হয় এটা সে ঠিক করতে পারছে না।
‘তাহলে রাতে একবার খোঁজ করব?’
‘রাতে?’ প্রণব কড়িকাঠের দিকে তাকিয়ে কিছুক্ষণ ভেবে বলল, ‘কাল মিটিং-এ তো দেখা হবে, তখন তোকে বলব। আচ্ছা, তোর ছেলেটা কত বড়ো হল, স্কুলে ভরতি করিয়েছিস?’
‘চার বছর তো বয়েস, আর একটু বড়ো হোক। ভালো কথা, খরচ কীরকম পড়বে বল তো ওই ব্যাপারটায়?’
‘তা আমি কী করে বলব, ডাক্তার যা বলবে তাই।’
প্রণবের কণ্ঠস্বর, উদাস চোখে জানালার বাইরে মাঝে মাঝে তাকানো এবং অ্যাশট্রে থাকা সত্ত্বেও মেঝেয় সিগারেটের ছাই ঝাড়া থেকে তারকের মনে হল, প্রণব তাকে পাত্তা দিতে ইচ্ছুক নয়। অথচ এই প্রণব পাঁচ বছর আগে একদিন বাড়ি বয়ে এসে টেস্টম্যাচের সিজন টিকিট চেয়েছিল। তখনকার প্রণবের মুখ আর এই মুহূর্তের টি. সিনহার মুখ হয়তো একই রকম, যেমন, তখনকার টি. সিনহার মেজাজ আর এখনকার প্রণবের ঔদাসীন্যে কোনো তফাত নেই। সেদিন তারক শূন্যহাতে ফিরিয়ে দিয়েছিল। এবার হয়তো প্রণব তার শোধ নেবে। একটা বিরক্তকর টেস্টম্যাচ না-দেখার দুঃখের সঙ্গে একটা মেয়ের মরণ-বাঁচনের সমস্যাটা কি প্রণব মিশিয়ে ফেলবে?
তারক অতঃপর ভাবল, প্রণবকে আগ্রহী করে তুলতে হবে। বড্ড বেশি যেন শোকাচ্ছন্নের ভান করছে। পরিমল তিনটি বই লিখেছে এবং আমি একবছরে গড়ের মাঠে আটটা সেঞ্চুরি করেছিলাম। পরিমলের লেখা পদ্য পড়ার ইচ্ছে হলে দোকান থেকে বই কিনে আনলেই চলে, কিন্তু আমার সেঞ্চুরি মাঠে গেলেই আর দেখা যাবে না-এইজন্যই পরিমল খ্যাতনামা হয়ে থেকে যাবে। কিন্তু পদ্যের এক-একটা লাইন যেমন হঠাৎ মনের মধ্যে ঝিলিক দেয় তেমনি এক-একটা স্ট্রোকও কি দেয় না?
‘তোর মনে আছি কি, কালীঘাট মাঠে সুভাষ গুপ্তের একটা গুগলি ডেনিস কম্পটনের মতো হাঁটু ভেঙে সুইপ করেছিলাম?’ তারক আকুল চোখে তাকাল প্রণবের দিকে।
‘লিগের খেলায়!’ হঠাৎ এমন এক খাপছাড়া প্রশ্নে প্রণব অবাক।
‘হ্যাঁ। তুই গেছলি সে খেলাটা দেখতে। আমি লাঞ্চের সময় তোকে দেখেছি স্কোরারের ঘাড়ের উপর ঝুঁকে স্কোরবই দেখতে। তারপরেই আমাদের ব্যাট ছিল।’
প্রণব কিছুক্ষণ ধরে মনে করার চেষ্টা করল এবং হাল ছেড়ে দিয়ে বলল, ‘কী জানি। বোধহয় অন্য মাঠে চলে গেছলুম। তবে রঞ্জি ট্রায়ালের ম্যাচটা দেখেছি।’
প্রণবের চোখে যেন চাপাহাসি ঝিলিক দিল। অন্তত তারকের তাই মনে হল। সেই ট্রায়াল খেলার প্রথম ইনিংসে তারক প্রথম বলটা এগিয়ে খেলতে গিয়ে ফসকে যায়, বল প্যাডে লাগল। তার ‘আউট’ প্রার্থনা করে হুঙ্কার দিয়ে উঠল সারামাঠ। আম্পায়ারের যে কয়েকটি মুহূর্ত লেগেছিল সিদ্ধান্ত জানাতে, সেই সময়টুকুর মধ্যেই তারক দেখে মৃত্যুশয্যায় শায়িত একটি লোককে ঘিরে কিছু লোক উদবিগ্ন মুখে তাকিয়ে। আম্পায়ার মাথা নেড়ে নাকচ করার পর তারকের মনে হল সে ঠিকই ব্যাট পেতেছিল কিন্তু বলটা হঠাৎ ছিটকে সরে এল মাটিতে পড়ে। কারণ অনুসন্ধান করবে কিনা ভেবেছিল। কিন্তু করেনি। দ্বিতীয় বল সাবধানে পিছিয়ে খেলবে স্থির করে, ব্যাট ধরে যখন বোলারের দিকে তাকিয়ে তখন তার মনে হল প্রায় দু-গজ দূরে গুডলেংথে স্পটের উপর একটা কাঁকর। ছুটে আসা বোলারের থেকে লহমার জন্য চোখ সরিয়ে তারক সেই দিকে তাকিয়েছিল। তখন একবার মনে হয়েছিল, বোলারকে থামিয়ে পিচে কাঁকর আছে দেখে নেব কিনা! সিদ্ধান্ত নেবার আগেই বলটা পড়ল গুডলেংথ স্পটে এবং একচুলও না উঠে, মাটি ঘষড়ে এল। ব্যাট নামাবারও সময় সে পেল না। উইকেটকিপার ছিল তপন ঘোষ। ফ্যাল ফ্যাল করে ভাঙা উইকেটের দিকে তাকিয়ে থাকা তারককে বলেছিল, ‘সেকেন্ড ইনিংসতো আছে, ঘাবড়াসনি।’ অপর উইকেটে দাঁড়ানো নন-স্ট্রাইকার অরুণাভ ভটচাযের চোখে তারক যেন স্বস্তির ভাব ফুটে উঠতে দেখেছিল। তারক বাদ পড়লে অরুণাভেরই টিমে আসার কথা। উইকেট ছেড়ে আসার আগে তারক পিচের উপর ঝুঁকে সত্যি সত্যিই একটা মটর দানার মতো কাঁকর দেখতে পায়। সেটা খুঁটে তুলে নিয়ে প্যাভিলিয়ানে ফিরে আসতে আসতে তার মনে হয়েছিল-যদি আগেই এটাকে তুলে ফেলে দিতাম। আমার দ্বিধা-ই আমার সর্বনাশের কারণ হল। আর বোধহয় আমি টিমে আসতে পারলাম না।
