শ্যামল ঘরে এসে খালি গ্লাসটা তুলে নিয়ে যাবার সময় বলল, ‘বেশি জল দিয়েছিলাম, এবার কী একটু কম দেব?’
সহদেব সম্মতি জানিয়ে মাথা হেলাল। শ্যামল ব্যস্তভাবে রান্নাঘরে ফিরে গেল।
‘বাসুটা একেবারেই অন্যরকমের, এক ইঞ্চিও ছাড়তে রাজি নয়। দোতলায় একটা ঘর তালা মেরে রেখে দিয়েছে। একতলায় শমি দেড়খানা ঘর নিয়ে কেন থাকবে তাই নিয়ে বাসুর সঙ্গে ঝগড়া, আমার সঙ্গেও ঝগড়া। নীচের পুরোনো রান্নাঘরেই শমি রান্না করে। অধিকার ফলালে আমাদের তিনজনেরই তো তিনটে রান্নাঘর, দরকার, কল-পায়খানাও। বল তো-।’ হাত বাড়িয়ে গ্লাসটা নিয়ে সেটা চোখের সামনে তুলে, সহদেব রঙের গাঢ়ত্ব পরীক্ষা করল।
শ্যামল যাবার সময় বলল, ‘এবার একটু আস্তে খান।’ সহদেব জবাব দিল না। তার মধ্যে একটা রাগ ফেঁপে উঠতে চাইছে, এটা বুঝতে পেরে সে সাংসারিক কথাবার্তার বাইরে নিজেকে রাখবে ঠিক করল।
‘তুমি তো রাজধানীতেই যাওয়া আসা কর শ্যামল। লক্ষ করেছে, সময়টা বড়ো বেশি লাগছে?’
নিজের গ্লাস হাতে নিয়ে শ্যামল ঘরে এল। খাটে আধশোয়া সহদেবের পাশে টুলটা টেনে এনে বসল।
‘ভাত বসিয়েছি। বলছিলেন, সুপারফাস্ট রাজধানী এক্সপ্রেসের কথা? দেখুন, ঘণ্টায় একশো কি একশো দশ কিলোমিটার স্পিডে ট্রেন চালাতে গেলে রেলওয়ে ট্র্যাক, সিগন্যাল, আর কোচগুলোর যে মেইনটেনান্স দরকার সেটা একদমই করতে পারেনি। ফলে অ্যাকসিডেন্ট বেড়েছে, বেশি স্টেশনে থামতে শুরু করল পলিটিক্যাল প্রেসারে, ফলে স্পিড কমল। অথচ বাহাত্তর সাল থেকে টিকিটের দাম বাড়িয়ে চলেছে, টাকার লোভে কোচ-এর সংখ্যা বাড়িয়ে স্পিড আরও কমিয়েছে। এতে রেলের লাভ বেড়েছে। জানেন এখন ভারতে বাহাত্তরটা সুপার ফাস্ট ট্রেন আর তাদের অ্যাভারেজ স্পিড, শুনলে হাসবেন… পঁয়তাল্লিশ থেকে পঁয়ষট্টির মধ্যে! সুপারফাস্ট নাম দিয়ে টিকিটের উপর লেভি বসিয়ে রেল টাকা কামাচ্ছে, বছরে দশ কোটি টাকা! দেশের সবথেকে বড়ো মোনোপলি কীভাবে লোক ঠকাচ্ছে ভাবতে পারেন? না আছে স্পিড, না পাওয়া যায় সুখস্বাচ্ছন্দ্য।’
‘ক্যালাস, ক্যালাস, দেশের মানুষ ক্যালাস।’ সহদেব উত্তেজিত হয়ে গ্লাসে বড়ো চুমুক দিল। ‘পৃথিবীতে বহু দেশে এখন সুপার ফাস্ট ট্রেন চলে ঘণ্টায় তিনশো-চারশো কিলোমিটার স্পিডে আর ভারতে আশি কিলোমিটারের নীচে চললেই সেটা সুপারফাস্ট। এ দেশের কী কিছু হবে?’ সহদেব চোখ বিস্ফারিত করে উত্তরটা পাবার জন্য তাকিয়ে রইল।
শ্যামল ধীরে দুবার মাথা নাড়ল।
‘সুপারফাস্ট চালাবে বলে তুমি লেভি বসিয়েছ, তাহলে ঠিক সময়ে আমায় পৌঁছে দিতে হবে, এ জন্যই বাড়তি টাকা আমি দিচ্ছি। লেট করে পৌঁছে দিলে টাকাটা তাহলে ফেরত দাও! কেউ চায় না বলেই লেটে চালায়।’ সহদেব উঠে বসল, কথাটা বলে সে স্ফূর্তি বোধ করল। এই মেজাজটা তাকে ধরে রাখতে হবে। গ্লাস খালি করে শ্যামলের দিকে বাড়িয়ে ধরল।
শ্যামল উঠে রান্নাঘরে গেল। ছাদের খোলা দরজা দিয়ে সহদেব বাইরে তাকিয়ে ভাবল, রাজধানী যদি লেটে হাওড়ায় পৌঁছয় তাহলে কী সে রিফান্ডের জন্য দাবি জানাবে? ফেরত নিশ্চয়ই দেবে না, কিন্তু হইচই তোলা যাবে কি? যাবে না। এ দেশে এ সব নিয়ে কেউ মাথাই ঘামাবে না। আমিও কী ঘামাব? আবার কবে সুপারফাস্ট ট্রেনে চড়ব তার ঠিক নেই! ঘোরাঘুরি অবশ্য তার ভালো লাগে না। তাজমহল দেখার ইচ্ছেটা বহু বছরের তাই যাচ্ছে। সাহিত্য ভারতীর সম্পাদকের কথাটা, ‘স্বচক্ষে একবার দেখে আসুন’ প্রায়ই মনে না পড়লে তার কোনো আগ্রহই থাকত না।
গল্পটা এখনও কী র্যাকে ফাইলের মধ্যে আছে? পুরোনো জিনিস সাধারণত সে ফেলে দেয় না। কেয়া ওটা কী আবার নিয়ে গেছে? নিয়ে গিয়ে নিজের কাছে রেখেও দিতে পারে। সুভেনির! কাগজে বিজ্ঞাপন দেখেছিল। কেয়ার রাগপ্রধান গানের ক্যাসেট বেরিয়েছে।
‘কী হল শ্যামল?’ সহদেব তাগিদ দিয়ে উঠে গেল আয়নার সামনে।
‘ভাতটা নামিয়েই যাচ্ছি।’
চুলে একটা সাদা পটি, ঠিক সিঁথির উপর দিয়ে গেলে কী ভালো দেখাবে! কানের উপরে কয়েকটা মাত্র পেকেছে, কলপ দিলেই চুঁকে যাবে। সহদেব চুলচেরা বিচার করার জন্য মুখটাকে আয়নার আরও কাছে নিয়ে গেল। এবং তখনই তার চোখে ধরা পড়ল।
সে ক্লান্ত।
প্রতিদিন অফিসের বাঁধাধরা কাজ, কাগজের অফিসে সিনেমা-মঞ্চ বিভাগের বা পাবলিশারের ঘরে গিয়ে বসা, নাটক দেখা, বইয়ের দোকানে নতুন বই ওলটানো, লাইব্রেরিতে যাওয়া, থিয়েটারের কারুর বাড়িতে গিয়ে আড্ডা, রাত করে বাড়ি ফিরে পড়তে শুরু করা বা লেখার জন্য বসা আর দেরিতে বিছানা থেকে ওঠা। মোটামুটি এই গণ্ডিটার মধ্যেই তার যা কিছু সফর, যা কিছু দেখা, যা কিছু শোনা। খুবই ছোটো গণ্ডি তাই বহু বিষয়ে সে অল্প জ্ঞানসম্পন্ন লোকের সঙ্গেও কথা বলতে পারে না। এই যে শ্যামল সুপারফাস্ট ট্রেন নিয়ে এত বলল, এ সব তো সে জানতই না!
চোখের নীচে, চোয়ালে, গলার কণ্ঠায়, ঠোঁটের কোণে সে যা দেখছে সেগুলো একঘেয়ে জীবন থেকে থিতিয়ে থিতিয়ে জমে যাওয়া ক্লান্তি। চোখের সাদা অংশটা অনুজ্জ্বল, চাহনি নিষ্প্রভ। এইরকম চোখ শমি বা বিদ্যুতেরও নাকের দুপাশে সে দেখতে পায়। ওরা নিজেদের মধ্যে হাতহাতিও করে, চিৎকার তো নিয়মিতই।
