‘বেশ, কলিঃ নিজ বাড়ি…আর?’
‘সুশ্রী, উজ্জ্বল শ্যাম আর হাইটটা ফালতু। আসল খবরটা হল কেন্দ্রীয় সরকারের চাকুরে। তারপর গুরুত্ব পাবে বয়সটা, তারপর বিদ্যের বহরটা। এই তিনটেই সাফিসিয়েন্ট। আপনার ডিমান্ডগুলো ঠিকই দিয়েছেন, তবে সুশ্রী বা স্লিম বা ফরসা, এসব বায়নাক্কা কী জুড়বেন? কিংবা বুদ্ধিমতী কী উচ্চচশিক্ষিতা?’
‘না, না, বায়নাক্কা থাকবে কেন এই বয়সে? তাছাড়া বাত, অম্বল, ডিসপেপসিয়া, ফিটের বা মাথা ধরার ব্যামো, এর যে-কোনো দুটো-একটা থাকলে, যেটা বিয়ের পর জানতে পারব, তখন ফরসা আর সুশ্রী দিয়ে আমার কী হবে! আর বুদ্ধিমতী জিনিসটা একটু গোলমেলে ধরনের। ধরো আমার বোন শমি সাংসারিক ব্যাপারে খুবই বুদ্ধি ধরে, যেটা প্রায়শই স্বার্থপরতার পর্যায়ে চলে যায় অথচ এমন বোকামিও করেছে যা তাকে কানাগলির দিকে ঠেলে দিল।’
সহদেব খালি চায়ের কাপ শ্যামলের হাতে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। হালকা চালের কথাবার্তা ভারী দিকে চলে গেল এই ‘কানাগলি’ শব্দটায়। এটা ব্যাখ্যা করতে গেলেই গলার স্বর গম্ভীর করে ফেলতে হবে যেটা সে এখন চায় না। কিন্তু শব্দটা কীভাবে যেন মুখে এসে গেল।
শ্যামলের একটা বড়ো গুণ যেচে সে কৌতূহল দেখায় না। কেন বা কী ধরনের ‘কানাগলি’ এটা নিয়ে প্রশ্ন করল না। করলে সে কী সত্যি কথাটা বলত?
‘আপনি তাহলে সৎ!’
‘আলবাত।’
‘চানটা করে নিন।’
বাঙালি বাজারে চেয়ার টেবল পেতে টেলিফোন নিয়ে বসা যুবকটি শ্যামলকে বলল, ‘একটা সিট রেখেছি। টাকাটা পেলে কনফার্ম করে জানিয়ে দেব।’
‘কোথায় কোথায় বাস থামবে?’ শ্যামল জানতে চাইল। টেবলের পাশে জমিতে দাঁড় করানো লম্বা বোর্ডে কয়েকটা রুটের ও দ্রষ্টব্য জায়গাগুলোর নাম লেখা।
‘যাবার সময় আগ্রা ফোর্ট, তাজ, ফেরার সময় সেকেন্দ্রা মথুরা আর বৃন্দাবন। ফিরতে ফিরতে রাত আটটা-নটা হয়ে যাবে।’
টাকা দিয়ে সহদেব বিল পেল। যুবকটি টেলিফোনে কার সঙ্গে যেন হিন্দিতে কথা বলে সহদেবকে জানাল, ‘পিছনে জানালার ধারে আপনার সিট। আটটায় নেহরু প্লেসের সামনে থেকে বাস ছাড়বে।’
‘এয়ারকন্ডিশনড?’
‘না। যা হাওয়া দেবে তাতে গরম লাগবে না। লাক্সারি কোচ, কম্ফর্টেবলিই থাকবেন। পথে খাওয়ার জন্য ধাবায় বাস দাঁড়াবে, আগ্রায় হোটেল পাবেন। অসুবিধের কিছু নেই।’
না থাকলেও শ্যামলের পরামর্শমতো সহদেব পাউরুটি, মাখন আর কলা কিনে নিল।
‘চিনিটা বাড়ি থেকে দিয়ে দেব। বুঝলেন বারো ঘণ্টার ধকল, শরীরটা হালকা, ঝরঝরে রাখা দরকার। এইসব হোটেল আর ধাবার মশলা দেওয়া রিচ খাবার না খাওয়াই ভালো। আর দামও নেবে অসম্ভব। আমার ওয়াটারবটল আছে, জল ফুরিয়ে গেলে পথে ভরে নিতে পারবেন।
বাজারটার মধ্যে ঘুরে দেখার ইচ্ছা হল সহদেবের। কলেজে পড়ার সময় রোজই সে বাজার করত। তারপর দায়িত্ব নেয় বাসুদেব। কিন্তু চাকরি নিয়ে সে দুর্গাপুরে চলে যাবার পর থেকে এখন পর্যন্ত বিদ্যুৎই করে যাচ্ছে। তবে মাঝে মাঝে সহদেবকে বাজার যেতে হয় যখন বিদ্যুতের মদ খাওয়াটা বেশি হয়ে যায়।
‘সহদেবদা, একটু তাড়াতাড়ি ফিরতে হবে, রান্নাবান্না আছে। আজ তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ুন। আপনার তো দেরিতে ওঠা অভ্যেস, কাল কিন্তু সকাল সকাল উঠতে হবে।’
বাজার থেকে বেরিয়ে আসার আগে সহদেব মাছের দিকটায় একবার চোখ বুলিয়ে মুগ্ধ স্বরে বলল, ‘শ্যামল, এ তো চাঁদের হাট! পার্শে, ট্যাংরা, পাবদা, বাগদা, পুঁটি, মৌরলা। ঝকঝকে টাটকা আর কী সব সাইজ! কাতলা-রুই এক একটা তিন-সাড়ে তিন কেজি তো হবেই। ইচ্ছে করছে কিনে কলকাতায় নিয়ে যাই।’
‘আপনার ট্রেন পরশু, কলকাতায় পৌঁছবেন তরশু। ততক্ষণে পচে যাবে।’
‘শুধু মাছ কেন, সব কিছুই বেশি সময় দিলে পচে যায়।’ সহদেব কথাটা বলেই নিজের ওপর বিরক্ত হল। এই রকম খেলো দার্শনিক কথাই তো বুঝিয়ে দেয় সে একটা কেরানি। কিন্তু শ্যামলকে তো আর তা বলা যায় না।
‘ফিরে এসে সহদেব বলল, ‘এবার একটু মদ খাব, কোনটে এনেছ?
‘রাম, হুইস্কি দুটোই আছে। আমি প্রেফার করি রাম।’
‘ওটাই খাব।’
রান্নাঘর থেকে রাম আর জল মিশিয়ে গ্লাসটা সহদেবের হাতে দিয়ে শ্যামল বলল, ‘দেখুন তো আর জল দেব কি না।”
চুমুক দিয়েই মুখ কুঁচেকে সে চোখ বুজে ঢোঁকটা গিলে নিয়ে বলল, ‘ঠিক আছে।’
‘একটু বেশিই জল দিয়েছি।’
‘না না ঠিক আছে। তোমার কই?’
‘রান্নাঘরে রয়েছে, রাঁধতে রাঁধতে খাব। ডালটা করাই আছে, ভাত, বেগুন ভাজা আর কালোজিরে দিয়ে ঝোল। একঘণ্টার মধ্যেই হয়ে যাবে।..টিভি দেখবেন?’
‘না, না।’ সহদেব প্রায় আঁতকে উঠল। ‘আমার এখনও নেশা হয়নি, পারব না দেখেতে। একতলায় শমির ঘরে একটা আছে, সাদা-কালো, সব সময়ই চলছে। ওর একটিই মেয়ে সেবা, তার জন্যই টিভি খুলে রাখে। বেচারার একটা পা পোলিওয় গেছে। ক্রাচ নিয়ে চলে, দেখে বড়ো কষ্ট হয়। ক্লাস ফাইভে পড়ে, আঁকার হাতটা খুব ভালো। টিভি-তে বিজ্ঞাপন দেখতে সেবা খুব ভালোবাসে’। এই কটি কথা বলার মধ্যেই সে দুটো চুমুকে গ্লাসের অর্ধেকটা শেষ করেছে।
‘আপনি একা, খাওয়া-দাওয়া কী বোনের কাছেই?’ শ্যামল রান্নাঘরে ঢুকে সেখান থেকেই সামান্য গলা চড়িয়ে বলল।
‘তাছাড়া উপায় কী! পাঁচশো টাকা মাসে দিই। খানিকটা অবশ্য ওদের হেল্প করাও হয়।’ সহদেবও একটু গলা তুলল। ‘বুঝলে শ্যামল, এই এজমালি বাড়ির অংশীদার হওয়াটা একটা ঝঞ্ঝাটে ব্যাপার। এর থেকে ভাড়াটে হয়ে কোথাও থাকা অনেক নিশ্চিন্তের।…তিন ভাই, দু-বোন, পাঁচ ভাগ করলে কী সেকেলে প্ল্যানে তৈরি পুরোনো বাড়িতে বাস করা যায়? তাও আমি বিয়ে করিনি, দাদা বিলেতে থাকে, প্রচুর কামাচ্ছে। সে এ বাড়িতে পেচ্ছাপ করতেও আসবে না। সল্ট লেকে জমি কিনেছে।’
